সেহ-বন্দি সেপাই রাখলেই ঠাণ্ডা! এবার সিদ্দি ফুলাদ বচনরামকে ব্যঙ্গ করেই হেসে উঠেছেন। তার পর চোখ দুটো কুঁচকে, মুখ বেঁকিয়ে বলেছেন, শহরের উটকো লোক যা বলে, তোমারও তাহলে তাই ধারণা!
বচনরাম চুপ করে থেকেই তার সায় জানিয়েছে।
সিদ্দি ফুলাদ এবার বচনরামের প্রতিবাদে যেন নয়, নিজের ও সেই সঙ্গে সারা মোগল জাহানের অন্তরের জ্বালাটা প্রকাশ করে বলেছেন, শোনো বচনরাম, ও চুহা নয়। পাহাড়ি চিতা। ওর নিজের এলাকায় পাহাড়-জঙ্গলে ও মোগল শেরকেও ঘায়েল করে। সায়েস্তা খাঁর শিক্ষাটাই মনে করো না! পুনায় ভোঁসলে পরিবারের নিজেদের মোকামে সায়েস্তা খাঁ তার লোক-লশকর হারেমসুদ্ধ নিয়ে আছে। তার নিজের সৈন্যবাহিনী তো আছেই, তার ওপর যশোবন্ত সিং-এর দশ হাজার জোয়ান। এইসব হেলায় তুচ্ছ করে শিবাজি চারশো বাছাই করা অনুচরের মধ্যে মাত্র দুশো জনকে নিয়ে সায়েস্তা খাঁর হারেমের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে সায়েস্তা খাঁর বুড়ো আঙুল কেটে নিয়ে আসে। না বচনরাম, শিবাজি হেলাফেলা করবার লোক নয়, তা আলমগির ভালো কইে জানেন। তিনি দরবারে ওকে যে একটু অগ্রাহ্য করেছেন সে শুধু পরীক্ষা করবার জন্যে। তাতে ওরকম হাত-পা ছুঁড়ে চেঁচিয়ে সম্রাটের আর তাঁর। দরবারের অপমান করা কি শিবাজির উচিত ছিল?
ওঃ, হ্যাঁ, তাও তো বটে! শিবাজি তো খুব চেঁচামেচি করেছিলেন ওই দরবারের মধ্যেই! বচনরামের মুখের ভাবে অবিশ্বাস আর বিস্ময়ই যেন ফুটে উঠেছে।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে-মুখে একবার চোখ বুলিয়ে সিদ্দি ফুলাদ বলেছেন, চেঁচামেচি নয়, তাকে বলে কেলেঙ্কারি। সম্রাটের কাছে কোনও অভ্যর্থনা না পেয়ে পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে শিবাজি যেই শুনলেন কুমার রামসিং-এর কাছে যে, সেটা পাঁচহাজারি মনসবদারদের সারি, তৎক্ষণাৎ তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন কী! আমার খাতির এই! আমার ছেলে আগ্রা না এসেই পাঁচহাজারি মনসবদারি পেয়েছে। আমার কাছে যে চাকরি করে সেই নেতাজিও পাঁচ-হাজারি! আর আমি পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে আগ্রা এসেছি এই সম্মান পেতে! শিবাজির সামনে দাঁড়িয়েছিল যশোবন্ত সিং আর প্রধান ওয়াজির জাফর খাঁ। সম্রাটের কাছে তারাও যখন খিলাত পেল শিবাজিকে বাদ দিয়ে, তখন শিবাজির চোখ দিয়ে যেন আগুন ছিটোচ্ছে। সম্রাটের পর্যন্ত তা নজরে পড়েছে তখন। কুমার রামসিংকে তিনি পাঠালেন শিবাজি অমন অস্থির কেন জানতে। শিবাজি যা মুখে আসে, বিক্ষোভে জানিয়ে মনসবদারি ছেড়ে দিয়ে এবার যা করেছে, বাবর শাহ-এর আমল থেকে মোগল রাজত্বে তা দিল্লি কি আগ্রা কোথাও কেউ করতে সাহস করেনি। শিবাজি সিংহাসনের দিকে পেছন ফিবে গটগট করে বাইরে বেরিয়ে গেছে। কুমার রামসিং সন্ত্রস্ত হয়ে তাকে হাতে ধরে ফেরাতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু শিবাজি সজোরে হাত ছিনিয়ে নিয়ে একটা থামের পেছনে গিয়ে সেই যে বসেছে, শত অনুনয়-বিনয়েও আর ওঠেনি। সেখানে বসেই কুমার রামসিংকে বলেছে, আমায় এখুনি কাটো মারো যা খুশি করো, সম্রাটের সামনে আমি যাব না। আলমগির কুমার রামসিং-এর কাছে শিবাজির অভিমানের কথাই একটু শুনেছেন। শুনে, অন্য ওমরাহদের শিবাজিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফেরাতে বলেছেন, তাকে খিলাত পর্যন্ত দিয়েছেন, কিন্তু শিবাজি তার গোঁ ছাড়েনি। শাহনশাহকে তো এত কিছু বলা যায় না, তাঁকে এবার বোঝানো হয়েছে যে, দারুণ গরমে মারাঠা সর্দার বেহুশ হয়ে পড়েছে।
ওঃ! এত কাণ্ড! বচনরামের গলা এবার যেন অপ্রসন্ন–দরবারের বাইরে তো ঠিক খবর আমরা পাইনি। সত্য-মিথ্যে হরেকরকম গুজব আমাদের কানে এসেছে। সত্যি যা হয়েছে তাতে শাহানশাহ্ তো রাগ করতেই পারেন। তাই বুঝি আপনার ওপর হুকুম হয়েছিল শিবাজিকে কিল্লাদার রাদ-আন্দাজ খাঁর হাতে তুলে দেবার?
কে—কে বললে তোমায় এ কথা?
সিদ্দি ফুলাদ-এর হাবসি শ্যামলা মুখ এবার বেগনে হয়ে উঠেছে সত্যিকার রাগে। বচনরামের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছেন, এ সমস্ত মিথ্যা কথা!
তা তো হতেই পারে!বচনরামকে তেমন বিচলিত মনে হয়নি—বাজারে কতরকম বাজে গুজবই তো রটে। এও রটেছে যে, রাদ-আন্দাজ খাঁর জিম্মায় কেল্লার ভেতরে পাঠানো মানেই হল একেবারে শেষ করে দেওয়া। রাদ-আন্দাজ খাঁ নাকি পিশাচদেরও হার মানায় শয়তানিতে আর নিষ্ঠুরতায়। ছোট থেকে বড় হয়েছে সে শুধু এই নৃশংসতার জোরে। আলওয়ারের সনামী সম্প্রদায়কে ঝাড়ে বংশে শেষ করে দেওয়ার পরই নাকি আগ্রায় কিল্লাদারি পেয়েছে। সত্য-মিথ্যে জানি না, তার জিম্মায় শিবাজিকে পাঠানোর খবর পেয়ে কুমার রামসিং নাকি শাহানশাহ্-এর কাছে বলেছেন, তার আগে আমাকে মারবার হুকুম দিন, জাঁহাপনা! আমার বাবা শিবাজিকে অভয় দিয়ে আগ্রা পাঠিয়েছেন। রাজপুতের জবানের দাম তার প্রাণের চেয়ে বেশি। সম্রাট তাতে নাকি কুমার রামসিং-এর কাছে খত চেয়েছেন শিবাজিকে পাহারায় রাখার দায় স্বীকার করে। তাই লিখে দিয়েছেন কুমার। কিন্তু আবার নাকি নতুন ফন্দি হয়েছে শিবাজিকে শেষ করবার। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে ইউসুফজাই আর আফ্রিদি বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করবার জন্যে কুমার রামসিং-এর সঙ্গে শিবাজিকে পাঠাবার মতলব হয়েছে। ঠিক হয়েছে, এবারও কাবুলের পথে আগুসার বাহিনীতে থাকবে সেই রাদ-আন্দাজ খাঁ, রাস্তাতেই হঠাৎ দুশমনদের আক্রমণের নাম করে শিবাজিকে যাতে খতম করে ফেলা যায়। কুমার রামসিং-এর জন্যে সে ফন্দিও কাজে লাগানো নাকি যায়নি।
