বচনরামের মুখে সরল বিস্ময়ই ফুটে উঠেছে যেন। কথাটায় বিশ্বাস করতে যেন। কষ্ট হচ্ছে এইভাবে সে বলেছে, ওই একরত্তি মানুষটার মধ্যে এত দুশমনি! আমারই মতো তো ক্ষয়া-পাতলা মাঝারি মাপের চেহারা!
তুমি কোথায় দেখলে শিবাজিকে! সিদ্দি ফুলাদ একটু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন।
দেখেছি আগ্রায় যেদিন প্রথম আসে, সেইদিনই। বচনরাম একটু হতাশ হওয়ার। সুর ফুটিয়েছে গলায়, শহরের নানা মহল্লায় নানা গুজব শুনে ইচ্ছে হয়েছিল স্বচক্ষে একবার মানুষটাকে দেখবার। এমন একটা কেও-কেটার ইস্তিল কেমন হয় তাও দেখতে চেয়েছিলাম। শহর ছাড়িয়ে তাই মানিকচাঁদের সরাই পর্যন্ত গেছলাম। গিয়ে আফশোশই হল। এই শিবাজি ভোঁসলের অভ্যর্থনা! আগ্রা শহর তাকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেনি।
সত্যিকার হোমরা-চোমরাদের বেলা ইস্তিবাল-এর কী দস্তুর? আগ্রা থেকে অন্তত একদিনের পথ বাকি থাকতে মানী অতিথি যাত্রা থামিয়ে বিশ্রাম করতেন। শাহানশাহ-এর প্রতিনিধি দামি উপহার নিয়ে সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে শোভাযাত্রা করে সসম্মানে তার পরদিন শহরের রাস্তা দিয়ে এনে জ্যোতিষীদের বিধান দেওয়া শুভসময়ে সম্রাটের সামনে হাজির করবেন। কোথায় কী! সব দেখলাম ভোঁ ভোঁ। শুনলাম, কুমার রামসিং-এর ওপর শিবাজিকে অভ্যর্থনা করার ভার ছিল। তিনি নাকি শিবাজির পৌঁছোবার খবর জানতেই পারেননি। জানতে যখন পেরেছেন। তখন আবার পাঠিয়েছেন তাঁর মুনশি গিরধরলালকে। ইস্তিকাল-এর এই ছিরি দেখেই আমার তো ভক্তি উড়ে গেছল। আগ্রা শহরে পরের দিন ঢোকবার পর আর-এক কেলেঙ্কারি। কুমার রামসিং-এর সেদিন বুঝি প্রাসাদ পাহারা দেওয়ার হফত চৌকি ছিল। সে কাজ সেরে রামসিং আর মুকলিস খাঁ তাঁদের লোকলশকর নিয়ে যখন শিবাজিকে অভ্যর্থনা করতে ছুটে গেছেন খোজা ফিরোজার বাগিচার পথ ধরে, তখন মুনশি গিরধরলাল শিবাজিকে নিয়ে আসছে দহর-আরা বাগিচার রাস্তায়। শেষে কোনওরকমে এ ভুল শুধরে শিবাজির সঙ্গে কুমার রামসিং-এর দলের দেখা হল খাসবাজারের নূরগঞ্জ বাগিচায়। তারপর শিবাজিকে প্রায় ঘোড়দৌড় করিয়ে শাহানশাহ্-এর কাছে হাজির করবার চেষ্টা। তখন দিওয়ান-ই-আম-এর পালা শেষ হয়ে গেছে, সম্রাট বসেছেন দিওয়ান-ই-খাস-এ গিয়ে। ছোট মীর বকশি আসাদ খাঁ সেখানে শাহানশাহ-এর সামনে হাজির করেছেন শিবাজিকে। শিবাজি ভোঁসলে। হাজার মোহর আর দু হাজার সিক্কা নজর দিয়েছেন। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার সিক্কা নিসার। সম্রাট কিন্তু মুখের একটা কথা বলেও শিবাজিকে সম্ভাষণ করেননি। শিবাজিকে তারপর নিয়ে গিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে পাঁচ-হাজারি মনসবদারদের সারিতে।
ধৈর্য ধরে এতক্ষণ পর্যন্ত সব শুনে শহর-কোতোয়াল একটু ভুরু কুঁচকে বলেছেন, তুমি এতক্ষণ ধরে যা শোনালে আগ্রা শহরে কারও তা জানতে বাকি আছে মনে করো! তবু অত ফলাও করে আমায় সব শোনাবার মানেটা কী বলো তো?
আজ্ঞে, সোজা মানে তো আগেই জানিয়ে দিয়েছি, কোতোয়াল সাহেব! বচনরাম সরলভাবে বলেছে, ওই যার ইস্তিল-এর নমুনা, শাহানশাহ্ যাকে মুখের একটা কথায় সম্ভাষণ করবার যোগ্য মনে করেন না, সেই তুচ্ছ একটা মানুষকে অত ভয় করবার কিছু আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। তাকে আটক রাখবার এত তোড়জোড় তাই একটু বাড়াবাড়িই মনে হয়।
উঁহুঃ—সিদ্দি ফুলাদ একটু হেসেছেন—তুমি একটা কথা ভুলে যাচ্ছ, বচনরাম। শিবাজির ইস্তিল যে ঠিকমতো হয়নি তা তাকে তাচ্ছিল্য দেখাবার জন্য নয়।
তবে কি সম্মান দেখাবার জন্যে!
বচনরামের গলার স্বরটা প্রায় বেয়াদবির কিনারা ছুঁয়ে গেছে।
চোখটা বচনরামের মুখে তোলবার সময় ঝিলিক দিয়ে উঠলেও সিদ্দি ফুলাদ খোঁচাটা তেমন গায়ে মাখেননি বোধহয়। ভুল শোধরাবার ভঙ্গিতে সহজভাবেই বলেছেন, সম্মান দেখাবার উদ্দেশ্যই ছিল, কিন্তু তারিখটাই গোলমাল করে দিয়েছে।
বচনরামের কাছে যেন একটা প্রশ্ন আশা করে একটু থেমেছেন শহর-কোতোয়াল। সে প্রশ্ন না আসায় নিজেই আবার বলেছেন, দিনটা কী ছিল এখন আশা করি মনে পড়েছে। শিবাজি যেদিন আগ্রায় এসে ঢুকলেন, শাহানশাহ্-এর সেই দিনই পঞ্চাশের জন্মদিন। শহরের কারও মাথায় আর কোনও চিন্তা কি আছে তখন! চার মাস আগে শাজাহান মারা গেছেন আগ্রার দুর্গে। সম্রাট আওরঙ্গজেব এতদিন দিল্লি থেকেই সাম্রাজ্য চালিয়েছেন। এই প্রথম তিনি দিল্লি ছেড়ে আগ্রায় এসে দরবার বসিয়েছেন। চোদ্দোশো গাড়িতে যে-সব ঐশ্বর্য এসেছে দিল্লি থেকে আগ্রায়, তা সাজিয়ে রাখা হয়েছে প্রাসাদে, সম্রাটের জন্মদিন পালন করতে যারা আসবে তাদের চোখ ধাঁধাবার জন্যে। তা সত্যিই তো আগ্রাবাসীর মাথা ঘুরে গেছে তৈমুরবংশের ঐশ্বর্য দেখে। বড়-ছোট সবাই তখন সম্রাটের জন্মদিনের উৎসবেই মত্ত। শিবাজি যদি আগ্রায়। পৌঁছোতে দেরি না করতেন, যদি একদিন আগেও তিনি আগ্রায় পা দিতেন, তাহলে এ সমস্ত গোলমাল কিছুই হত না।
সম্রাটের জন্মদিনের দরুন তাঁকে খাতির করে আগ্রায় আনার না-হয় ত্রুটি হয়েছে, কিন্তু শাহানশাহ নিজেই যে একটা কথা বলেও তাঁকে মেহেরবানি করেননি, তাঁকে যে পাঁচহাজারি মনসবদারদের সারিতে দাঁড় করানো হয়েছে, সেটাও কি জন্মদিনের গোলমালে? বচনরাম মাথা নেড়েছেনা কোতোয়াল সাহেব, যা-ই আপনি বোঝান, শিবাজি একটা কেও-কেটা আমি মানতে পারব না। সামান্য একটা পাহাড়ি ভুইয়ার লুঠেরা হয়ে দুদিন একটু পিঁপড়ের পাখা গজিয়েছিল। সে পাখা হেঁটে দিয়ে সম্রাট তাই তাকে পোকামাকড়ের শামিলই মনে করেছেন। আপনারাই মিছিমিছি শিবাজিকে ফানুসের মতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তার ভয়-ভাবনায় অস্থির। এই যে জিসি-দতি নিয়ে শিবাজির শিবির ঘেরাও করে রেখেছেন, আগ্রার সাধারণ মানুষ তাতে কিন্তু তাজ্জব। তারা কেউ কেউ আবার হাসে। বলে, জিসি-দতি, মানে কামানবন্দুক লাগে ওই একটা পাহাড়ি চুহাকে আটকে রাখতে। বন্দুকচি তো নয়ই, নেহাত সাধারণ পাহারাদারের যারা শামিল সেই আশা-ও নয়, তারও চেয়ে ওঁচা যত হতভাগা বেকার বাউন্ডুলেদের দিয়ে গড়া সেহবন্দি ক-টা সেপাই রাখলৈই তো ঠাণ্ডা!
