কেন? কী করে? গানাদো সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কেন তা তিনিই জানেন। মৃদু হেসে বলেছিল কয়া, তবে সূর্যসেবিকাদের কন্যাশ্রমের অলঙ্ঘ্য প্রাচীর বিফল করবার মতো ছিদ্রপথও কিছু কিছু আছে। পিতামহ সেই ছিদ্রপথেই আমার কাছে তাঁর শেষ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। নামে যারা সূর্যসেবিকা বাইরের জগতের কাছে তারা অসূর্যম্পশ্যা। স্বয়ং ইংকা কিংবা তাঁর সামাজ্ঞী কয়া ছাড়া তাদের সাক্ষাৎ দর্শন পাবার অধিকার কারও নেই। বাইরের সঙ্গে কন্যাশ্রমের যোগাযোগ রক্ষা করেন বর্ষিয়সী তপোসিদ্ধা কয়েকজন পূর্বতন সূর্যসেবিকা, মামাকোনা বলে যারা পরিচিত। কী উপায়ে জানি না আমাদের এক মামাকোনাকেই প্রভাবিত করে পিতামহ তাঁর হাত দিয়ে আমার কাছে তাঁর গোপন কিপু পাঠিয়েছিলেন। ইংকা নয়, সে আরও জটিল ও উন্নত মুইস্কা কিপু। মামাকোনা চেষ্টা করলেও তার অর্থ উদ্ধার করতে পারতেন না। ছেলেবেলার বংশগত শিক্ষায় আমি তা পেয়েছিলাম। কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণ হয়ে আমি তখন রেইমি উৎসবের পবিত্র শিখা রক্ষণের ভার পেয়ে সূর্যকন্যারূপে চিহ্নিত হয়েছি। কিন্তু পিতামহের সেই ক-টি সুতুলি কিপু আমার মনের কঠিন নিষ্ঠা ও সংকল্পের ভিত্তিতে চিড় ধরিয়ে দিল। অনাগত ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ঔৎসুক্যে আমার মন একাগ্র সূর্য-সাধনার পক্ষে অশুদ্ধ হয়েছিল তখনই। পিতামহ সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর গণনা আমায় জানিয়ে গেছলেন কি না এক-একবার আমার সন্দেহ হয়।
কয়ার কথা শেষ হবার পর অনেকক্ষণ গানাদো স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন।
সন্ধ্যার অন্ধকার তখন বেশ গাঢ় হয়ে চারিদিকের দৃশ্যবৈচিত্র্য মুছে দিয়েছে। মৌন এক বিচ্ছিন্নতার যবনিকায় তাঁরা দুজনে যেন বেষ্টিত।
অনেকক্ষণ বাদে, ক্রমশ নিবিড় হয়ে ওঠা অন্ধকারে পরস্পরের কাছেও অস্পষ্ট হয়ে আসার পর কয়া কুণ্ঠিত মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমাকে একটু ঘৃণা করছ নিশ্চয়ই।
ঘৃণা! বিস্মিত স্বরে বলেছিলেন গানাদো, ঘৃণা করব তোমাকে? কেন?
তোমার কাছে আমার গোপন স্থলনের কথা প্রকাশ না করে পারলাম না বলে। সূর্যসেবিকা হিসাবে আমি তো সত্যিই ভ্রষ্টা। প্রায় অস্ফুট স্বরে বলেছিল কয়া।
এবার হেসে উঠেছিলেন গানাদো। বলেছিলেন, হ্যাঁ, সত্যিই তুমি স্রষ্টা। কিন্তু এ স্থলন তোমার লজ্জা নয়, তোমার গৌরব। বেগের আনন্দে বয়ে যাবার নদী বলেই বদ্ধ জলের বাঁধানো পাড় তুমি না ভেঙে পারোনি। তোমার পিতামহ এই নিয়তির জন্যেই তোমাকে প্রস্তুত রাখতে চেয়েছিলেন এই কথাই ভাবতে ইচ্ছে করে নাকি?
গানাদোর কথা কয়া কি সব বুঝেছিল? কোনও উত্তর সে অন্তত দেয়নি।
অন্ধকারে অনেকক্ষণ নীরবে বসে থাকবার পর গানাদো উঠে পড়ে বিদায় চেয়ে ছিলেন। কয়াকে আশ্রয় নিতে বলেছিলেন গোপনে গুহায়।
এখনই তুমি যাবে?
দেহের শিরা উপশিরায় সুধার স্রোত ছড়িয়ে কয়ার ঈষৎ কাতর প্রশ্ন গানাদোর কানে বেজেছিল।
আবেগ বিহ্বলতার জন্যেই কয়েক মুহূর্ত তিনি বুঝি উত্তর দিতে পারেননি। তারপর শান্ত আশ্বাসের কণ্ঠে বলেছিলেন, হ্যাঁ, এখনই যাব, তবে বেশিক্ষণের জন্যে নয়। তুমি নিশ্চিত থেকো যে, মধ্য রাত্রের আগেই ফিরে এসে সূর্যোদয় পর্যন্ত এ গুহামুখ আমি পাহারা দেব। এখন শুধু কামালকা নগরে একটি দায় না সেরে এলে নয়।
কী সে দায়, কয়া কিন্তু আর জিজ্ঞাসা করেনি। নীরবে সে গুহামুখের গোপন পথে চলে গেছে।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর গানাদো যা করেছেন তা দেখতে পেলে কয়া কেন, কামালকা নগরের যে কেউ বিস্মিত হত।
পার্বত্যপথে কিছুদূর পর্যন্ত হেঁটে গানাদো একটি প্রস্তর-স্কুপের আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
একটি ঘোড়া সেখানে বাঁধা। ঘোড়াটির বিশেষত্ব এই যে, অন্ধকারেও তার গা থেকে যেন ক্ষীণ একটু সাদা আলো ছড়াচ্ছে। ভাল করে লক্ষ করলে অবশ্য দেখা যেত ঘোড়ার গায়ের এ শুভ্রতা স্বাভাবিক নয়। কাছের একটি পাত্রই তার প্রমাণ। কাক্সামালকা শহরের বাড়িগুলি যার কল্যাণে সবই উজ্জ্বল ধবল সেই চুনই খানিকটা রাখা আছে পাত্রটিতে।
গানাদো নিজেই যেভাবে বেশ বদল করেছেন তা একটু অদ্ভুত। যা পরেছিলেন তার ওপর সাদা আলখাল্লা জাতের একটি পোশাক তিনি চাপিয়েছেন। কোমরবন্ধে সে আলখাল্লা বেঁধে খাপ সমেত তলোয়ার তো সেখানে ঝুলিয়েছেনই, তার সঙ্গে আর একটি যা জিনিস নিয়েছেন সেইটিই বিস্ময়কর। জিনিসটি এমনিতে দেখলে একটা লম্বা দড়ি ছাড়া কিছু মনে হয় না।
এই দড়িটি জিনের ওপর রেখে ঘোড়া খুলে তাতে সওয়ার হয়ে আপাদমস্তক শুভ্র আবরণে ঢেকে গানাদো যখন নগরের দিকে রওনা হয়েছেন তখন সত্যিই ঘোড়া সমেত তাঁর মূর্তি অলৌকিক কোনও আবির্ভাব বলে মনে করা কারও পক্ষে অস্বাভাবিক ছিল না।
রাতের পর রাত নগরের নির্জন পথে এ মূর্তি দেখবার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কারও কারও হয়েছে তার পর। কামালকা নগরে পেরুবাসী তো বটেই, এসপানিওলদের মধ্যেও এ মূর্তি নিয়ে তখনই বিস্ময় সংশয়ভরা আলোচনা শুরু হয়ে গেছে।
শুধু কাকসামালকা নয়, আর-এক জায়গাতেও ভীরাকোচারূপী ও মূর্তি কীভাবে যে কিছুকাল বাদেই আলোচিত হয়েছে তা জানলে গানাদো নিজেই বোধহয় একটু বিচলিত হতেন।
জায়গাটির নাম টম্বেজ বন্দর। আলোচনা যারা করেছে তাদের দু-জনেই। আমাদের চেনা একজনের নাম গাল্লিয়েখো আর একজন মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস।
