মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিসের কাছে স্পেন ও মেক্সিকো দুই ই একটু বেয়াড়া হয়ে ওঠায় অজানা নতুন মহাদেশ পেরুতেই ভাগ্য পরীক্ষা তার কাছে সুবিধের মনে হয়েছে। পানামা থেকে একটি অভিযাত্রী জাহাজে সে তখন সবে এসে নেমেছে। টম্বেজ-এ।
কামালকায় যার মুখ দেখানো আর সুবিধের নয়, পিজারোর হুকুমে বিতাড়িত সেই গাল্লিয়েশখাও তখন পাহাড় থেকে নেমে টমবেজ বন্দরে ওই জাহাজেই ফিরে যাবার জন্যে অপেক্ষা করছে।
বন্দরের পথেই দুজনের দেখা। মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিসকে না হলেও পুরোনো আলাপী সোরাবিয়াকে গাল্লিয়েখো চিনেছে। সোরাবিয়া সে পরিচয় অস্বীকার করেনি।
নেশার আড্ডায় সোরাবিয়ার না হোক, গাল্লিয়েখোর জিভের রাশ আলগা হয়ে গেছে তার পর। অদ্ভুত ভীরাকোচা মূর্তির কাছে তার চরম লাঞ্ছনার কথা সবই বলে ফেলেছে গাল্লিয়েখো।
শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে সোরাবিয়ার মুখ। গাল্লিয়েখোর কপালের আর মুখের অসি কলঙ্ক চিহ্নগুলি তখনও মেলায়নি। সেগুলি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরীক্ষা করে প্রায় নিষ্পেষিত দন্তে অদ্ভুতভাবে হেসে সোরাবিয়া বলেছে, তোমার এ লাঞ্ছনার শোধ শিগগিরই হবে, গাল্লিয়েখো। কাকসামালকার এসপানিওলদের বিভীষিকা, ভীরাকোচার এ অবতারকে আমি বোধহয় চিনি।
তীব্র উৎসাহ উত্তেজনা নিয়ে সেই দিনই সোরাবিয়া রওনা হয়েছে কাক্সামালকার পথে।
গানাদো তখন অবশ্য কাকসামালকায় নেই। সোনাবরদারদের দলে সবে কুজকো শহরে পৌঁছে ইংকা সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সূর্যমন্দির কোরিকাঞ্চায় আশ্রয় নিয়ে কয়াকে। তিনি সৌসায় হুয়াসকার-এর কাছে কিপু নিয়ে দুঃসাহসিক দৌত্যে পাঠাবার আয়োজন করছেন।
হুয়াসকার-এর কাছে গোপন কিপু নিয়ে যে দৌত্যে যাবে সোনা-বরদার দলের সঙ্গে কোরিকাঞ্চার সূর্যমন্দিরে আশ্রয় পাবার পরই তার চেহারা পোশাক আশ্চর্যভাবে পালটে গেছে।
হালকা পাতলা নেহাত কিশোর গোছের যে একজনকে সোনা-বরদার দলের সঙ্গে কামালকা থেকে কুজকো পর্যন্ত আসতে দেখা গেছল কুজকো শহরে পা দিয়ে
সোনা-বরদার দল কোরিকাঞ্চায় ঢোকবার পর আর তার পাত্তা পাওয়া যায়নি।
কোরিকাঞ্চার মন্দিরে সে যেন কোথায় হারিয়ে গেছে বলেই মনে হয়েছে প্রথমে।
তা কোরিকাঞ্চার মন্দিরে হারিয়ে যাওয়া এমন কিছু আশ্চর্য তো নয়! কুজকো শহরের একেবারে মাঝখানে এ যেন বিশাল এক আলাদা জগৎ।
প্রধান সুর্য-দেউল একটিই। কিন্তু সেটিকে ঘিরে অসংখ্য ছোট বড় সব আয়তন চারিদিকে বহুদূর পর্যন্ত যেন অনুগত সেবক-সেবিকার মতো ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য-মন্দির থেকে শুরু করে ছোট বড় সব দেবায়তনই পাথরে তৈরি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে সেগুলির ছাউনি ঘাসের। বাইরে সেগুলির চেহারা তেমন জমকালো না হলেও ভেতরের ঐশ্বর্য ইউরোপের অনেক রাজা-মহারাজাদেরও চোখ কপালে তোলবার মতো। সারা ভানতিনসুইয়ু-ই বলতে গেলে সোনা রুপোয় মোড়া। তার মধ্যে সমস্ত দেশের সেরা যা কিছু সোনাদানা সব জড়ো হয়েছে এই কোরিকাঞ্চার দেবস্থানে। সোনার ছড়াছড়ি বলেই এ দেবায়নের নাম হয়েছে কোরিকাঞ্চা। কোরিকাঞ্চা মানে হল সোনার পুরী।
আশ্চর্য তো! উৎসাহ দমন করতে না পেরে মেদভারে যিনি হস্তীর মতো বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবু শ্রীঘনশ্যাম দাসকে বাধা দিয়ে ফেলেছেন।
বাধা পেয়ে দাসমশাই একটু ভ্রুকুটিভরে তাকাতে বেশ একটু অপ্রস্তুত হলেও ভবতারণবাবু তাঁর বিস্ময়সূচক মন্তব্যটা শেষ না করে পারেননি।
কুণ্ঠিতভাবে দুবার ঢোক গিলে বলেই দিয়েছেন, কোরিকাঞ্চার মানে সোনার পুরী হওয়া ভারী অদ্ভুত নয়?
অদ্ভুতটা কোথায় দেখলেন?—মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই শিবপদবাবু তাঁর পাণ্ডিত্যের উচ্চ শিখর থেকে একটু অবজ্ঞার খোঁচা না দিয়ে পারেননি—কাঞ্চা। শব্দটার সঙ্গে কাঞ্চনের সম্পর্ক খুঁজছেন নাকি? ভাবছেন, সংস্কৃতের কাঞ্চন শব্দটাই কালাপানি, ভারত সমুদ্র আর গোটা প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে গিয়ে পেরুতে কাঞ্চা হয়েছে? আর তা যদি হয়ে থাকে তা হলে ইংকা সভ্যতার পেছনে ভারতবর্ষই উঁকি দিচ্ছে বলে ধরে নিচ্ছেন?
ভবতারণবাবু কাঁচুমাচু, সভার অন্য সবাই একটু দিশাহারা।
কিন্তু সাহায্য এসেছে অপ্রত্যাশিতভাবে শ্রীঘনশ্যাম দাসের কাছ থেকেই। শিবপদবাবুর ইস্কাবনের টেক্কার ওপর চিড়েতনের রঙের দুরির তুরুপ মারবার এমন সুযোগ কি দাসমশাই ছাড়েন!
ঈষৎ কুঞ্চিৎ চোখে শিবপদবাবুর দিকে চেয়ে তিনি বলেছেন, ভারতবর্ষ উকি দিচ্ছে কি না কেউ জানে না, তবে সেকালের কুইচুয়া ভাষার কয়েকটা শব্দ যে কৌতূহলটা জাগাবার মতো এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। যেমন ধরুন অমাউতা। উচ্চারণ অমাউত্যা ছিল মনে হয়। সংস্কৃতে অমাত্য হল রাজাকে মন্ত্রণা দেন এমন প্রাজ্ঞ বিদ্বান মানুষ আর পেরুতেও অমাউত্যা বলতে বোঝাত বিজ্ঞ পণ্ডিত। তফাত শুধু ছিল এই যে, রাজাকে মন্ত্রণা দেবার বদলে ইংকা রাজপুত্রের শিক্ষাদীক্ষা দেবার ভার তাঁদের ওপর থাকত। শুধু কাঞ্চা আর অমাউত্যা কেন, পেরু শব্দটাই সংস্কৃত পারুর কথা মনে করিয়ে দেয়। পারু মানে সংস্কৃতে সূর্য। কাঞ্চা শুনে ভবতারণবাবুর কান একটু খাড়া হয়ে ওঠা সুতরাং দোষের নয়।
শিবপদবাবু পালটা কিছু প্রশ্ন তোলার জন্যে যদি তৈরি হয়ে থাকেন, তার সুযোগ দাসমশাই তাঁকে দেননি। সরাসরি আবার গল্পে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন—
