নিজের অজ্ঞতাটা প্রথমে গোপন করবার ইচ্ছাই হয়েছিল গানাদোর। বিমূঢ় বিস্ময়ে প্রথমে যেটুকু প্রকাশ করে ফেলেছিলেন তা চাপা দিয়ে কৌশলে মুইস্কা শব্দের রহস্যটা জেনে নেবার কথা ভেবেছিলেন একবার।
কিন্তু এই শিশির-স্বচ্ছ পবিত্র মেয়েটির সঙ্গে চাতুরী করার কথা মনে যে একবার উঠেছিল তার জন্যেই নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলেন তখনই।
সোজাসুজিই তারপর জিজ্ঞাসা করেছিলেন, মুইস্কা আবার কী? ওরকম বংশের নামও তো কখনও শুনিনি।
না শোনবারই কথা। কয়া হেসে বলেছিল, এই তাভানতিনসুইয়ু-তেও কতজন আর মুইস্কাদের কথা শুনেছে! কিন্তু মুইস্কারা না বলে দিলে রেইমি উৎসবের দিন নির্ভুলভাবে কেউ জানতে পারত না। আকাশ-পথে ভেসে যেতে যেতে কবে চন্দ্রদেবীর মুখ যন্ত্রণায় কালো হয়ে উঠবে তা আগে থাকতে জেনে, পারত না প্রস্তুত হয়ে থাকতে। বংশ-মর্যাদায় ইংকাদের সমতুল্য হলেও, পেরুর যাঁরা অধীশ্বর তাঁদের কাছে তাই মুইস্কাদের সম্মান সবচেয়ে বেশি।
তার মানে মুইস্কারা জ্যোতিষী? সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন গানাদো।
সাধারণ জ্যোতিষী নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। একটু গর্বই প্রকাশ পেয়েছিল কয়া-র গলার স্বরে—ইংকা রাজ্যে আরও অনেক জ্যোতির্বিদ আছে, কিন্তু দেবাদিদেব পরম জ্যোতির সৃষ্টি-পরিক্রমার গূঢ় রহস্য একমাত্র মুইস্কাদেরই জানা।
পেরু রাজ্যবাসীরা অন্য অনেক বিষয়ে টেনচটিটলান অর্থাৎ মেক্সিকোর অধিবাসীদের চেয়ে যথেষ্ট অগ্রসর হলেও জ্যোতির্বিদ্যায় যে তাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে, গানাদো ইতিমধ্যেই তার প্রমাণ পেয়েছিলেন! সমস্ত পেরু র, একমাত্র মুইস্কারাই যে মেক্সিকোর আজটেকদের মতে শুধু নয়, প্রশাত মহাসাগরের ওপারের এশিয়ার সভ্য জাতিদের মতো জ্যোতির্বিদ্যার মূল সূত্রগুলি আশ্চর্য ও স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিল কিছুদিন বাদে গানাদো তা জানতে পারেন বিশদভাবে।
সেই মুহূর্তে কিন্তু এ সব আলোচনায় কোনও উৎসাহ তাঁর হয়নি। নিজের মনের সবচেয়ে বড় কৌতূহলটাই তিনি প্রকাশ করেছিলেন।
জিজ্ঞাসা করেছিলেন বিমূঢ় বিস্ময়ের স্বরে, কিন্তু তুমি যে শুধু ইংকা নও, মুইস্কাও, তা মনে পড়ায় আমার এত কাছে এসে বসার সাহস হল কী করে? দ্বিধা সংকোচ ভয় কি তাইতেই চলে গেল?
হ্যাঁ, গেল। গভীর নির্ভরতার সুরে বলেছিলেন কয়া, তোমাকে ভয় করা যে আমার ভুল তা মুইস্কা হিসেবে আগেই আমার বিশ্বাস করা উচিত ছিল। উদয়-সাগর-তীর থেকে তোমার আসা যখন মিথ্যে হয়নি, তখন আর সব গণনাই বা সত্য হয়ে উঠবে না কেন?
তার মানে এ সব ঘটনা আগেই তোমাদের কেউ গণনা করে জেনেছিলেন! সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন গানাদো, কে তিনি? কী তাঁর গণনা?
কী তাঁর গণনা সব জানতে চেও না। মধুর অনুরোধের সুরে বলেছিল কয়া, ভবিষ্যৎ জানবার অধিকার সকলের থাকে না। জানলে জীবনের স্বাদ তাদের কাছে স্লান কিংবা ফিকে হয়ে যায়। একথা বলতেন আমার পিতামহ। তিনিই তাভতিনসুইয়ুর সঙ্গে জড়িত আমার নিয়তি গণনা করে বলে গিয়েছিলেন যে, এ রাজ্যের চরম দুর্যোগের দিনে সূর্যকন্যা হিসেবে আমি ব্রতভ্রষ্টা হব আর আমার জীবনে পরম সহায় রূপে দেখা দেবে উদয়-সাগর-তীরের কোনও এক অচেনা ভিনদেশি।
একটু থেমে গানাদোর দিকে উৎসুক চোখ তুলে আবার বলেছিল কয়া, এর বেশি আর কিছু বলার অনুরোধ আমায় কোরো না। বলতে নিষেধ আছে আমাদের মুইস্কা সংস্কারে। ভবিষ্যৎকে অজানা থাকতেই দাও। সুখ-দুঃখ জয়-পরাজয় নিয়ে জীবনের সব পাওনাই আসুক গভীর অন্ধকার থেকে অভাবিতের চমক নিয়ে।
তাই আসুক! কয়ার প্রতি মুগ্ধ আকুলতার সঙ্গে নতুন এক সম্ভ্রম নিয়ে বলেছিলেন গানাদো, তোমার পিতামহ যা বলতেন আমার নিজেরও মত তাই। শুধু একটা কথা তোমায় জিজ্ঞাসা করি। সূর্যসেবিকা যখন তুমি হয়েছিলে তোমার পিতামহ কি তখন জীবিত?
হ্যাঁ, জীবিত, স্লান একটু হেসে গানাদোর পরের প্রশ্নটা যেন অনুমান করে বলেছিল কয়া।
তা হলে ব্রতভ্রষ্টা হবে জেনেও তোমাকে সূর্যসেবিকার অনুমতি তিনি দিয়েছিলেন। কেন? কয়ার অনুমিত প্রশ্নই তুলে গানাদো বলেছিলেন, সূর্যকন্যা হওয়া তো এ রাজ্যে হেলাফেলার ব্যাপার নয়। এ জীবন ব্রতে সার্থকতার গৌরব যেমন অসামান্য, স্থলন পতনের লজ্জা গ্লানি লাঞ্ছনা তেমনই অপরিসীম। সব জেনেশুনেও তোমার এ চরম দুর্গতি ঠেকাবার চেষ্টা তিনি করেননি কেন?
করেছিলেন। মুখে একটি বিষগ্ন ছায়া নিয়ে বলেছিল কয়া, অনিবার্যের বিরুদ্ধে সব সংগ্রামই নিষ্ফল জেনেও করেছিলেন। তবু সূর্যসেবিকারূপে আমার নির্বাচন বন্ধ করতে পারেননি। কৈশোর না পার হতে একদিন কুজকোর প্রধান কন্যাশ্রমের অলঙ্ঘ্য প্রাচীরের আড়ালে আমি নির্বাসিত হয়েছিলাম। সেখানে নিষ্কলঙ্ক দিব্যাঙ্গনার জীবন কিন্তু আমি কাটাইনি। এ রাজ্যের এই চরম বিপর্যয়ের দিনেই প্রথম নয়, মনে পাপের স্পর্শ লেগে ভ্রষ্ট হয়েছি আমি অনেক আগেই।
তুমি ভ্ৰষ্টা হয়েছ ওই কন্যাশ্রমের মধ্যে? ওই পবিত্র সূর্যকন্যা ব্ৰত তুমি ভঙ্গ করেছ?—বিস্ময়ে সংশয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল গানাদোর গলার স্বর।
হ্যাঁ, ভ্রষ্টা আমি হয়েছি সত্যিই অনেক আগে।গানাদোর উত্তেজিত সন্দিগ্ধ প্রশ্নের জবাব শান্ত স্নিগ্ধ আর সেই সঙ্গে কেমন যেন অনুশোচনাহীন কণ্ঠে বলেছিল কয়া, ভ্রষ্টা হয়েছি সেইদিন থেকে যেদিন নিজের নিয়তির কথা জেনে শঙ্কিত বিহ্বল হবার বদলে আমার উৎসুক কল্পনা কন্যাশ্রমের অলঙঘ্য দেওয়ালের বাইরে আমি ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। কঠিন আচার অনুষ্ঠানের বন্ধনে সূর্যকন্যাদের সমস্ত জীবন বাঁধা। আমার মন সে বন্ধন কিন্তু আর স্বীকার করতে চায়নি। অমোঘ নিয়তিই আমার কাছে যেন মুক্তির দ্বার হয়ে মনে মনে আমায় ব্যভিচারিণী করেছে। এ অমোঘ নিয়তির কথা না জানলে কী হত আমি জানি না, কিন্তু পিতামহ তাঁর মৃত্যুর আগে নিজেই কন্যাশ্রমের কঠিন চিরসতর্ক পাহারা ভেদ করে তাঁর গণনার কথা আমায় জানাবার ব্যবস্থা করেছিলেন।
