ভেস্টা দেবীর কুমারী সেবিকাদের সঙ্গে সেই সূর্যকন্যা দিব্যাঙ্গনাদের একটি বিষয়ে শুধু মিল। ভেস্টা দেবীর সেবিকাদের মতো এই সূর্যকন্যাদেরও একটি পবিত্র অগ্নি নির্বাপিত না হতে দেওয়ার ভার নিতে হয়। সূর্যদেবের উত্তরায়ণের দিন থেকে যার আরম্ভ এ অগ্নি সেই রেইমি উৎসবের।
কুমারী দিব্যাঙ্গনারা সূর্যসেবিকা হয়েও কিন্তু সম্পূর্ণ অসূর্যম্পশ্যা।
একবার সূর্যসেবিকা হবার সৌভাগ্য লাভ করার পর বাইরের জগতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক তাদের ছিন্ন হয়ে যায়।
অতি অল্প বয়সে কৈশোরে পা দিতে-না-দিতে তারা তাভানতিনসুইয়ু-র এই চরম গৌরবের জন্যে নির্বাচিত হয়। তারপর নিজেদের আত্মীয়স্বজন, এমনকী পিতামাতাও তাদের আর দেখতে পান না। বাইরের জগতের কোনও পুরুষ কি নারীর অধিকার নেই তাদের কন্যাশ্রমে প্রবেশ করবার।
পুরুষের মধ্যে একমাত্র ইংকা স্বয়ং আর নারীদের মধ্যে শুধু কয়া বা সম্রাজ্ঞী তাদের আশ্রমে প্রবেশ করতে পারেন।
সূর্যসেবিকাদের শ্রেষ্ঠ কন্যাশ্রম হল কুজকো নগরে। সেখানে শুধু ইংকা রাজরক্ত যাদের মধ্যে আছে সেইসব পরিবার থেকেই সূর্যকন্যা নির্বাচিত হয়। পরিবার থেকে সূর্যকন্যা নির্বাচিত হওয়া একটা অসামান্য গৌরব। কিন্তু গৌরবের যেমন তেমনই নিদারুণ উদ্বিগ্ন আতঙ্কের ব্যাপারও পরিবারের পক্ষে। সূর্যকন্যাদের সামান্যতম বিচ্যুতিরও ক্ষমা নেই। ভ্রষ্টা কেউ হলে তাকে তো জীবন্ত সমাধি দেওয়া হয়, আর যে পুরুষ এ ব্যাপারে জড়িত থাকে তার নিজেরই শুধু মৃত্যুদণ্ড হয় না, ধূলিসাৎ করে তার গ্রামের বা নগরের বসতির চিহ্ন পর্যন্ত লুপ্ত করে দেওয়া হয়।
এ রাজ্যে আসবার পর থেকে এই বিচিত্র সূর্যসেবিকাদের সম্বন্ধে গানাদো। যথাসাধ্য অনেক বিবরণই সংগ্রহ করেছিলেন। এটুকুও জেনেছিলেন যে চাঁদের অন্য পৃষ্ঠের মতো তারা অদর্শনীয়া।
মেয়েটি সেই দিব্যাঙ্গনা সূর্যসেবিকাদেরই একজন শোনবার পর তীব্র বিস্ময়বিহ্বলতায় তাকে লক্ষ করতে গিয়ে স্থানকাল কয়েক মুহূর্তের জন্যে ভুলে গিয়েছিলেন বোধহয়। তারপরই আত্মস্থ হয়ে বলেছিলেন, সূর্যসেবিকা বলে কোনও পরিচয় আর তো তোমার নেই। কন্যাশ্রমের সীমানা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের আলো-বাতাস আর পাপের সংসারের স্পর্শে তোমার সে নামহীন একাগ্র সাধিকার জীবন শেষ হয়ে গেছে। এখানে তোমায় নাম নিয়ে চিহ্নিত হতে হবে। বললা, কী নামে তোমায় ডাকব?
একটু থেমে চুপ করে থেকে হঠাৎ উৎসাহভরেই গানাদো বলেছিলেন, পেয়েছি তোমার নাম। তুমি আজ থেকে কয়া।
না, না। নামটা শুনেই মেয়েটি আপনা থেকেই যেন শিউরে উঠেছিল—আর যে নাম দাও, কয়া নয়।
কেন নয়! একটু হেসেই এবার বলেছিলেন গানাদো, কয়া মানে রাজেন্দ্রাণী বলে তোমার আপত্তি? কিন্তু রাজেন্দ্রাণী বললেও তোমায় বুঝি তুচ্ছ করা হয়। তবু তোমার নাম আমি কয়াই রাখলাম। আজ সন্ধ্যায় ওই নামেই এসে ডাকব।
গানাদো আর সেখানে দাঁড়াননি। মেয়েটির দিকে ফিরেও আর না তাকিয়ে সোজা কাক্সামালকার অতিথি-মহল্লায় তাঁদের শিবিরের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন।
ফিরে এসেছিলেন সন্ধ্যা না হতেই।
গুহামুখের গুপ্ত পথের কাছে এসে নাম ধরে ডাকতে কিন্তু তাঁকে হয়নি। কয়া আগে থাকতেই সেখানে এসে একটি পাথর-স্কৃপের আড়ালে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে।
তখনও সন্ধ্যার আকাশে সব আলো মিলিয়ে যায়নি। যেন কোনও নববধূর মুখের সলজ্জ রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর ওপর।
সেই অবাস্তব আলোয় কয়া-র স্নিগ্ধ কোমল দুটি চোখে একটি মধুর ঔৎসুক্য যেন দেখেছিলেন গানাদো।
সে ঔৎসুক্যের উৎস সারাদিনের উপবাসক্লিষ্ট তনু, না তার জাগরণােন্মুখ হৃদয় বিচার করবার সাহস হয়নি গানাদোর।
শিবির থেকে আনা আহার্য এক জায়গায় রেখে কয়াকে তা তুলে নিয়ে যেতে বলে তিনি কিছু দূরে এসে বসেছিলেন।
কয়া সে খাবার তুলে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দূরে নয়, তাঁর বেশ কাছেই এসে বসেছিল।
এত কাছে এসে বসার সাহস তোমার হল? গানাদো বিস্ময়ের সঙ্গে ঈষৎ কৌতুকের স্বরে বলেছিলেন।
হল। কয়া-র মুখে এই প্রথম হাসি দেখেছিলেন গানাদো। আগেই হওয়া উচিত ছিল। শুধু ইংকা নয়, আমি যে মুইস্কা বংশের মেয়ে তা ভুলে যাওয়া উচিত হয়নি।
মুইস্কা বংশের মেয়ে
গানাদো কয়ার কথাটার সবিস্ময়ে শুধু পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তার অর্থ কিছুই বুঝতে পারেননি। এই অজানা বিচিত্র পার্বত্যরাজ্যে পা দেবার পর থেকে এদেশের সব কিছু তিনি যথাসম্ভব খুঁটিয়ে জানবার চেষ্টা করেছেন। এসপানিওল বাহিনীর পণ্ডিত গোছের দুএকজনের তুলনায় তাঁর জ্ঞান যে অনেক বেশি এ নিয়ে তাঁর মনে গোপন একটু গর্বও বোধহয় ছিল। কিন্তু সে গর্ব কয়ার উচ্চারিত ওই একটি শব্দ মুইস্কা চুরমার করে দিয়েছে।
মুইস্কা বংশের মেয়ে বলতে কী বোঝাতে চায় কয়া?
মাত্র একদিন এক রাত্রির মধ্যে ভাগ্য তাকে নিয়ে যা ছিনিমিনি খেলেছে তাতে। কিছুটা মাথার গোলমাল হয়ে কয়া কি প্রলাপ বকছে নাকি? তার অমন করে হঠাৎ কাছে এসে বসাটাই তো বেশ একটু অদ্ভুত।
গানাদো সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারে কয়ার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন।
সে মুখে স্নিগ্ধ সরল একটু হাসির আভাস। সে হাসিতে বা তার চোখের প্রসন্ন দৃষ্টিতে বাতুলতার লক্ষণের বদলে একটা পরম নির্ভরতার তৃপ্তিই ফুটে উঠেছে।
