না, তোমার ভয় কিছু নেই। গানাদো তাকে স্নিগ্ধ স্বরে উৎসাহ দিয়েছিলেন, পরস্পরের কথা যে আমরা বুঝতে পারছি এই আমাদের দুজনেরই সৌভাগ্য। এ সৌভাগ্য যেন বিফল না হয়। নির্ভয়ে যা বলবার তুমি বলো। বলো উদয়-সমুদ্রের কথা কী তুমি জানো?
তেমন কিছুই জানি না! গানাদোর আশ্বাসে ধীরে ধীরে সাহস পেয়ে সরল মধুক্ষরা কণ্ঠে বলেছিল মেয়েটি, শুধু দেবাদিদেব বিশ্বজ্যোতি প্রতিদিন যে-সমুদ্র থেকে স্নান করে আকাশ-সোপানে ওঠেন তারই তীর থেকে কেউ একদিন এসে এ রাজ্যের চরম অভিশাপের দিনে আমার পরম সহায় হবে এই আমি শুনেছিলাম—
মেয়েটির কথায় বাধা না দিয়ে পারেননি গানাদো। গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে তার কথারই পুনরাবৃত্তি করে বলেছিলেন, উদয়-সমুদ্র-তীর থেকে কেউ এসে তোমার সহায় হবে শুনেছিলে? কার কাছে? কীভাবে?
আগ্রহের তীব্রতায় গানাদো উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক পা বুঝি এগিয়ে গিয়েছিলেন মেয়েটির দিকে।
মেয়েটিও উঠে দাঁড়িয়েছিল আপনা থেকেই। কিন্তু এক পা পিছিয়ে গিয়েই সে থেমে গিয়েছে। তারপর মিনতির স্বরে বলেছে, আমার কাছে এসো না। যা বলবার আমি সবই বলছি।
সজাগ হয়ে গানাদো নিজেই তখন থেমে পড়েছেন। লজ্জিত হয়ে তিনি বলেছিলেন, আমায় মার্জনা করো। যেটুকু তুমি বলেছ তাতেই বিস্ময়ে কৌতূহলে উত্তেজনায় আমি একটু আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। তোমার সব কথা না শুনলে আমার স্বস্তি নেই। তবু এখন আমায় আত্মসংবরণ করতে হবে। এখানে প্রকাশ্য জায়গায় আর তোমার থাকা নিরাপদ নয়। আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বাস করে শুধু আমায় অনুসরণ করো।
একটু থেমে মেয়েটিকে তখনও দ্বিধা করতে দেখে আবার বলেছিলেন, উদয়-সাগরের তীরের কেউ তোমার সহায় হবে এ গণনার কথা কোথায় কার কাছে তুমি শুনেছ জানি না। এ গণনা সত্য কি না তা-ও বিচারের ক্ষমতা আমার নেই। এইটুকু শুধু তোমায় জানাচ্ছি যে যাদের দলে আমায় দেখছ তাদের দেশের মানুষ আমি নই। সত্যিই বহু বহু দূরের উদয়-সাগরের তীর থেকেই আমি আসছি। এইটুকু জেনে আমায় বিশ্বাস করলে তোমার ক্ষতি হবে না।
মেয়েটি কী বুঝেছিল বলা যায় না। কিন্তু এবারে দূর থেকে হলেও গানাদোকে অনুসরণ করতে সে আপত্তি করেনি।
গুহা মুখের গুপ্ত পথের কাছে পৌঁছে সেটি নির্দেশ করে দেখিয়ে গানাদো যা করেছিলেন তাতে মেয়েটি পর্যন্ত বিস্মিত চমকিত হয়ে উঠেছিল।
হঠাৎ কোমর থেকে তাঁর ছোরাটা খুলে নিয়ে মেয়েটির কাছে ছুড়ে দিয়ে তিনি শান্ত দৃঢ়স্বরে বলেছিলেন, যে গুপ্তপথ দেখিয়ে দিলাম তা দিয়ে গুহার ভেতর নির্ভয়ে চলে যাও। এবার ওই সামান্য অস্ত্রটাও তুলে নিয়ে যাও। আমিই হই বা আর যে কেউই হোক, দুর্জন হিসেবে আক্রমণ করলে ওই অস্ত্রে তাকে রুখতে হয়তো পারবে না, কিন্তু জীবনের চেয়ে যার মূল্য বেশি নিজের সেই মর্যাদা তো বাঁচাতে পারবে ওই অস্ত্রটুকুর সাহায্যে!
মেয়েটি বেশ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছিল গানাদোর মুখের দিকে চেয়ে।
কিন্তু তখন তার চোখের দৃষ্টিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ছায়া আর নেই। তার বদলে বিস্ময় মেশানো একটা কৃতজ্ঞ নির্ভরতার আভাস ফুটে উঠতে শুরু করেছে।
খানিক বাদে ছোরাটি তুলে নিয়ে মেয়েটি গানাদোর নির্দেশ করা গুপ্ত পথ দিয়ে উঠে গুহামুখের দিকে যেতে শুরু করেছিল। গানাদো কিছু দূরে নীচেই ছিলেন দাঁড়িয়ে।
বিরাট একটি পাথরের চাঁই-এর আড়ালে মেয়েটি অদৃশ্য হবার আগে গানাদো হঠাৎ কে ডেকেছিলেন!
শোনো।
মেয়েটি একটু চমকে ফিরে দাঁড়িয়েছিল।
কয়েকটা কথা তোমায় বলে যেতে চাই, বলেছিলেন গানাদো, গুহাপথে তোমায় আমি অনুসরণ করব না। এখান থেকেই বিদায় নেব এখনই। সারাদিন আমায় নিজেদের শিবিরে থাকতে হবে। তারপর আবার রাত্রে গোপনে শিবির ছেড়ে এসে তোমায় আমি পাহারা দেব। যতদিন তোমায় এ পাপ নরক থেকে উদ্ধার করতে না পারি ততদিন এই হবে প্রতিদিনের নিয়মিত ব্যবস্থা। আজ সারাদিনের জন্যে তোমায় উপবাসীই থাকতে হবে বুঝতে পেরেছি। এখানে ঝরনাধারা বইছে। গুপ্ত পথের মুখ থেকে ভাল করে চারিদিক লক্ষ করে নিরাপদ বুঝলে তার জলে তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারো। রাত্রে আমি তোমার জন্যে আহার্য কিছু নিয়ে আসব। নিশ্চিন্ত থাকো যে তখনও গুহা মুখে আমি যাব না। কিন্তু বাইরে থেকে তোমায় ডাকা প্রয়োজন। কী নামে তোমায় ডাকব শুধু বলে দাও।
গানাদোর কথা শেষ হবার পরও মেয়েটি এতক্ষণ এমন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল যে সন্দেহ হয়েছিল সমস্ত বক্তব্য হয়তো সে বুঝতে পারেনি।
গানাদো আবার প্রশ্নটা করবেন কি না ভাবছেন এমন সময়ে মেয়েটি যেন বিষণ্ণ স্বরে বলেছিল, আমার নাম তো কিছু নেই।
নাম নেই! গানাদো বিস্ময়প্রকাশ না করে পারেননি।
না, নাম আমাদের থাকে না। মেয়েটি মৃদু কণ্ঠে বলেছিল, সূর্যকন্যা আর সেই দেবাদিদেবের সেবিকা এই আমাদের পরিচয়।
২১. মেয়েটির সমস্ত রহস্য
মেয়েটির সমস্ত রহস্য এই একটি উক্তিতেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল গানাদোর কাছে। তার অদ্ভুত অপার্থিব সৌন্দর্য, তার বেশভূষার ভিন্নতা, প্রথম যে ভাষা আপনা থেকে সে ব্যবহার করেছিল, সেই সব কিছুরই অর্থ বোঝা গিয়েছিল এবার।
মেয়েটি তাভানতিসুইয়ুর সেই পরম রহস্যে ঘেরা সূর্যসেবিকা দিব্যকুমারী সমাজের একজন।
এই সূর্যকন্যাদের কথা শুনলে প্রাচীন রোমের ভৈস্টা দেবীর মন্দিরে পূত হোমাগ্নি অনির্বাণ রাখবার ভার যাদের ওপর দেওয়া হত সেই কুমারীদের বা ভারতের দেবদাসীদের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু পেরুর দিব্যাঙ্গনা কুমারী সূর্যসেবিকারা ভেস্টাল ভার্জিন বা দেবদাসীদের থেকে বেশ একটু আলাদা।
