ইংকা নরেশের রাজপালঙ্কে সোনালি কাদার প্রলেপে ঢাকা বিশ্বাসী এক অনুচর শায়িত থাকে।
রাজ অন্তঃপুরে গোপনে আতাহুয়ালপা প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করেন অনুকূল মুহূর্তটির জন্যে। গানাদোর পরিকল্পনা এ পর্যন্ত প্রতি ধাপে আশাতীতভাবে সফল হয়েছে। এখন শুধু শেষের কটি চালই বাকি।
গানাদো ইতিমধ্যে সৌসায় না হোক, পেরুর রাজধানী কুজকোতে পৌঁছে গেছেন নিশ্চয়।
সেখানে সূর্য মন্দিরে আশ্রয় নিয়ে আতাহুয়ালপার নিজের হাতে পাকানো ও সাজানো কিপু তিনি এমন একজনের হাত দিয়ে পাঠাবেন যাকে হুয়াসকার নিজেও যেমন অবিশ্বাস করতে পারবেন না, বাধাও দিতে পারবে না তেমনই তাঁর প্রহরীরা।
হুয়াসকার-এর প্রহরীরা আতাহুয়ালপার-ই দলের লোক। কিন্তু তারা হুয়াসকারকে পরাজিত শত্রু বলেই জানে, নির্মমভাবে যাকে বন্দি করে রাখাই তাদের কাজ।
আতাহুয়ালপা যে হুয়াসকার-এর সঙ্গে মিলিত হতে চাইতে পারেন এ তারা কল্পনা করতেও পারে না। হুয়াসকার-এর সঙ্গে বাইরের যে কোনও যোগাযোগ সম্পর্কে তাই তারা অতন্দ্রভাবে সজাগ।
কিন্তু তারাও যাকে বাধা দেবে না এমন কার হাতে কিপু দিয়ে হুয়াসকার-এর কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা ভেবে রেখেছেন গানাদো?
এমন আশ্চর্য দূতটি কে?
আর কেউ নয়, মুখোশ-আটা সত্ত্বেও কিশোর বালকের মতো কমনীয় চেহারায় যে শোভাযাত্রাটির অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম হিসেবে কৌতূহলী দর্শককে সন্দিগ্ধ করে তুলে গানাদোর দলের বিপদ ডেকে আনতে পারত।
এমন সহযাত্রী গানাদো জোটালেন কোথা থেকে তাঁর দলে? কুইটো আর কুজকো সেদিনকার দুই পরম শত্রুশিবিরের দু-পক্ষের কাছেই যার অমন খাতির, কিশোর বালকের মতো চেহারায় আসলে সে কে?
তা জানতে হলে সোনা বরদারদের দলের সঙ-এর মুখোশ খুলে তাকে দেখতে হয়।
আর দেখলে নির্বাক বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ।
যেমন হয়েছিলেন গানাদো।
কবে?
আতাহুয়ালপাকে নীচ চক্রান্তে যেদিন বন্দি করা হয়, এসপানিওলদের চরম বিশ্বাসঘাতকতার সেই পৈশাচিক হত্যাতাণ্ডবের রাত্রে।
হ্যাঁ, সেই রাত্রেই আতাহুয়ালপার বিশ্রাম-শিবিরের কাছে এক অসহায় লুণ্ঠিতা নারীর আর্তধ্বনি শোনা গিয়েছিল, এসপানিওল এক পাষণ্ডের ললাটে প্রথম দেখা গিয়েছিল তলোয়ারে আঁকা এক অদ্ভুত কলঙ্ক চিহ্ন, আর কয়েক দিন বাদে সেনাপতি দে সটোর কাছে নিজের সময় কাটাবার কৈফিয়ত দিতে গিয়ে গানাদো হেঁয়ালি করে বলেছিলেন, পাছে ভেঙে যায় ভয়ে একটা স্বপ্নকে আমি পাহারা দিয়ে রাত কাটিয়েছি কাপিন।
এই তিনটি ব্যাপার একই সুতোয় বাঁধা।
পাছে ভেঙে যায় ভয়ে যে-স্বপ্নকে পাহারা দিয়ে রাত কাটাবার কথা গানাদো বলেছিলেন সে স্বপ্নকে শরীরিণীরূপে সেই রাত্রেই তিনি প্রথম দেখেছিলেন।
দেখে নির্বাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিলেন সত্যি।
সাত সমুদ্রের জল ইতিমধ্যে যথার্থই তিনি ঘেঁটেছেন, মধ্যোপসাগর থেকে আতলান্তিকের এপারে-ওপারে নারীর সৌন্দর্যের বিচিত্র প্রকাশ দেখেছেন, তবু এ রূপ যেন তাঁর কল্পনার বাইরে ছিল।
ক্ষণিকের জন্যে জ্বালা একটা মশালের আলোয় যা দেখেছিলেন তাতে নিজের প্রকৃতিস্থতা সম্বন্ধেই তাঁর সন্দেহ জেগেছিল। মনে হয়েছিল অলীক কোনও মায়াই তাঁর অস্বাভাবিক কল্পনায় সময়ের ক-টি বুদ্বুদে ভেসে উঠেছে, এখুনি বুঝি মিলিয়ে যাবে।
মশালটা নিভিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে গিয়েও ছিল যেন মিলিয়ে।
মশালটা সংগ্রহ করেছিলেন ইংকা নরেশের প্রস্রবণ-ঘেরা বিশ্রাম-শিবির থেকে শহরের প্রান্তে পর্বতপ্রাচীরের দিকে যেতে যেতে এক জায়গায় থেমে। কোনও হতভাগ্য কাকসামালকার নাগরিক সে মশাল জ্বেলে তার কোনও আপনার জনকে বোধহয় খুঁজে ফিরছিল সেই শ্মশান প্রান্তরে। হিংস্র কোনও এসপানিওল সৈনিকের হাতে নিহত তার দেহটার পাশেই পড়ে ছিল নিভে যাওয়া মশালটা।
গানাদো তাঁর তলোয়ারের উলটো পিঠ সেখানকার ছড়ানো পাথরে ঠুকে ফুলিঙ্গ বার করে অনেক কষ্টে মশালটা ধরিয়েছেলেন শুধু মৃত্যুর চেয়ে নিদারুণ নিয়তি থেকে যাকে তখনকার মতো উদ্ধার করতে পেরেছেন তার সত্যকার অবস্থাটা এক পলকে দেখে একটু বুঝে নেবার জন্যে।
পাষণ্ড এসপানিওল সেপাই তার বন্দিনীকে ঘোড়ার ওপর বেঁধে রেখেছিল।
সেই ঘোড়াই চালিয়ে গানাদো প্রস্রবণ-শিবির থেকে কাক্সামালকার পর্বত-বেষ্টনীর দিকে বেশ কিছুদূর যাবার পর থেমেছিলেন। থেমেছিলেন, ঘোড়ার পিছে বাঁধা বন্দিনী জীবিত কি মৃত, বুঝতে না পেরে।
সন্তর্পণে বাঁধন খুলে বন্দিনীকে তারপর তিনি মাটিতে নামিয়েছিলেন।
বন্দিনীকে বাঁধন খুলে পার্বত্যভূমির ওপর নামাবার সময় যেটুকু স্পর্শ লেগেছিল, তাতে গানাদো বুঝেছিলেন যে, অচৈতন্য অসাড় হলেও দেহে প্রাণ তখনও আছে। কিন্তু সে-প্রাণ ওষ্ঠসীমায় এসে পৌঁছেছে কি না, আর কতক্ষণ সেখানেই বা থাকবে,
সেইটেই ভাবনার বিষয় হয়েছিল।
অন্ধকার তখন চোখে কিছুটা সয়ে এসেছে। বন্দিনীকে মাটিতে নামাবার পর কিছুদূরেই একটি মৃতদেহ দেখতে পেয়ে অস্বস্তিভরে বন্দিনীকে আবার একটু সরাতে যাচ্ছেন এমন সময় নেভানো মশালটা চোখে পড়েছিল।
সেই রাত্রে হত্যাকাণ্ডের ওই মশান-প্রান্তরে মশাল জ্বালা কোথাও নিরাপদ নয়। তবু সে বিপদের ঝুঁকি গানাদো নিয়েছিলেন শুধু বন্দিনীর অবস্থাটা তাঁর না বুঝলেই নয় বলে।
অনেক কষ্টে মশালটা জ্বালাবার পর বিহ্বল এক বিস্ময় ছাড়া আর সব ভাবনাই তাঁর মন থেকে মিলিয়ে গিয়েছিল অবশ্য।
