বেশ কয়েকটি মুহূর্ত কেমন একটা অবর্ণনীয় মুগ্ধ বিহ্বলতায় কাটাবার পর তাঁর হুঁশ ফিরে এসেছিল।
মূৰ্ছিতার চোখ-মুখের ভাব আর নাড়ির গতি পরীক্ষা করে তিনি তাড়াতাড়ি মশালটা নিভিয়ে দিয়েছিলেন।
যেটুকু তিনি দেখেছেন তাতে বন্দিনী সম্বন্ধে একেবারে হতাশ হবার কিছু পাননি। সযত্নে উপযুক্ত শুশ্রুষা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করলে এখনও তাকে বাঁচানো যেতে পারে।
কিন্তু কোথায় সে ব্যবস্থা করবেন।
কাঞ্চন আর কামিনীলোলুপ, লুণ্ঠন হত্যা আর ধর্ষণের নেশায় উন্মত্ত পিশাচদের দৃষ্টির আড়ালে কোথায় এ স্বপ্নমূর্তিকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব?
বন্দিনীর শুধু রূপ নয়, তার পরিচ্ছদ অলংকারও ওই কয়েক মুহূর্তের আলোয় দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন গানাদো।
এ রাজ্যে আসবার পর প্রায় সব শ্রেণীর নারী-পুরুষই তাঁর চোখে পড়েছে। দরিদ্র সাধারণ থেকে সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারের বহু সুন্দরী তিনি দেখেছেন। অল্পবিস্তর তাদের বেশভূষাও লক্ষ করেছেন।
বন্দিনীর বেশভূষা তাদের থেকে বেশ একটু ভিন্ন। কামালকা নগরে শাপভ্রষ্টা সুরসুন্দরীর মতো এ মূর্ত স্বপ্ন কোথায় ছিল লুকোনো? কোথা থেকে পাষণ্ড এসপানিওল সৈনিক তাকে লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছিল!
ঘটনা বিচার করে গানাদোর মনে হয়েছেনগরে হত্যাতাণ্ডব শুরু হবার পর বন্দিনী বোধহয় কোনও সঙ্গী দলের সাহায্যে নগর থেকে পালাবার জন্যে বার হয়ে পড়েছিল। তারপর নারীমাংসলোপ এসপানিওল সৈনিকের দৃষ্টিতে পড়ে তার এই দশা হয়েছে। তার সঙ্গীরা হয়তো সবাই নিহত। রক্ষা কেউ যদি পেয়েও থাকে তারা এখন পলাতক।
বন্দিনীকে কারও হাতে সমর্পণ করবার সুতরাং উপায় নেই। তাকে শুশ্রুষায় সুস্থ করে তোলবার চেষ্টা গানাদোকে করতে হবে।
একটা নির্জন নিরাপদ গোপন আশ্রয় তার জন্যে অবিলম্বে প্রয়োজন।
ব্যাকুল হয়ে সেরকম আশ্রয়ের কথা ভাবতে গিয়ে গানাদোর হঠাৎ তাঁর সেইদিনকার সকালের টহলদারির কথাই মনে পড়েছে।
কামালকা নগর যে উপত্যকার ওপর বসানোে সেদিন সকালেই তার চারিদিকের উত্তুঙ্গ পর্বতপ্রাচীর কতখানি দুর্ভেদ্য গানাদো ঘোড়ায় চড়ে তা দেখতে বেরিয়েছিলেন।
উপত্যকা ঘিরে রাখা পাহাড়গুলোর তলায় তলায় ঘুরেওছিলেন বেশ বেলা পর্যন্ত আর তার জন্যেই আতাহুয়ালপার পিজারোকে দর্শন দিতে আসবার সংকল্প আর পিজারোর তারই ওপর পৈশাচিক আয়োজনের কথা আগে থাকতে জানতে পারেননি। এসপানিওল শিবিরের ভেতর থেকে নয়, বাইরের পেরুবাসী দর্শকদের মধ্যে থেকে এসপানিওলদের হাতে ইংকা নরেশের বন্দিত্বের অবিশ্বাস্য করুণ কুৎসিত নাটকটা তাঁকে দেখতে হয়েছিল নিরুপায়ভাবে।
সারা সকালের টহলদারিতে গানাদো কাক্সামালকার পর্বতপ্রাচীরে গোপন কোনও গিরিবর্ত্য অবশ্য পাননি, কিন্তু এমন একটা কিছু দেখেছিলেন যা সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে ভাগ্যের আশাতীত দান বলে মনে হয়।
উপত্যকার বেষ্টনীস্বরূপ একেবারে অলঙ্ঘ্য পাহাড়ের নানা খাঁজ গোপনপথের খোঁজে পরীক্ষা করতে গিয়ে গানাদো এক জায়গায় একটি গুহা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। গুহাটি পাহাড়ের খাঁজের আড়ালে এমনভাবে লুকোনো যে, গুপ্তপথ জানা না থাকলে অত্যন্ত কাছ দিয়ে যাতায়াত করলেও তার হদিস পাওয়া যায় না।
গানাদো গুহাটির সন্ধান যে পেয়েছিলেন, তাও নেহাত দৈবাৎ।
কিংবা তাঁর নিয়তিই ভাবী সম্ভাবনার কথা স্মরণে রেখে তাঁকে এই অপ্রত্যাশিত আবিষ্কারের সুযোগ দিয়েছিল বলতে ইচ্ছে করে।
গুহাটার কথা মনে হওয়ার পর গানাদো আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেননি। বন্দিনীকে ঘোড়ার পিঠে তুলে তৎক্ষণাৎ রওনা হয়েছিলেন সেই গোপন গুহার সন্ধানে।
কিন্তু দিনের আলোতেই যে গোপন গুহার প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়া কঠিন, রাতের অন্ধকারে তা চিনে বার করবার আশাই বাতুলতা।
ঘোড়া চালিয়ে পর্বতপ্রাচীরের কাছে পৌঁছে কিছুক্ষণ বৃথা চেষ্টার পরই গানাদো নিরস্ত হয়েছিলেন।
দিনের আলোর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় তাঁর নেই।
ছোট একটি ঝরনা-ধারার ধারে বন্দিনীকে নামিয়ে কিছুটা নরম বালির শয্যায়। শুইয়ে রেখে গানাদো ঘোড়াটাকে একটু মৃদু চাপড় মেরে ছেড়ে দিয়েছেন। ছাড়া পাওয়া মাত্র ঘোড়াটা নিজে থেকেই ছুটে শহরের দিকে চলে গেছে।
ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিয়ে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছেন গানাদো। জায়গাটা বেশ নির্জন ও নিরাপদ। রাতের অন্ধকারে কারও এদিকে আসার সম্ভাবনা অল্প। এলেও সহজে কেউ সন্ধান পাবে না। ঘোড়াটা সঙ্গে থাকলে তার আকস্মিক ডাক বা পায়ের শব্দে ধরা পড়ার যেটুকু ভয় ছিল, তাও এখন নেই। নিঃশব্দে এখন শুধু রাত ভোর হবার জন্যে অপেক্ষা করে থাকাই আসল কাজ। আলো ফুটলে গোপন গুহাপথ খুঁজে বার করা কঠিন হবে না বলেই মনে হয়। খুঁজে বার করার অসুবিধা বুঝেই গানাদো আশ-পাশের পাহাড়ের কিছু বৈশিষ্ট্যের চিহ্ন মনে করে রেখেছিলেন। দিনের আলোয় দেখলেই। সেগুলি চিনতে পারবেন এ বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না।
২০. দিনের আলোর জন্যে অপেক্ষা
দিনের আলোর জন্যে অপেক্ষা করা কিন্তু সে রাত্রে এক দুঃসহ ধৈর্যের পরীক্ষা বলে মনে হয়েছিল।
মূৰ্ছিতা বন্দিনীকে বালির ওপর শোয়াবার পরে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে প্রথমে ঝরনার জলে মুখে চোখে ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করেছিলেন গানাদো।
জ্ঞান তাতে ফেরেনি। মেয়েটির গলায় একটা অস্ফুট গোঙানিই শুধু শোনা গিয়েছিল।
