এ আবার কী চিকিৎসা! সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছেন পিজারো।
এ-ই হল ইংকা রাজ্যের চিকিৎসা। দোভাষীর মারফত জানিয়েছেন রাজবৈদ্য। রাজবৈদ্য আর কেউ নয়, পাউলো টোপা।
হ্যাঁ, ইনি সেই পাউল্লাে টোপা যাঁর পরিবারের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে স্বয়ং ভীরাকোচাই বুঝি এক এসপানিওল পাষণ্ডকে চরম শাস্তি দিতে নেমে এসেছিলেন।
গানাদো আতাহুয়ালপাকে উদ্ধার করবার যে চক্রান্ত করেছেন তাতে বিশ্বাস করে একজনকেই শুধু দলে নেওয়া হয়েছে। পাউলো টোপা-কে।
পাউলো টোপাও সম্ভ্রান্ত নাগরিক। তাঁর শরীরেও ইংকা রক্ত বয়। কিন্তু শুধু সে জন্যে তাঁকে এতখানি বিশ্বাস করা হয়নি। বিশ্বাস করা হয়েছে ভীরাকোচা ও তাঁর মুখপাত্র বলে নিজেকে যিনি প্রমাণ করেছেন সেই গানাদোর প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া টোপার পক্ষে সম্ভব নয় জেনে।
পাউলো টোপা এ বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছেন। কেমন করে রেখেছেন তা পরে যথাস্থানে জানা যাবে।
আপাতত গানাদোর কূট-কৌশল সব দিক দিয়েই সফল হয়েছে!
দ্বিতীয় দিনের পর তৃতীয় দিন পিজারো আতাহুয়ালপাকে দেখতে এসে বিরক্তই হয়েছেন।
আতাহুয়ালপার মুখ-হাত-পা সব যেন সোনালি মাটিতে পলস্তারা করা।
চোখ, নাক আর মুখের হাঁ-টুকু বাদে সমস্ত মুণ্ডটা একটা যেন সোনালি কাদার তাল। তার ভেতর থেকে আতাহুয়ালপার গলার স্বরেই শুধু তাঁকে চেনা গেছে।
গলার রুদ্ধ স্বর সেদিন কিছুটা খুলেছে। এটা চিকিৎসার গুণ বলেই দাবি করেছেন রাজবৈদ্য।
এ আসুরিক চিকিৎসা কতদিন আর চলবে? বিরক্ত হয় জিজ্ঞাসা করেছেন পিজারো। চিকিৎসার গুণ পুরোপুরি কবে বোঝা যাবে জানতে চেয়েছেন।
চলবে দক্ষিণায়নের শেষ দিন পর্যন্ত। দোভাষী মারফত জানিয়েছেন রাজবৈদ্যবেশী টোপা, সূর্যদেবের উত্তরায়ণের প্রথম দিন রেইমির উৎসব শুরু হলেই ইংকা নরেশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে বসবেন। সকাল-সন্ধ্যায় সূর্যদেবের অনুগত পার্শ্বচর হয়ে যে সেবা করে দেবকিশোর সেই চাস্কা আতাহুয়ালপার প্রতি ঈর্ষায় তাঁর গলার স্বর চুরি করে পাতালে লুকিয়ে রেখে এসেছে। সূর্যদেব দক্ষিণায়নের শেষ সীমায় পৌঁছে সে স্বর খুঁজে নিয়ে আতাহুয়ালপাকে ফিরিয়ে দেবেন, রেইমি-র উৎসবের দিন সূর্যদেব উত্তর আকাশে আরোহণের প্রথম ধাপে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে যাতে আতাহুয়ালপা তাঁকে বন্দনা করতে পারেন। আর–
ঠিক আছে। ঠিক আছে! ইংকা পুরাণের হিং টিং ছটে ধৈর্য হারিয়ে প্রায় ধমকের সঙ্গে বাধা দিয়ে পিজারো দোভাষীকে বলেছেন, রেইমি-র উৎসবের পরেই একদিন আসব দেখা করতে। তখনও যদি তোমাদের ওই চাস্কা না কার কাছ থেকে ইংকা নরেশের গলার স্বর না উদ্ধার হয় তাহলে এই সোনার গুঁড়ো মেশানো মাটির তাল ঠেসে ওই রাজবৈদ্যের গলাই বুজিয়ে দেব বলে দাও।
পিজারো বিরক্ত হয়ে আতাহুয়ালপার মহল ছেড়ে গেছেন।
রাজবৈদ্য সেজে টোপা তাঁকে হিং টিং ছট পুরাণই শুনিয়েছেন সত্য, কিন্তু সূর্যের পার্শ্বচর সেবায়েত চাস্কা-র নামটা মিথ্যে করে বানানো নয়। পেরুতে শুকতারা ও সন্ধ্যাতারারূপী শুক্র গ্রহকে চাস্কা নামে কমনীয় দেবকিশোররূপেই কল্পনা করা হয়।
রেইমি উৎসবের দিনটা উল্লেখ করবার মধ্যেও একটা গূঢ় অর্থ আছে।
আর মাত্র কয়েকদিন বাদেই সূর্যের দক্ষিণায়ন শেষ হবার তারিখ। পেরুর রেইমি উৎসব তার পর দিন থেকেই শুরু। তার আগে তিন দিন ধরে সমস্ত পেরু রাজ্যে অরন্ধন। কোথাও কোনও বাড়িতে কারও উনুন এই তিন দিন জ্বালানো হয় না।
রেইমি উৎসবের প্রথম দিনে উত্তরায়ণের প্রথম সূর্যোদয় দেখবার জন্যে সমস্ত পেরুবাসী যে যেখানে আছে সক্ষম হলে ভোরের আগে মুক্তাকাশের তলায় পূর্ব দিগন্তে উৎসুকভাবে চেয়ে থাকবে।
উদয়-দিগন্তে সূর্যের প্রথম রক্তিম রেখাটুকু দেখার মতো পুণ্য আর কিছু নেই।
সেই সূর্যোদয় দেখবার সরব আনন্দোচ্ছ্বাসে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে উঠবে তখন। তার পর সারাদিন চলবে উৎসব-মত্ততা।
গানাদো আতাহুয়ালপার কাক্সামালকা ত্যাগের জন্যে এই দিনটিই স্থির করে দিয়ে গেছেন।
পরাধীনতার গ্লানি সত্ত্বেও পেরুর মানুষ এ দিনটিতে উৎসব-মত্ত হবেই।
সেই উৎসব-মত্ত নগরের বিশৃঙ্খলার ভেতর আতাহুয়ালপার নিঃশব্দে আত্মগোপন করে কাক্সামালকার সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত সহজ।
একবার কাক্সামালকা ছাড়িয়ে কুজকো যাবার রাস্তা ধরতে পারলে আর কোনও ভাবনা নেই।
পথে এমন সব গুপ্ত আশ্রয় আছে ইংকা নরেশদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত পার্শ্বচর ছাড়া যার সন্ধান কারও জানবার কথা নয়।
আতাহুয়ালপার শরীরে ইংকা রাজরক্ত থাকলেও তিনি কুইটোর যুবরাজ। এ সব গুপ্ত আশ্রয়ের রহস্য তাঁর অজানা।
কিন্তু তাঁকে সাহায্য করবার জন্যে আছেন পাউললো টোপা। সোনা-বরদার। শোভাযাত্রীদের একজন হয়ে টোপাই তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। পূর্বেকার ইংকা নরেশ হুয়াসকার-এর বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে সমস্ত গুপ্ত আশ্রয় তাঁর জানা। একবার কামালকা থেকে বার হতে পারলে এসপানিওল বাহিনীর তাই সাধ্য নেই তাঁদের ধরবার।
শুধু তাই নয়, আতাহুয়ালপা বিদেশি শ্বেতদানবের কবল থেকে ছাড়া পেয়েছেন জানলে সমস্ত পেরু রাজ্য দুলে উঠবে উত্তেজনায়। যেখান দিয়ে আতাহুয়ালপা তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে যাবেন সেখানেই জ্বলে উঠবে প্রতিরোধের প্রচণ্ড আগুনের বেষ্টনী, এসপানিওলদের পক্ষে যা ভেদ করা অসম্ভব।
সূর্যের উত্তরায়ণের আর মাত্র কটা দিন বাকি।
