কামালকা থেকে কুজকো যাবার রাস্তায় প্রতিদিন একটা করে অন্তত মিছিল যায় আসে। তার মধ্যে একটা বিশেষ দলকে কে আর লক্ষ করেছে।
লক্ষ করলেই বা বুঝত কী! সেই মুখোশ পরে সং সাজা রংবেরং-এর পোশাক পরা ভেঁপুর মতো বাঁশি আর করতালের মতো বাজনা নিয়ে একদল আধা নাচের ভঙ্গিতে চলেছে।
হ্যাঁ, একটা ব্যাপার লক্ষ করবার মতো ছিল বটে। মুখোশ আঁটা নানা রং-এর প্রায় ঘেরাটোপ পরা একটা নেহাত ছোটখাটো পাতলা দুবলা চেহারা। একেবারে বাচ্চা। ছেলেই মনে হয়। এত অল্পবয়সের কেউ সাধারণত এ সব সোনাবরদার মিছিলে থাকে না।
কিন্তু থাকলে দোষও কিছু নেই। বুড়োবুড়ি ছাড়া ছেলে-ছোকরার এ দলে থাকা বারণ তো আর নয়! কারও চোখে পড়লে তা নিয়ে জেরা সে করতে পারত না সুতরাং। এসপানিওলরা তো নয়ই। কারণ তারা এ সব মিছিলের নিয়মকানুন কী আর জানে!
কিন্তু লক্ষই যখন কেউ করেনি তখন সন্দিগ্ধ হবে কে? আর এ দলের পক্ষে বেমানান এই ছেলে-ছোকরার মতো চেহারা যদি নজরে না পড়ে থাকে তাহলে তার সঙ্গী হিসেবে আর কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি নিশ্চয়।
না বলতেই বোঝা গেছে বোধহয় যে গানাদো এই দলের সঙ্গে সোনাবরদার সেজেই কামালকা থেকে উধাও হয়েছেন। উধাও হয়েছেন কুজকোর পথে। কুজকো কাক্সামালকার খুব কাছাকাছি নয়। পথও বেশ দুর্গম। তবে ইংকা স্থপতিরা। সেখানে পাহাড় কেটে পথ বানাবার এমন আশ্চর্য বাহাদুরি দেখিয়েছেন, তখনকার ইউরোপে অন্তত যার তুলনা ছিল না।
এ পথে তখনও পর্যন্ত ইংকা সাম্রাজ্যের নিজস্ব দৌড়বাজ হরকরার ব্যবস্থা চালু আছে। পেরুর উত্তর থেকে দক্ষিণপ্রান্ত আর সাদা তুষারের পাহাড়ের রাজ্য থেকে মরুর মতো ধূ-ধূ পশ্চিম সমুদ্র তীরের নগর বসতি পর্যন্ত এই ডাকবিলির ব্যবস্থা সে যুগের এক বিস্ময়। দৌড়বাজ ডাক-হরকরা প্রতিদিন অবিশ্বাস্য তৎপরতার সঙ্গে রাজ্যের সংবাদ ও ইংকা নরেশের আদেশ সর্বত্র বহন করে নিয়ে যায়।
এই দৌড়বাজ হরকরাদের পর পর হাতফেরতা হয়ে ডাকবিলি হত অবশ্য। রিলে রেস-এর মতো এক হরকরার দৌড় যেখানে শেষ সেখানে আর-এক হরকরা তৈরি থাকত তার বার্তা নিয়ে ছুটে যাবার জন্যে।
এই ব্যবস্থা সত্ত্বেও কামালকা থেকে কুজকোয় ডাক পৌঁছোতে পাঁচ দিন অন্তত লাগত।
সোনাবরদার শোভাযাত্রীদের দলের সঙ্গে গানাদোর কুজকো পৌঁছোতে আরও বেশি কিছুদিন লাগা তাই স্বাভাবিক।
কুজকো শুধু নয়, সেখান থেকে সৌসা পর্যন্ত পৌঁছোতে যে সময় লাগতে পারে, তার হিসেব ধরেই গানাদো আতাহুয়ালপার অন্তর্ধানের সব ব্যবস্থা পাকা করে ছকে রেখে গেছেন।
সৌসায় পৌঁছেই দূত হিসাবে বিশ্বাসী দৌড়বাজ হরকরাদেরই একজনকে। হুয়াসকার-এর পাঞ্জা দিয়ে আতাহুয়ালপার কাছে গোপন খবর দেবার জন্যে পাঠানো হবে।
আতাহুয়ালপা কিন্তু কামালকাতেই তার অপেক্ষায় বসে থাকবেন না। গানাদো যেদিন থেকে নিরুদ্দেশ তার ঠিক গুণে গুণে একপক্ষকাল বাদে তিনি কামালকা থেকে রওনা হয়ে পড়বেন। কুজকোর দূতের সঙ্গে মাঝপথেই যাতে তাঁর দেখা হয়।
আতাহুয়ালপা রওনা হবেন ওই সোনাবরদার দলের শোভাযাত্রী হয়েই অবশ্য। কিন্তু অতিথি-মহল্লার বন্দিশালায় যারা তাঁকে দিনরাত পাহারায় রাখে সেই এসপানিওল সেপাইদের দৃষ্টি তিনি এড়াবেন কী করে?
যদি বা কিছুক্ষণের জন্যে তাদের ফাঁকি দিয়ে অতিথি-মহল্লার বন্দিশালা থেকে শোভাযাত্রী সেজে পথে বেরিয়ে পড়তে পারেন, তারপর যথাস্থানে তাঁকে না দেখতে পেলে হুলস্থুল তো বাধবেই।
গানাদোর বেলা যা হয়েছিল তার চেয়ে সহস্র গুণ বেশি নিশ্চয়ই। আতাহুয়ালপা আর গানাদো তো এক নয়। আতাহুয়ালপা তাঁর চোখের ওপর থেকে নিরুদ্দেশ হলে পিজারো আর প্রকৃতিস্থ থাকবেন কি না সন্দেহ। ক্ষিপ্ত হয়ে সমস্ত পেরু রাজ্য তোলপাড় করে ফেলবেন নিশ্চয়।
গানাদোর পক্ষে যা সম্ভব হয়েছিল আতাহুয়ালপার পক্ষে সেইরকম শুধু রংবেরং-এর পোশাক মুখোশ এঁটে এসপানিওলদের চোখে ধূলো দেওয়া বোধহয় সম্ভব হবে না। কামালকা থেকে বার হতে পারলেও কুজকোর পথেই তিনি ধরা পড়ে যাবেন।
সৌসায় পৌঁছে হুয়াসকার-এর সঙ্গে যতক্ষণ না মিলিত হতে পারছেন ততক্ষণ পর্যন্ত অতিথি-মহল্লা থেকে তাঁর অন্তর্ধানটা পিজারো আর তাঁর সহচর অনুচরদের কাছে গোপন রাখবার ব্যবস্থা তাই না করলেই নয়।
কেমন করে তা সম্ভব?
সম্ভব যেভাবে হতে পারে তার কূট-কৌশলও বলে দিয়ে গেছেন গানাদো।
গানাদোর অন্তর্ধানের কয়েকদিন বাদে পিজারো হুয়াসকার-এর প্রস্তাব সম্বন্ধেই আতাহুয়ালপার সঙ্গে আলোচনা করতে এসে বিস্মিত ও হতাশ হয়েছেন।
আতাহুয়ালপা শয্যাশায়ী না হলেও অত্যন্ত অসুস্থ। রাজাসনে বসেই তিনি পিজারোর সঙ্গে কথা বলবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অসুস্থতার জন্যে তাঁর কণ্ঠ এমন রুদ্ধ যে তা থেকে কোনও আওয়াজই বার হয়নি। অতি কষ্টে তিনি পিজারোকে পরের দিন আসবার অনুরোধটা শুধু করতে পেরেছেন।
পরের দিন অবস্থা আরও খারাপই দেখা গেছে। আতাহুয়ালপা সেদিন শয্যাশায়ী। গলার স্বর সম্পূর্ণ রুদ্ধ। ইংকা পরিবারের রাজবৈদ্য তাঁর শয্যাপার্শ্বে দোভাষীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছেন। ব্যবস্থা বেশ একটু অদ্ভুত লেগেছে পিজারোর। আতাহুয়ালপার শয্যার পাশে এক তাল সোনার গুঁড়ো মেশানো কাদামাটির তাল।
রাজবৈদ্য সেই মাটি চাপড়া চাপড়া করে আতাহুয়ালপার মুখে মাথায় লাগাচ্ছেন।
