এক সন্ধ্যায় এক সন্ন্যাসী দু-একটি শিষ্যসামন্ত নিয়ে ওই চাষির ঘরে আশ্রয় নেয়। কুটিরের কত্রী বৃদ্ধা কৃষক-জননী সাধু-সন্ন্যাসীদের ভাল করে খেতে না দিতে পারার আফশোশে শিবাজি আর তাঁর সেনাদলকে প্রাণভরে গালাগাল দেয়। কিছুদিন আগেই শিবাজির এক লুঠেরা দল সে-গ্রাম লুণ্ঠন করে গেছে।
সন্ন্যাসী আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ নীরবে এসব অভিযোগ শুনে পরের দিন সকালে বিদায় নেয়। কিন্তু কিছুকাল বাদেই শিবাজির রাজদরবার থেকে ডাক আসে ওই পরিবারের। প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়ে সে চাষি পরিবার সভয়ে গিয়ে হাজির হয় শিবাজির রাজসভায়। সেখান থেকে কল্পনাতীত উপহার নিয়ে তারা ফেরে। সৈনিকরা যা তাদের লুঠ করেছিল, শিবাজি তার চতুগুণ তাদের দান করেছেন।
এ-সব কাহিনী আওরঙ্গজেবের কাছেও পৌঁছে তাঁকে বিভ্রান্ত করে তুলেছে। ১৬৬৬-র ১৪ই নভেম্বর যে আখবরাত দিল্লি এসে পৌঁছোয়, তার খবরের সঙ্গে এসব বিবরণের কোনও সামঞ্জস্যই হয় না। আখবরাত-এর খবর হল, শিবাজি আগ্রা থেকে পালাবার পঁচিশ দিন বাদে ১২ই সেপ্টেম্বর রাজগড় পৌঁছেছেন। পোঁছে বেশ কয়েকদিন তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন, তারপর সেরে উঠে আবার অসুখে পড়েছেন।
আখবরাত-এর খবর সত্যি হলে সমস্ত ব্যাপারটা দুর্ভেদ্য রহস্য হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে হয়েছে আওরঙ্গজেব-এর। রাজগড় থেকে মোগল গুপ্তচর শিবাজির রাজধানীতে ফেরার যে-খবর পাঠিয়েছে, তা আওরঙ্গাবাদের খুফিয়ানবিশের কাছে পৌঁছোতে লেগেছে অন্তত পাঁচ দিন। আর আওরঙ্গাবাদ থেকে দিল্লি পর্যন্ত আখবরাত আসতে একুশ দিন। তার আগে শিবাজির দুবার অসুখে পড়ার সময় ধরলে সবসুদ্ধ কমপক্ষে দু-মাস আগে শিবাজির রাজগড়ে পৌঁছোনো মিথ্যে নয় বলেই মনে হয়। কিন্তু তা কী করে সম্ভব?
এ-সমস্যার সমাধান না করতে পেরে আওরঙ্গজেব আওরঙ্গাবাদের খুফিয়ানবিশ-এর কাছে কড়া চিঠি পাঠিয়েছেন তার খবরটা খাঁটি কি না ভাল করে যাচাই করে জানবার জন্যে। কিন্তু খুফিয়ানবিশ-এর কোনও জবাব আসেনি। তাকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি আওরঙ্গাবাদে। আর-এক গভীর রহস্য সৃষ্টি করে সেও হঠাৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
১৬৬৬-র উনিশে আগস্ট সুতরাং সামান্য তারিখ নয়। আগ্রা শহর টলমল করে উঠে মোগল সাম্রাজ্যের বনেদে ফাটল দেখা দিয়েছে সেইদিনই।
অনেক দুঃখে ভারতসম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁর শেষ ইচ্ছাপত্রে লিখে গেছলেন: রাজশক্তির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল রাজ্যে যা-কিছু ঘটছে, সবকিছুর খবর রাখা,নইলে এক মুহূর্তের গাফিলতিতে চিরকাল আফশোশ করতে হয়। দেখো, উপযুক্ত হুঁশিয়ারির অভাবে শিবাজি সেই যে পালিয়েছিল, তারই জন্যে অন্তিমকাল পর্যন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহের জ্বালা আমার ঘুচল ন।
কিন্তু সত্যিই আওরঙ্গজেবের শিবাজি সম্বন্ধে হুঁশিয়ারির কিছু ত্রুটি ছিল কি?
মনে হয় না। শিবিরে শিবাজিকে দিবারাত্রি পাহারা দিয়েছে রামসিং-এর রাজপুত অনুচরেরা। শিবিরের বাইরে এক মীর আতিশ-এর অধীনে তোপদার এক বিরাট সেনাদল সারাক্ষণ সজাগ থেকেছে! এই বেষ্টনী ভেদ করে শিবাজি পালিয়েই বা যাবে কোথায়!
আগ্রার পথঘাটে সেই কথাই আলোচনা করেছে বড়-ছোট সবাই।
৪.
শিবাজির পলায়নের কয়েক দিন আগেকার কথা। শহর-কোতোয়াল সিদ্দি ফুলাদ-এর বাড়ি এসেছিল মীর-ঈ-ইমার একটা জরুরি তলব পেয়ে।
সিদ্দি ফুলাদ ক-টা বিশ্বাসী ও চৌকস হালালখোর অর্থাৎ ময়লা সাফ করার মেথর চেয়েছেন মীর-ঈ-ইমারৎ-এর কাছে।
শহর-কোতোয়ালের সামান্য ক-টা ঝাড়ুদারের জন্যে মীর-ঈ-ইমারকে কেন তলব দিতে হয়, তা বুঝতে তখনকার দস্তুর একটু জানতে হয়। প্রত্যেক মহল্লায় বাড়ি-ঘর সাফ করবার ঝাড়ুদারেরাই ছিল কোতোয়ালের গুপ্ত খবর সংগ্রহের প্রধান। চর।
কোন মহল্লায় কার বাড়ির জন্যে হালালখোর দরকার, শুনে মীর-ঈ-ইমার-এর ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে উঠেছে।
সে-হাসি ফুলাদ-এর দৃষ্টি এড়ায়নি। অন্য কেউ শহর-কোতোয়াল হলে সামান্য মীর-ঈ-ইমার-এর এ-বেয়াদপি সহ্য করতেন না। সিদ্দি ফুলাদ মানুষটা কিন্তু খুব খারাপ নয়। মনটা তাঁর খোলামেলা। তা ছাড়া মীর-ঈ-ইমারকে তিনি একটু অন্য চোখে না দেখে পারেন না। তার প্রতি গোপন একটা কৃতজ্ঞতা শহর-কোতোয়ালের আছে।
সিদ্দি ফুলাদ তাই একটু কপট রাগে ভুরু কুঁচকে বলেছেন, হাসছ যে বড়, বচনরাম! হাসবার কী আছে এতে? রামসিং-এর বাড়ি হালালখোর দরকার হয় না?
হবে না কেন, কোতোয়ালসাহেব! বচনরাম হাসিটুকু মুখ থেকে না মুছে ফেলেই বলেছে, তবে রামসিং বাহাদুরের জন্যে তো নয়, হালালখোর কার জন্যে লাগাতে হচ্ছে, তা তো জানি। ওই একটা নেংটিকে সামলাতে এত হাঁসফাঁস দেখে তাই একটু হাসি পায়। তাও যে-নেংটি তার আপনার গর্তে নেই, খোদ শের-ই-হিন্দুস্তানের ডেরায় নাক বাড়াতে এসে জাঁতাকলে বন্দি। জাঁতাকল ছাড়িয়ে যদি পালায়ও, তাহলে হবে কী? শাহানশাহ্-এর বিরাট রাজত্বের কোণে কানাচে পাহাড়ে-জঙ্গলে কোথায় একটা-দুটো নেংটি-নেউল চরে বেড়ায় তা কি মোগল-সাম্রাজ্যের মাথা ঘামাবার বিষয়!
সিদ্দি ফুলাদ বচনরামের দিকে চেয়ে তার অজ্ঞতায় একটু অনুকম্পার হাসিই হেসেছেন। বলেছেন, নেংটি যাকে বলছ, সে যে কী জিনিস, তাহলে জানো না, বচনরাম। ওই নেংটির দাপটে সমস্ত দক্ষিণ ভারতে থরহরিকম্প লেগেছিল, বিজাপুর রাজ্য যায়-যায়, জাঁদরেল সব মোগল সেনাপতিরা নাকের জলে চোখের জলে হয়েছে এই শিবাজির রণকৌশলে। ওকে তাই অনেক ফন্দি করে মিথ্যে টোপ দেখিয়ে আগ্রায় এনে পোরা হয়েছে। একবার এখান থেকে ছাড়া পেলে ও কী সর্বনাশ করতে পারে কেউ জানে না!
