কী, বলছ কী তুমি! যেন একটু অধৈর্যের সঙ্গে বলেছেন আতাহুয়ালপা, ভীরাকোচার নাম নিয়ে তামাশা করছ কোন সাহসে!
তামাশা করিনি, সম্রাট! গানাদো দৃঢ়স্বরে বলেছেন, সত্য কথাই বলছি যে, ভীরাকোচাই পাউলো টোপাকে চরম অপমান থেকে রক্ষা করবেন।
একদিকে যেমন বিস্ময়বিমূঢ় আর একদিকে তেমনই ক্রুদ্ধ উত্তেজিত হয়ে আতাহুয়ালপা জ্বলন্তস্বরে পাউলো টোপাকেই জিজ্ঞাসা করেছেন, এ এসপানিওল তোমার দুর্ভাগ্যের কথা যা বলছে তা সত্য টোপা!
হ্যাঁ সত্য, সম্রাট!নত আরক্তমুখে স্বীকার করেছে পাউলো টোপা।
কিন্তু ভীরাকোচার পবিত্র নাম নিয়ে যে আশ্বাস দিচ্ছ, তা যদি শুধু মিথ্যে দম্ভ হয়— গানাদোর দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে যেন বিদ্ধ করে আতাহুয়ালপা প্রশ্নটা অসমাপ্তই রেখেছেন।
তাহলে আমায় প্রতারক গুপ্তচর বলেই বুঝবেন? কুণ্ঠাহীন গলায় বলেছেন গানাদো, আমি কতখানি বিশ্বাসের যোগ্য আমার এই দাম্ভিক আস্ফালনই তার প্রমাণ দিক।
তার পরদিন সত্যিই সে প্রমাণ পেয়েছিলেন আতাহুয়ালপা, গাল্লিয়েখো নামে সেই পাষণ্ড এসপানিওল সৈনিকের অবিশ্বাস্য লাঞ্ছনায়।
আতাহুয়ালপা বিস্ময়বিমূঢ় হয়েছিলেন সত্যিই, কিন্তু গানাদোকে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করা আর তাঁর পক্ষে কঠিন হয়নি।
বিশ্বাস যে তাঁর অপাত্রে পড়েনি তার প্রমাণ এর পর পদে পদে পাওয়া গেছে। যা প্রায় কল্পনাতীত ছিল গানাদোর নিখুঁত চাল সাজাবার গুণে সম্ভব হয়েছে। আশ্চর্যভাবে।
সোনার ঢিবি উপহার দেবার টোপ বিফল হয়নি। অসন্দিগ্ধভাবে পিজারো সে টোপ গিলেছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে তাই দিয়েই।
সে বড় সমস্যা কী? চারদিকে দুর্লঙ্ঘ্য পাহাড়ের প্রাচীরে ঘেরা কামালকা থেকে এসপানিওল বাহিনীর সজাগ পাহারা এড়িয়ে বার হওয়া।
সেই সমস্যার কিনারাই করেছেন গানাদো সোনার কাঁড়ির প্রলোভন দেখিয়ে।
তা না করতে পারলে পিজারোর পাহারাদারদের একরকম চোখের ওপর দিয়ে গানাদো কি অমন উধাও হতে পারতেন।
কিন্তু কৌশলটা সত্যিই কী ছিল?
পিজারোর ঝানু সব সঙ্গী-সাথী সেনাপতিরা ভেবেই পায়নি।
শুধু পিজারোই একবার নিজের অজান্তে কৌশলটা প্রায় ধরি-ধরি করে ফেলেছিলেন একটা কৌতূহল মেটাতে গিয়ে। রহস্যের চৌকাঠ পার হওয়া কিন্তু তাঁর হয়নি। সত্যিই কিছু সন্দেহ না করে দরজা থেকেই তিনি ফেরত গেছেন বলা চলে। গানাদোর অন্তর্ধান রহস্য শেষ পর্যন্ত ভেদ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
কী কৌশলে গানাদো কামালকা থেকে পালিয়েছেন তা শুধু একজনই জানেন। পালিয়ে তিনি কোথায় গেছেন তা-ও শুধু আতাহুয়ালপারই জানা।
আতাহুয়ালপার অনুমান নির্ভুল হলে গানাদো তখন দুর্গনগর সৌসানগরে পৌঁছে সাগরপারের দুশমনবাহিনীর বিরুদ্ধে একেবারে মোক্ষম মাত-এর চালটি চেলে আতাহুয়ালপার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
মাত-এর মোক্ষম চালটি কী?
তা আর কিছুই নয়, দু-ভাগ হয়ে যা পলকা হয়ে গেছল তা-ই আবার এক করে জুড়ে দেওয়া। সে জোড়া হাতিয়ারের সামনে তখন দাঁড়াবে কে?
আতাহুয়ালপা আর হুয়াসকার নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে যখন শক্তি ক্ষয় করছেন শত্রু এসে তখন হানা দিয়েছে এই গৃহ বিবাদের সুযোগে। দুই ভাই একবার দেশের জন্যে জাতির জন্যে আকাশের যিনি অধীশ্বর সেই সূর্যদেব আর জীবনের যিনি উৎস সেই ভীরাকোচার জন্যে মিলিত হলে এসপানিওল বাহিনী তো ফুঙ্কারে উড়ে যাবে।
হুয়াসকার তাঁর সঙ্গী-সাথীর কুপরামর্শে পিজারোর কাছে অত্যন্ত গর্বিত একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।
তা পাঠালেও ক্ষতি নেই। পিজারো আর তাঁর দলবল যতক্ষণ সে প্রস্তাবের সুবিধে-অসুবিধে লাভ-লোকসান হিসেব করছেন ততক্ষণে গানাদো সৌসায় পৌঁছে হুয়াসকার-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছেন নিশ্চয়।
হুয়াসকার নির্বোধ নন। গানাদোর ছকা চালগুলি যে অব্যর্থ তা বুঝতে তাঁর দেরি হবে না। তারপর শুধু আতাহুয়ালপার সৌসা পৌঁছোবার জন্যে অপেক্ষা। আতাহুয়ালপাকে সশরীরে সামনে দেখলে হুয়াসকার-এর মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তখনও যদি কিছু থাকে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে নিশ্চয়। ইংকা রাজরক্ত যাঁদের মধ্যে প্রবাহিত সেই দুই রাজভ্রাতা এখন এক হয়ে মিললে সমস্ত কর্ডিলিয়েরাই কেঁপে উঠবে তাঁদের বাহিনীর পদভারে। কোথায় তখন দাঁড়াবে ওই ক-টা দুশমন বিদেশি।
কিন্তু আতাহুয়ালপা তো পিজারোর কড়া পাহারায় তাঁর নিজের অতিথি-মহল্লাতেই বন্দি। অতিথি-মহল্লা থেকে বাইরের চত্বরে পর্যন্ত একটু পা ছাড়িয়ে আসার সুযোগ তাঁর নেই
তিনি সেই দূর দুর্গনগর সৌসায় যাবেন কেমন করে?
কেমন করে আর! গানাদো যেমন করে সকলের চোখে ধুলো দিয়ে গেছেন। তেমনই করে।
পিজারোকে সোনার কাঁড়ি উপহার দিয়ে ভীরাকোচাকে প্রসন্ন করবার ব্রত কি আতাহুয়ালপা অকারণে নিয়েছেন!
প্রতিদিন সমারোহ করে সূর্যদেবের জমানো চোখের জল বয়ে আনবার শোভাযাত্রীর দল কি এদিকে-ওদিকে মিছিমিছি পাড়ি দিচ্ছে?
তাদের রংবেরং-এর পোশাক, মুখের রংচং মুখোশ আর যাবার পথে নাচগান বাজনা দেখতে শুনতে গোড়ায় গোড়ায় এসপানিওলরাও রাস্তায় জড়ো হত। সং দেখার মতো একটা মজা ছিল তার মধ্যে।
কিন্তু দু-বেলা দেখে দেখে তারপর অবশ্য একঘেয়েমিতে অরুচি ধরে গেছে। এখন আর সোনাবরদার মিছিল দেখলে কেউ দাঁড়িয়ে ভিড় জমায় না। যেটুকু আগ্রহ তাদের বিষয়ে আছে তা শুধু ভারে ভারে তারা সোনা আনছে বলে।
