গানাদোর এ ভাষা ব্যবহারে স্তম্ভিত হয়ে আতাহুয়ালপা প্রথমে তাঁর কথাটাই মন দিয়ে শুনতে পারেননি।
গানাদো একটু হেসে দ্বিতীয়বার কথাটা বলার পর তিনি সজাগ হয়েছেন।
দোভাষীকে তাড়িয়েছি বলে রাগ করেননি নিশ্চয়? বলেছেন গানাদো।
না, তা করিনি। ভ্রুকুটিভরে বলে আতাহুয়ালপা নিজের তীব্র কৌতূহলটা আর চাপতে পারেনননি! তুমি–তুমি আমাদের এ ভাষা শিখলে কোথায়?
এ ভাষা কি এমন অদ্ভুত কিছু যে শিখলে আশ্চর্য হতে হয়! গানাদো যেন সরল বিস্ময়ই প্রকাশ করেছেন।
হ্যাঁ, তাই! ইংকা নরেশ একটু উষ্ণস্বরেই বলেছেন, এ দেশের সবাই যা বলে এ সেই কুইচুয়া নয়। ইংকা-রক্ত যাদের গায়ে আছে, রাজবংশের, তারাই শুধু এ ভাষা ব্যবহার করে। , ইংকা রক্ত আমার গায়ে নেই, সবিনয়ে বলেছেন গানাদো, সুতরাং এ ভাষা ব্যবহার করে আমার যদি অন্যায় হয়ে থাকে তো মাপ করবেন। আমি কুইচুয়াতেই যা। বলবার বলতে চেষ্টা করব।
সে চেষ্টা করতে তোমায় বলছি না, আতাহুয়ালপা অধৈর্যের সঙ্গে বলেছেন,কোথায় এ রাজভাষা তুমি শিখলে তাই জানতে চাইছি।
রাজভাষা তো যার-তার কাছে শেখা যায় না। আবার প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়েছেন গানাদো-কোথায় কেমন করে শিখেছি আশা করি তা জানাবার সময়-সুযোগ পরে পাব। কিন্তু এখন সবচেয়ে যা জরুরি, সেই কথাগুলোই আপনার সঙ্গে আগে আলোচনা করতে চাই। দোভাষীকে সেইজন্যেই ওভাবে সরিয়ে দিলাম।
কী জরুরি কথা আলোচনা করতে চাও? আতাহুয়ালপা অত্যন্ত সন্দিগ্ধভাবে গানাদোর দিকে তাকিয়েছেন, তারপর রূঢ়স্বরে বলেছেন, এসপানিওলদের জ্যোতিষবিদ্যার দৌড় কতটা তা-ই আমি তোমায় দিয়ে পরীক্ষা করতে চাই। গোপন আলোচনা করবার জন্যে তোমায় ডাকিনি। পারো তুমি ভাগ্য গণনা করতে!
না।
সোজা স্পষ্ট দৃঢ়স্বরের এ অপ্রত্যাশিত জবাব শুনে চমকে উঠে আতাহুয়ালপা সবিস্ময়ে গানাদোর দিকে তাকিয়েছেন। লোকটা বলে কী! অম্লানবদনে স্বীকার করছে যে, সে জ্যোতিষী নয়! গানাদোর অবিচলিত নির্বিকার মুখের ভাব দেখে একমুহূর্তে মেজাজ তাঁর আরও গরম হয়ে উঠেছে।
তীব্রস্বরে তিনি বলেছেন, ভাগ্য গণনা করতে জানো না, তবু তুমি এখানে এসেছ! এসেছ কি পরিহাস করতে?
না, সম্রাট। শান্ত দৃঢ়স্বরে বলেছেন গানাদো, পরিহাস করবার জন্যে নিজের মাথায় খাঁড়া ঝুলিয়ে এখানে আসিনি। এসেছি আর এক উদ্দেশ্য আর আশা নিয়ে। ভাগ্য গণনা করতে আমি জানি না, কিন্তু ভাগ্য বদলাতে হয়তো পারি।
ভাগ্য বদলাতে পারো!—আতাহুয়ালপা জ্বলন্তস্বরে ওইটুকু বলে গানাদোর স্পর্ধাতেই বোধহয় নির্বাক হয়ে গেছেন।
আপনি আমায় বিশ্বাস করতে পারছেন না, জানি। গানাদো আগের মতোই। স্থির-ধীরভাবে বলেছেন, ভাবছেন পিজারোর চর হিসেবে আপনার মনের কথা বার করবার চেষ্টা করছি। নিজেকে বাঁচাতে পিজারোর কাছে আমার সব কথা ফাঁস করে দেবেন কি না তা-ও তোলাপাড়া করছেন মনে মনে। তা আমায় ধরিয়ে দিতে আপনি সত্যিই পারেন। মুখ-সাপাটিতে তখন নিজের সাফাই গেয়ে পার পাব কি না জানি না। পাই বা না পাই, এই তাতিসুইয়ুর যিনি জীবনের উৎস, সেই ভীরাকোচা আর তাহলে ইংকা সাম্রাজ্যের অভিশাপ মোচন করতে বোধহয় দেখা দিতে পারবেন না।
তাভানতিসুইয়ু-র জীবনের উৎস ভীরাকোচা!–আতাহুয়ালপার গলায় রাগের চেয়ে বিস্ময়বিমূঢ়তাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবার—কী জানো তুমি তাঁর বিষয়ে?
এইটুকু জানি যে তাঁর নাম নিয়ে তাঁর ভরসার জোরে এই ইংকা সাম্রাজ্য আবার। জাগিয়ে তুলে তার সমস্ত অভিশাপ কাটিয়ে দেওয়া যায়।আতাহুয়ালপার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছেন গানাদো, আপনার ভাগ্য সত্যিই বদলে যেতে পারে, সম্রাট, শুধু যদি যা আপনাকে বলব তা বিশ্বাস করতে পারেন।
বিশ্বাস তোমায় আমি করব কেন? এবার বিদ্রূপের স্বরে বলেছেন আতাহুয়ালপা, শুধু আমাদের রাজভাষা তুমি কোথা থেকে শিখেছ, আর জীবনদেবতা ভীরাকোচার দোহাই দিচ্ছ বলে?
না, সম্রাট! একটু হেসে বলেছেন গানাদো, রাজভাষা শিখেছি বা ভীরাকোচার দোহাই দিচ্ছি বলে আমায় বিশ্বাস করতে হবে না। তার চেয়ে ভাল প্রমাণ
গানাদো কথাটা শেষ করতে পারেননি। ইংকা রাজবংশের সম্ভ্রান্ত কেউ একজন আতাহুয়ালপার সঙ্গে দেখা করতে দরবার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছেন। যথারীতি, খালি পায়ে কাঁধে বশ্যতার নিদর্শন হিসেবে একটা বোঝা নিয়ে কাছে এসে দাঁড়িয়ে প্রণামী দিয়ে ও কুর্নিশ করে তিনি যেভাবে বেশ একটু ব্যাকুল অস্বস্তির সঙ্গে গানাদোর দিকে তাকিয়েছেন, তাতে বোঝা গেছে, ইংকা নরেশের কাছে খুব গুরুতর কিছু তাঁর নিবেদন করার আছে।
আতাহুয়ালপাকেও একটু বিব্রত মনে হয়েছে।
আগন্তুক ইংকা জ্ঞাতির কাছে তার জরুরি নিবেদনটা গোপনে তিনি শুনতে চান, কিন্তু আলাপ অসমাপ্ত রেখে গানাদোকে বিদায় দিতে বাধছে।
গানাদোই আতাহুয়ালপার এ দোটানার অস্বস্তি দূর করেছেন অপ্রত্যাশিতভাবে।
হঠাৎ আগন্তুক ইংকা-প্রধানকেই উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ভুল হলে মাপ করবেন। আপনার নামই তো পাউল্লো টোপা?
ইংকা নরেশ ও আগন্তুক দুজনেই সবিস্ময়ে গানাদোর দিকে তাকিয়েছেন।
আতাহুয়ালপাই জিজ্ঞাসা করেছেন ভ্রুকুটিভরে, তুমি ওর নাম জানলে কী করে?
শুধু ওঁর নাম নয়, উনি আপনার কাছে কী আবেদন জানাতে এসেছেন, তা-ও আমি জানি, ঈষৎ কঠিনস্বরে বলেছেন গানাদো, ওঁকে আপনি আশ্বাস দিতে পারেন, সম্রাট, যে স্বয়ং ভীরাকোচা ওঁর সহায় হবেন। একবার শিক্ষা পেয়েও যার সংশোধন হয়নি, পাউলো টোপার স্ত্রীর ওপর পাশব লালসা নিয়ে আবার যে তাঁকে লুণ্ঠন করে নিয়ে যাবার আয়োজন করেছে, আজ রাত্রেই এমন চরম শাস্তি সে পাবে, এসপানিওল বাহিনীর কাছে যা গল্প কথা হয়ে থাকবে বহুদিন। প্রকাশ্য রাজপথে কলঙ্কচিহ্ন-ভরা মুখে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কাল সকালে তাকে পাওয়া যাবে।
