গুপ্তচরদের চরম দেশদ্রোহ সম্বন্ধে তাঁর আশঙ্কা যে অমূলক, পিজারোর কিপুগুলো সম্বন্ধে খোঁজ নেবার ধরন দেখেই আতাহুয়ালপা বুঝতে পারেন একদিন। কিপুগুলো পিজারোর কাছে যে খেলাধুলোর রঙিন সুতোর বেশি কিছু নয়, তা বুঝে
সেই দিনই এসপানিওল একজন দৈবজ্ঞের কাছে ভাগ্য গনাবার ইচ্ছে জানান।
কিপুগুলোর মধ্যে সেই নির্দেশই ছিল। সব দুর্ভাগ্য ঘোচাতে চাও তো এসপানিওল দৈবজ্ঞ ডাকাও।—এই ছিল কিপুর রঙিন জটপাকানো সুতোর আদেশ বাণী।
গিট-দেওয়া রঙিন সুতোর জট দিয়ে এ আদেশ বাণী প্রকাশ করা যেমন, তার পাঠোদ্ধার করাও তেমনই পেরু রাজ্যের নিতান্ত গুপ্তবিদ্যা। কিপু কী জিনিস জানলেও তা পড়বার ও তা নিয়ে কিছু বলবার ক্ষমতা যার-তার থাকে না।
ইংকা রাজবংশের লোক হিসাবে আতাহুয়ালপাকে ছেলেবেলাতেই এ বিদ্যা শিখতে হয়েছে। রাজ ও অত্যন্ত অভিজাত বংশের লোক ছাড়া, পুরোহিতদেরই শুধু এ বিদ্যা শেখার অধিকার আছে।
কিপুগুলির আদেশ বাণী সেদিক দিয়েও আতাহুয়ালপাকে বিস্মিত চিন্তিত করেছিল।
কিপুর রঙিন সুতোয় ভাষা ফোটাতে যারা জানে, ইংকা রাজ্যের এমন কে এরকম। অদ্ভুত নির্দেশ পাঠাতে পারে! দুর্ভাগ্য ঘোচাবার জন্য শত্রুর দৈবজ্ঞের শরণ নেবার পরামর্শ দেওয়া তাদের কারও পক্ষে সম্ভব বলেই আতাহুয়ালপা ভাবতে পারেন না।
মনের এ সমস্ত দ্বিধাসংশয় নিয়েও আতাহুয়ালপা পিজারোর কাছে কিপুর নির্দেশ অনুসারে একজন এসপানিওল জ্যোতিষীর খোঁজ করেছিলেন। সেরকম কেউ থাকলে পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন তাঁর কাছে। নেহাত কিপুগুলোর মানে বোঝা যায় কি না দেখবার চেষ্টাতেই এ অনুরোধ।
সেই অনুরোধ রাখতে পিজারো কয়েকদিন বাদে যাকে পাঠিয়েছিলেন, তাকে দেখে তো গোড়াতেই মনটা বিরূপ হয়ে উঠেছিল।
এই কি এসপানিওল জ্যোতিষী! না, পিজারো তাঁর নিজের মতলব হাসিল করতে যাকে-তাকে দৈবজ্ঞ সাজিয়ে পাঠিয়েছেন?
লোকটার চেহারাই তো প্রথমত অন্য এসপানিওলদের থেকে কেমন আলাদা। গায়ের রংটা তাদের মতো অমন কটা নয়। আর-এক পোঁচ ময়লা হলে ইংকা রাজবংশের ছেলেদের সঙ্গেই প্রায় মিলে যেত। মুখ-চোখ ধরন-ধারণও অন্য এসপানিওলদের সঙ্গে মেলে না। লোকটা তাদের মতোই লম্বা হলেও, পাতলা একহারা ধরনের। জ্যোতিষের মতো বিদ্যের চর্চা যারা করে, তাদের মুখ-চোখে যে ধীর-স্থির গাম্ভীর্যটুকু থাকা উচিত তা-ও এর মুখে নেই। কেমন একটা অস্থিরচঞ্চল ভাব তার জায়গায়, আর সেই সঙ্গে চোখের দৃষ্টিতে একটা চাপা কৌতুকের আভাস, মাঝে মাঝে যা হঠাৎ আবার যেন অন্যভাবে ঝিলিক দিয়ে ওঠে।
লোকটার নাম জেনেছিলেন গানাদো। গানাদোর সঙ্গে প্রথম দেখার সময় যা-কিছু হয়েছিল তাও বেশ একটু অদ্ভুত বেয়াড়া ধরনের।
গানাদোর সঙ্গে কথা বলবার জন্যে আতাহুয়ালপা সঙ্গে তাঁর দোভাষীকে রেখেছিলেন।
দোভাষী কিন্তু গানাদোর কথা কিছুক্ষণ শোনবার পর অনুবাদের চেষ্টা না করে একেবারে বোবা হয়ে গিয়েছিল। বোবা হওয়ার আর দোষ কী। গানাদোর কথা সে একবর্ণ বুঝতে পারেনি।
চুপ করে থাকতে দেখে আতাহুয়ালপা ভ্রুকুটিভরে তার দিকে চেয়েছিলেন।
গানাদোকেও অত্যন্ত বিরক্ত মনে হয়েছিল। তিনি রাগের চোটে মুখে যেন তুবড়ি ছুটিয়ে কী সব বলেছিলেন দোভাষীকে।
দোভাষী ঘেমে উঠে কাঁচুমাচু মুখ করে এবার আতাহুয়ালপার কাছে স্বীকার করেছিল যে, গানাদোর কথা অনুবাদ করবার ক্ষমতা তার নেই।
কেন?—আতাহুয়ালপা রেগে উঠেছিলেন—-তুমি এসপানিওলদের ভাষা জানো
না?
জানি। কিন্তু উনি যা বলছেন তা কাস্তেলিয়ানো মানে এসপানিওলদের ভাষা নয়। করুণস্বরে নিবেদন করেছিল দোভাষী।
কী! এসপানিওল শব্দটা থেকেই যেন দোভাষীর কুইচুয়া ভাষায় বলা বক্তব্যটা বুঝে ফেলে গানাদো একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে বলেছিলেন, আমি যা বলছি, তা এসপানিওল নয়? এসপানিওলদের ভাষা শুধু কাস্তেলিয়ানো? কেন, বাস্ক, গালিসিয়ান, কাটালান কি বানের জলে ভেসে এসেছে? আমি কাটালান বলছি, কাস্তেলিয়ানো নয়। বুঝেছ?
ভ্যাবাচাকা খেয়ে গানাদোর কথাগুলো যে কাস্তেলিয়ানোতেই বলা সে খেয়াল হয়নি দোভাষীর।
কিন্তু আমি তো শুধু কাস্তেলিয়ানোই শিখেছি।—অপরাধীর মতো সে জানিয়েছে—কাটালান আমি জানি না।
যদি জানো তা হলে এখানে করছ কী! যাও। আর কিছু না বুঝুন আতাহুয়ালপা গানাদোর রাগের সঙ্গে বলা শেষ কথাটা বুঝেছিলেন। বন্দি হবার পর থেকে এসপানিওলদের সংসর্গে যে দু-একটা শব্দ তিনি। এই ক-দিনে শিখেছেন তার একটা হল ভায়িয়া। ভায়িয়া মানে যাও। গানাদো। রাগের মাথায় দোভাষীকে সেই কথাই বলেছে।
কথা যে বোঝে না এমন দোভাষীর ওপর রাগ হওয়া অবশ্য স্বাভাবিক। তার থাকা-না-থাকা সমান। যাও বলে তাকে তাড়ালে সুতরাং কোনও ক্ষতি নাই। আতাহুয়ালপা দোভাষীকে বিদায় দেওয়ায় তাই আপত্তি করেননি।
কিন্তু যে গেছে তার জায়গায় গানাদোর কথা বোঝে এমন দোভাষী তো একজন দরকার। নইলে ইশারায় তো তাঁদের পরস্পরের আলাপ আর হতে পারে না।
ইশারায় কথা বোঝাতে হয়নি, দরকার হয়নি কোনও দোভাষীরও, হঠাৎ চমকে উঠে অবাক হয়ে আতাহুয়ালপা গানাদোর দিকে তাকিয়েছেন। নিজের কানকেই তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না তখন বিশ্বাস করা সত্যিই শক্ত।
গানাদো তাঁর সঙ্গে কথা বলছে। কথা বলছে পেরুর সাধারণ ভাষা কুইচুয়ায় নয়, ইংকা রাজপরিবারের নিজস্ব বিশেষ ভাষায়, বাইরের প্রজাসাধারণেরও যা অজানা।
