আর কারও কাছ থেকে নয়, খবর এসেছে আতাহুয়ালপারই ভাই আর প্রতিদ্বন্দ্বী ইংকা সাম্রাজ্যের ন্যায্য প্রথা-সংগত অধীশ্বর হুয়াসকার-এর কাছ থেকে।
রাজসিংহাসন নিয়ে হুয়াসকার আর আতাহুয়ালপার জীবনপণ সংগ্রামের কথা আমরা জানি। আতাহুয়ালপার কাছে পরাজিত হয়ে হুয়াসকার যে ইংকা সাম্রাজের যথার্থ রাজধানী কুজকোর কাছে সৌসার সুরক্ষিত দুর্গে বন্দি হয়ে আছেন তাও আমাদের অজানা নয়।
সৌসা-য় বন্দি থাকতেই হুয়াসকার এসপানিওল নামে অজানা এক শত্রুর হাতে আতাহুয়ালপার কল্পনাতীত ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা শুনেছেন। শুনেছেন যে আতাহুয়ালপা বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাবার জন্যে প্রচুর ধনরত্ন এসপানিওলদের দেবার কড়ার করেছেন।
এই সংবাদই উৎসাহিত করে তুলেছে হুয়াসকারকে। আতাহুয়ালপার ওপর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার আর নিজের মুক্তি কেনবার একটা কূটকৌশল তাঁর মাথায় এসেছে। গোপনে নিজের বিশ্বাসী গুপ্তচরকে দিয়ে এসপানিওলদের অধিপতির কাছে তিনি একটা প্রস্তাব করে পাঠিয়েছেন। প্রস্তাব এই যে আতাহুয়ালপার বদলে তাঁকে মুক্তি দিলে তিনি আতাহুয়ালপার চেয়ে অনেকগুণ বেশি সোনাদানার সম্পদ এসপানিওলদের দিতে প্রস্তুত। সে ক্ষমতা তাঁর সত্যিই আছে, কারণ কুজকো তাঁর নিজের রাজধানী। ইংকা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বেশি সম্পদ স্বাভাবিকভাবে এই শহরেই মজুত। কোথায় তা কী পরিমাণ আছে তা বাইরের লোক হয়ে আতাহুয়ালপা আর কতটুকু জানে!
হুয়াসকার-এর এই প্রস্তাবে পিজারো আর তাঁর ঘনিষ্ঠ সাঙ্গোপাঙ্গের উত্তেজিত চঞ্চল হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কী এ বিষয়ে করা উচিত স্থির করা সত্যিই তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রলোভন তো বড় সামান্য নয়। আতাহুয়ালপা যা দিতে চেয়েছেন তা-ই পিজারো আর তাঁর দলবদলের কাছে কল্পনাতীত। হুয়াসকার তার চেয়েও অনেকগুণ বেশি দেওয়ার লোভ দেখাচ্ছেন। এখন আতাহুয়ালপা, না হুয়াসকার কার দিকে হেলা যায়?
গোপন রাখবার চেষ্টা সত্ত্বেও হুয়াসকার-এর এ প্রস্তাবের খবর আতাহুয়ালপার কানে একেবারে পৌঁছোয়নি এমন নয়।
তাঁর তো এ খবরে অত্যন্ত বিচলিত হবার কথা। কিন্তু তা তিনি হননি। হননি এই কারণে যে এই রকম একটা অবস্থা যে হতে পারে তা জেনে তিনি আগে থাকতেই প্রস্তুত ছিলেন অনেকখানি। এসপানিওলরা এই দোটানার মধ্যে মনঃস্থির করে ওঠবার আগেই তারা যা ভাবতে পারে না এমন কিছু ঘটে যাবে। আতাহুয়ালপা আর হুয়াসকার-এর মধ্যে একজনকে বেছে নেবার সময় সুযোগ তখন আর পিজারোর থাকবে না এই মেঘ-ছাড়ানো তুষার-চূড়ার দেশে।
নির্ভুলভাবে সমস্ত মতলব ভাঁজা হয়েছে, ধাপে ধাপে শেষ লক্ষ্যে পৌঁছোবার যে আয়োজন করা হয়েছে তা নিখুঁত।
প্রথম ধাপ হল পিজারোকে পাকার সোনা উপহার দিয়ে বিমূঢ় বিহ্বল করার সেই প্রস্তাব। এসপানিওলরা সোনা বলতে অজ্ঞান। তাদের সেই উন্মত্ত লোভই। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ফন্দি হয়েছে তাই।
এ ফন্দি অবশ্য আতাহুয়ালপার নিজের মাথা থেকে বার হয়নি। ধাপে ধাপে আগাগোড়া সমস্ত চালগুলো যিনি কষে কষে সাজিয়েছেন তিনি যে কে তা আতাহুয়ালপা এখনও ঠিকমতো জানেন না। গানাদো নামে পরিচিত এ লোকটি এসপানিওল বাহিনীরই একজন। তবু আতাহুয়ালপা লোকটিকে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছেন। বাধ্য হয়েছেন তার কাজ দেখে।
কিন্তু ঘনরামকে কামালকা শহরে তো পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্ত ফন্দি সাজিয়ে তিনি নিজে গেলেন কোথায়?
আর কেউ না জানুক, আতাহুয়ালপা তা জানেন।
দু-দিন বাদে আতাহুয়ালপা নিজে যেখানে রওনা হবেন, নেহাত অসম্ভব কিছু না ঘটে থাকলে গানাদে। সেই সৌসায় ইতিমধ্যে পৌঁছে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছেন।
হ্যাঁ, সৌসা সেই সুরক্ষিত দুর্গনগরী আতাহুয়ালপার ভাই হুয়াসকার যেখানে বন্দি হয়ে আছেন।
আর কোথাও নয়, গানাদো সৌসা-তে গেছেন কেন, আতাহুয়ালপার জন্যে অপেক্ষা করতে?
তাঁর পরাজিত রাজভ্রাতা ভূতপূর্ব ইংকা নরেশ হুয়াসকারকে যেখানে বন্দি করে রেখেছেন, সেই দুর্গনগরী সৌসা-তেই আতাহুয়ালপার নিজেরও গোপনে যেতে চাইবার কারণ কী?
হুয়াসকার যে তাঁর ভাগ্যবিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে নিজের স্বাধীনতা আর ক্ষমতা ফিরে পাবার জন্যে বেশি সোনার লোভ দেখিয়ে পিজারোকে হাত করতে চাইছে, এ গোপন খবর জানবার পরও আতাহুয়ালপার সংকল্প তো বদলায়নি।
এরকম সম্ভাবনার কথা আগে থাকতেই অনুমান করে নিয়ে তিনি অবিচলিত ছিলেন কীসের জোরে?
শুধু কি গানাদোর ছকে দেওয়া চালের ওপর অটল বিশ্বাসে?
কিন্তু গানাদোর চাল যে অব্যর্থ এ বিশ্বাস তাঁর হল কী করে? গোড়ায় তো। গানাদোকে পিজারোর গুপ্তচর বলে ধরে নিয়ে তাঁর সমস্ত কিছুই অবিশ্বাসের চোখে দেখেছিলেন।
যে নির্দেশ পেয়ে পিজারোর কাছে প্রথম একজন এসপানিওল দৈবজ্ঞের কথা পাড়েন তা-ই তো রীতিমতো সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। নির্দেশ পেয়েছিলেন অবশ্য সেই রঙিন সুতোর জট থেকে। সেই কিপুক-টা তাঁর মহলে কোথা থেকে এল তাই প্রথম বুঝে উঠতে পারেননি। পিজারোর চরদেরই সেটা কারসাজি ভেবেছিলেন প্রথমে। এমন কথাও ভেবেছিলেন যে ইংকা-সাম্রাজ্যের কোনও কুলাঙ্গার দেশধর্মের চরম অপমান করে বিদেশি পিজারোর কাছে কিপুর রহস্য জানিয়ে দিয়েছে, আর পিজারো সেই কিপু দিয়ে তাঁকে পরীক্ষা করতে চাইছেন।
কিপুগুলো পর পর হাতে পড়ার পরও আতাহুয়ালপা তাই তার নির্দেশ মানবার কোনও চেষ্টা করেননি। সেগুলো যেন বাজে রঙিন সুতো হিসেবেই নাড়াচাড়া করেছেন। সত্যিই কিপুর রহস্য জেনে থাকলেও পিজারো আতাহুয়ালপাকে ধরা-ছোঁয়ার যাতে কিছু না পান।
