আতাহুয়ালপার প্রতিজ্ঞা পূরণ হতে আর সামান্য কিছু বাকি। হয়তো কাজটা শেষ। হবার পর আরও মোটা বকশিশ দাবি করবার জোর পাবে বলেই গানাদো এখন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে আছে কিংবা নিজে হাত বাড়িয়ে পুরস্কার চাইতে তার সাহস কুলোয়নি। গানাদোর এ-পর্যন্ত দেখা করতে না আসার কারণ এইরকমই ধরে নিয়েছেন পিজারো।
বকশিশ নেবার জন্যে অপেক্ষা করার ধৈর্য গানাদোর যদি থাকে তো থাক, পিজারোর সে ধৈর্য নেই। গানাদো আতাহুয়ালপাকে জ্যোতিষের কী ভড়ং-ভাঁওতায় এমন করে কাবু করেছে জানবার জন্যে তিনি ব্যাকুল। আতাহুয়ালপার পেটের কথা আরও কিছু সে বার করতে পেরেছে কি না তাও তাঁর জানা দরকার।
পিজারো গানাদোকে তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্যে তলব পাঠিয়েছেন। গানাদোকে ডেকে আনতে যে গেছল সেই সেপাই যা খবর এনেছে পিজারো তা বিশ্বাস করতেই পারেননি।
গানাদো তার ডেরায় নেই। ডেরায় তো নয়ই, কাক্সামালকার অতিথি-মহল্লার সৈন্য-শিবিরের কোথাও নাকি তাকে খোঁজ করে পাওয়া যায়নি।
খোঁজ করতে গিয়ে অনেকেরই খেয়াল হয়েছে যে শুধু সেইদিনই নয়, গত কয়েকদিন ধরেই গানাদোর সঙ্গে দেখা হবার কথা কেউ মনে করতে পারে না।
কোথায় গেল তাহলে গানাদো!
এসপানিওল একজন সৈনিক হিসেবে কামালকা থেকে একেবারে তার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া তো আজগুবি ব্যাপার। সোনা নিয়ে সবাই তখন মেতে আছে। গানাদোও কেও-কেটাদের একজন নয়, তবু তাকে নিয়েও কিছু জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
তার অন্তর্ধানের পেছনেও ভীরাকোচার রহস্য কিছু আছে নাকি! কিন্তু তা থাকলেও মানুষটা এমন হাওয়া হয়ে যায় কী করে?
ভীরাকোচার হাতে যাদের লাঞ্ছনার কথা জানা গেছে তাদের তো সব সশরীরেই উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। একেবারে গায়েব তো কেউ হয়ে যায়নি গানাদোর মতো।
অন্যেরা যত না হোক, পিজারো আর তাঁর দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি দে সটো আর দে কান্ডিয়া চিন্তিত অস্থির হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
দে সটোকে নিয়ে পিজারো শেষ পর্যন্ত আতাহুয়ালপার কাছেই গেছেন এ রহস্যের হদিস পাবার আশায়।
আপনার কাছেই তো সে ইদানীং আসত যেত। পিজারো প্রায় অভিযোগের সুরে বলেছেন, শেষ তাকে দেখেছেন কবে?
কবে? আতাহুয়ালপাকে যেন ভাবতে হয়েছে।
এই তত দিন তিনেক আগেই।—ভেবে নিয়ে জানিয়েছেন আতাহুয়ালপা—হ্যাঁ, সেইদিনই আমাকে ভীরাকোচার কোপে পড়বার ভয় দেখায়।
ভীরাকোচার কোপে পড়বার ভয় দেখায়? আপনাকে? পিজারোর সঙ্গে দে সটো আর কান্ডিয়ার মুখে একই বিস্মিত প্রশ্ন শোনা গেছে। এ ভয় দেখাবার কারণ? গানাদোর অন্তর্ধান রহস্যের মীমাংসা আপাতত স্থগিত রেখে জিজ্ঞাসা করতে হয়েছে পিজারোকে।
ভয় দেখাবার কারণ প্রতিজ্ঞা রাখবার মেয়াদ আমার ফুরিয়ে আসছে বলে। আতাহুয়ালপা যেন অনিচ্ছার সঙ্গে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কথা না। রাখতে পারলে ভীরাকোচা তো আমায় ক্ষমা করবেন না। আপনাদের গানাদো তাই সেদিন আমার জমানো সোনা দূরদূরান্তর থেকে বয়ে আনবার জন্যে আরও বেশি লোকজন লাগাতে বলেছিল। তা না লাগলে আমারই শুধু প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হবে না, আমার লুকোনো সব পুঁজি হয়তো বেহাতই হয়ে যাবে।
বেহাত হবে কেন? সোনার পুঁজি থেকে বঞ্চিত হবার ভয়, গানাদোর অন্তর্ধান রহস্য সম্বন্ধে উদ্বেগ কৌতূহল ছাপিয়ে, পিজারোর গলা রুক্ষ করে তুলেছে।
হবে-ই বলছি না–আতাহুয়ালপা মনে মনে নিশ্চয় পিজারোর এই অস্থিরতাটুকু উপভোগ করে বাইরে অবিচলিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে সম্রাটোচিত কূটবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তাঁর জবাবে—তবে আমার নিজের টহলে বার হওয়া বন্ধ দেখে কেউ কেউ শয়তানির চেষ্টা করতে পারে বলে ভাবনা হচ্ছে। তাই উপরি লোক লাগিয়ে যেখানে যা আছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনিয়ে ফেলা দরকার মনে করছি।
বেশ, উপরি লোকই আজ থেকে পাবেন। পিজারো আশ্বাস দিতে দেরি না করলেও আর একটা প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু আপনার লোকজনের অমন ঘটা করে জাঁকজমকের সাজপোশাকে যাবার দরকার কী? অত সাজগোজের মধ্যে আবার মুখে রংচং আর মুখোশের ছড়াছড়ি দেখলে তো মনে হয় কোনও বিয়ের বরযাত্রীদের সঙ্গে তামাশা দেখাবার সব ভাঁড় চলেছে। ও সব হই-হুল্লোড় না করে আর সোনা আনতে যাওয়া যায় না?
চুপি চুপি কাউকে কিছু না জানিয়ে যাওয়া-আসার কথা বলছেন!
দোভাষীকে দিয়ে বলাবার ভেতরও আতাহুয়ালপার প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপের রেশ একটু বুঝি থেকে গেছে। সেটা চাপা দেবার জন্যে একটু বেশি গাম্ভীর্যের সঙ্গে আতাহুয়ালপা তারপর জানিয়েছেন—চোরের মতো লুকিয়ে গেলে আসল কাজই যে হবে না। লুকোনো পুঁজির জিম্মাদাররাই যে অবিশ্বাস করবে। ইংকা অধীশ্বরদের সম্পদ—সূর্যদেবের জমানো চোখের জল রাখতে বা বার করে আনতে এমনই। সমারোহ করাই যে এ দেশের দস্তুর।
দস্তুর শোনাবার পর পিজারো তার বিরুদ্ধে আর কিছু বলার পাননি। গানাদো। সম্বন্ধে আর দু-চারটে প্রশ্ন করে আতাহুয়ালপাকে বাড়তি কিছু লোক লাগাতে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দে সটো আর দে কান্ডিয়াকে নিয়ে ফিরে গেছেন।
গানাদোর মতো একজন সৈনিকের বেমালুম গায়েব হয়ে যাওয়া যত বড় রহস্যই হোক, তা নিয়ে মাথা ঘামাবার বেশি সময় পিজারো বা তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতিরা পাননি।
আতাহুয়ালপার দরবার ঘর সোনায় ভরে ওঠার উত্তেজনা তো আছেই, তার ওপর আর এক খবর দূতমুখে এসে পিজারো আর তাঁর বিশ্বাসী সেনাপতিদের অস্থির চঞ্চল করে তুলেছে।
