আপনার অসীম দয়া, আদেলানতাদো, বলেছে গানাদো।
গানাদো তারপর থেকে আতাহুয়ালপার কাছে নিয়মিতভাবে যাতায়াত যে করেছে। পিজারো তা জানেন।
আতাহুয়ালপা জ্যোতিষের বিষয়ে আর উচ্চবাচ্য করায় এইটুকু তিনি ধরে নিয়েছেন যে, ইংকা নরেশকে খুশি করতে না পারুক, একেবারে হতাশ সে করেনি।
আতাহুয়ালপার গোপন কোনও খবর সে এখনও আনতে পারে এইরকম একটু ক্ষীণ আশার বেশি পিজারোর মনে আর কিছু ছিল না।
হঠাৎ আতাহুয়ালপার অবিশ্বাস্য প্রস্তাব শুনে আর সে প্রস্তাবের মূলে সেই গানাদোই আছে জেনে প্রথমটা পিজারো সত্যিই তাই রীতিমতো অভিভূত বিহ্বল হয়ে যান।
আতাহুয়ালপা যা বলেছেন, তা বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। বন্দিনিবাসে আতাহুয়ালপার দরবার ঘরটির মাপ ছিল লম্বায় প্রায় চল্লিশ আর চওড়ায় বারো হাত। পিজারোর সঙ্গে পুরস্কারের কথাটা আলাপ করতে করতে আতাহুয়ালপা প্রথমে ঘরের মেঝেটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছেন, এই মেঝের মাপটা ভাল করে দেখে রাখুন, সাগরপারের বীর।
পিজারো অবাক হয়ে মেঝের দিকে তাকাবার পরই আতাহুয়ালপা হঠাৎ তাঁর রাজাসন থেকে উঠে পড়ে প্রশস্ত ঘরটির দেয়ালের কাছে চলে গিয়েছেন। পিজারোকে রীতিমতো চমকে দিয়ে তারপর পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা হাত যতদূর সম্ভব ওপরে তুলে আঙুলের ডগা দিয়ে দেওয়ালে একটা দাগ টেনে বলেছেন, আমার হাতটা কতদূর পৌঁছোয় তা-ও লক্ষ করুন।
দেওয়ালের কাছ থেকে আবার ঘরের মাঝখানে নিজের রাজাসনে এসে বসে আতাহুয়ালপা তারপর যা বলেছেন তা উন্মাদের প্রলাপ বলে মনে হয়েছে। পিজারোর।
মেঝে থেকে যতদূর পর্যন্ত হাত তুলে দাগ দিয়েছেন দরবার-ঘরের সেই সমস্ত জায়গা আতাহুয়ালপা উপহার হিসেবে সোনায় যদি ভরে দেবেন বলেন তাহলে তা প্রলাপ ছাড়া আর কী ভাবা যায়?
প্রলাপ কিংবা পরিহাস!
প্রলাপ নয়, পরিহাস নয়, পিজারোর নিজেরই দলের এক দৈবজ্ঞ গানাদোর মুখ দিয়ে পেরুর আদিম দেবতা ভীরাকোচার নাকি এই আদেশ!
আতাহুয়ালপার মুখে এই পর্যন্ত শোনবার পর দে সটো আর দে কান্ডিয়া এসে পড়ায় গুরুতর সমস্যার মীমাংসার জন্যে পিজারোকে আলোচনায় ছেদ টেনে চলে যেতে হয়েছিল।
দ্বিতীয়বার এ বিষয়ে আলাপ করতে পেরেছিলেন তার পরের দিন।
যা ভয় করেছিলেন তা অমূলক বলে বোঝা গেছে। আতাহুয়ালপার ইতিমধ্যে মতিগতি বদলায়নি। আগের দিন যা বলেছিলেন এখনও তাঁর মুখে সেই এক কথা। ভীরাকোচার আদেশে শ্বেতবাহিনীর সেনাপতিকে পুরস্কৃত তাঁকে করতেই হবে, আর সে পুরস্কার কী তা তিনি আগেই দেখিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু এত সোনা আপনার আছে কোথায়? এবার লুব্ধভাবে প্রশ্ন করেছেন পিজারো, এই কামালকা শহরে?
না। জানিয়েছেন আতাহুয়ালপা, আছে আমার সমস্ত রাজ্যের নানা জায়গায় লুকোনো। সেখান থেকে সে সব আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু যদি নিজের কথা আপনি না রাখতে পারেন, পিজারোর গলা লুকোবার চেষ্টা সত্ত্বেও তীক্ষ্ণ কঠিন হয়ে উঠেছে, যদি মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা যায় শেষ পর্যন্ত?
তাহলে ভীরাকোচা আমায় ক্ষমা করবেন না, একটু হেসে বলেছেন আতাহুয়ালপা।
তার বেশি কোনও ভয় আপনার নেই? পিজারোর গলায় ব্যঙ্গের সুরটা খুব অস্পষ্ট থাকেনি এবার।
না, তার চেয়ে বড় ভয় কিছু আমার নেই। পিজারোর প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গটুকু গ্রাহ্য না করে দৃঢ়স্বরে বলেছেন আতাহুয়ালপা, যেমন বড় সৌভাগ্য কিছু নেই তাঁকে প্রসন্ন করার চেয়ে।
ভীরাকোচা প্রসন্ন হলে কী সৌভাগ্য আপনার হবে বলে আশা করেন? পিজারোর মুখে আপনা থেকেই প্রশ্নটা যেন উঠে এসেছে।
আশা কেন করব, কী সৌভাগ্য আমার হবে আমি জানি। আগের মতোই গভীর। বিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন আতাহুয়ালপা, সমস্ত অভিশাপের মেঘ কাটিয়ে উঠে আমার আরাধ্য সূৰ্য্যদেবের মতোই আমি আবার দীপ্ত হয়ে উঠব।
তা-ই যেন হতে পারেন। ব্যঙ্গ ভরে নয়, পরম আন্তরিকতার সঙ্গেই পিজারো এ শুভকামনা জানিয়েছেন মনে হয়েছে।
পরের দিন থেকেই আতাহুয়ালপার নির্দেশ মতো পিজারোর হুকুম নিয়ে সমস্ত পেরু রাজ্যের দূরদূরান্তরে পাইক-পেয়াদারা ছুটে গেছে যেখানে যত সোনা সঞ্চিত আছে সব কামালকায় বয়ে নিয়ে আসবার জন্যে। দেখা গেছে এসপানিওলদের হাতে বন্দি হওয়া সত্ত্বেও কী আশ্চর্য আতাহুয়ালপার প্রতাপ প্রতিপত্তি! দূরদুর্গম পথে ভারে ভারে সোনা এসে পৌঁছেছে প্রতিদিন কাক্সামালকা শহরে। দেখতে দেখতে দরবার ঘর সত্যিই সোনায় ভরে উঠেছে।
সমস্ত এসপানিওল বাহিনীর মধ্যে তীব্র হয়ে উঠেছে এই সোনার স্তুপ জমা হওয়ার উত্তেজনা।
কল্পনাতীত দুর্ভোগ, যন্ত্রণা আর বিপদ মৃত্যু সব কিছু তুচ্ছ করে তাদের এ দুঃসাহসী অভিযানের পরম সার্থকতা এবার তারা নিজেদের চোখে দেখতে পাচ্ছে, স্পর্শ করতে পারছে নিজেদের হাতে ওই সোনার স্কুপের মধ্যে।
তাঁর বাহিনীর আর সবাইকার মতোই পিজারোর উল্লাসের আর সীমা নেই। এমন আশাতীত সৌভাগ্যের জন্যে পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ দেবার জন্য তিনি কামালকা শহরে নতুন এক গির্জা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গির্জার জন্যে নতুন আয়তন তাঁকে তৈরি করাতে হয়নি। অতিথি-মহল্লার একটি জমকালো বাড়িই একটু-আধটু অদলবদল করে তিনি গির্জা বানিয়েছেন।
পিজারো একেবারে অকৃতজ্ঞ নয়। দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে মানুষের কথা।
এবার তাঁর মনে হয়েছে।
গানাদোর অবশ্য নিজে থেকেই তাঁর কাছে আসবার কথা। এত বড় একটা বাহাদুরি দেখাবার পর কেন যে সে নিজের তারিফ শুনতে আর বখরা চাইতে আসেনি সেইটেই একটু আশ্চর্য লেগেছে পিজারোর।
