হ্যাঁ, করি, ভাবান্তরহীন মুখে বলেছেন আতাহুয়ালপা, আর কোনও কাজ নেই যখন সময় কাটাবার একটা কিছু তো চাই!
দেখতে পারি রঙিন সুতোগুলো!—পিজারো বিনীতভাবে যেন প্রার্থনা জানিয়েছেন।
খুব পারেন! বলে নিজের রাজাসনের পাশ থেকেই একটি রঙিন সুতুলি আতাহুয়ালপা পিজারোর দিকে এগিয়ে দিয়েছেন।
নেড়েচেড়ে সেটা দেখতে দেখতে পিজারোর ঠোঁটের কোণে একটু অবজ্ঞার হাসি একেবারে চাপা থাকেনি। নেহাত সাধারণ ক-টা রংবেরং-এর গিটপড়া সুতো একসঙ্গে জড়ানো। ছেলেখেলার যোগ্যও সেটা নয়।
মনে যা হয়েছে বাইরে তার বিপরীতটাই প্রকাশ করে পিজারো উৎসাহ দেখিয়ে বলেছেন, জিনিসটা তো বেশ মজার! সত্যি কী করেন এগুলো নিয়ে?
তা জানেন না? পিজারের চরেদের সম্বন্ধে বিদ্রূপের ইঙ্গিতটুকু খুব অস্পষ্ট না। রেখে আতাহুয়ালপা জিজ্ঞাসা করেছেন, কেউ কিছু বলেনি আপনাকে?
বিদ্রূপের প্রচ্ছন্ন খোঁচাটাই লক্ষ করেছেন পিজারো। আতাহুয়ালপার নির্বিকার মুখে যার আভাসও পাওয়া যায়নি এ প্রশ্নের পেছনে সেই আসল উদ্বেগটা কী নিয়ে তা পিজারো ধরতেই পারেননি।
শুধু খোঁচাটা টের না পাবার ভান করে তাই তিনি সরল সত্য কথাই বলেছেন, না, বলবে আবার কে কী! এ যে খেলার জিনিস তা তত বোঝাই যাচ্ছে। তবে সময় কাটাতে এর চেয়ে ভাল খেলার জিনিস আপনাকে দিতে পারি। তা শেখাও সহজ।
পিজারো তাঁদের তখনকার স্পেনের চালু তাসের জুয়া ব্যাকারা-র কথা ভেবেই ও প্রস্তাব করেছিলেন নিশ্চয়। জুয়ায় মাতিয়েও আচাহুয়ালপার কাছে যা কিছু পারা যায় নিংড়ে বার করবার লোভ বোধহয় তাঁর হয়েছিল।
আতাহুয়ালপা কিন্তু সে ফাঁদে পা-ই বাড়াননি। একটু উন্নাসিকভাবেই বলেছিলেন, সময় কাটাবার জন্যে নতুন খেলা শেখবার ধৈর্য আমার নেই, সাগরপারের বীর। চান তো, নতুন খেলা শিখিয়ে নয়, সময় কাটাতে আমার অন্য একটা নেশার জিনিস জুগিয়ে সাহায্য করতে পারেন।
কী নেশা আপনার? একটু সন্দিগ্ধসুরেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন পিজারো। আতাহুয়ালপার একটু-আধটু চিচা পান ছাড়া আর কোনও নেশার কথাই জানা যায়নি এ পর্যন্ত।
ভবিষ্যৎ গণনার নেশা! পিজারোকে বেশ অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন আতাহুয়ালপা।
সে নেশা মেটাতে আমি কী করতে পারি! পিজারোর মুখে একটু ভুকুটি এবার অস্পষ্ট থাকেনি। আমি তো আর গণৎকার নই।
আপনি নিজে না হন আপনার দলের মধ্যে তেমন কি কেউ নেই? আতাহুয়ালপার সাধারণত নির্বিকারমুখে এবার এক ঔৎসুক্য ফুটে উঠেছিল।
আবেদনটা সত্যিই অদ্ভুত লেগেছিল পিজারোর। বিস্মিতভাবেই জানতে চেয়েছিলেন, আপনি আমাদের দল থেকে একজন জ্যোতিষী চান! কেন?
আমার নিজের দেশের গণকারদের ওপর আর ভক্তি নেই বলে। অসংকোচে জানিয়েছিলেন আতাহুয়ালপা, যে কোনও পাপে হোক, তাদের দিব্যদৃষ্টি নষ্ট হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত যা ঘটল তার একটু ইঙ্গিতও তারা দিতে পারেনি।
আমাদের কেউই যে তা পারবে তার ঠিক কী? পিজারো নিজের মনের সত্যকার সংশয়টাই জানিয়েছিলেন।
কিন্তু আতাহুয়ালপা এ সংশয়কে আমল না দিয়ে বলেছিলেন, তবু চেষ্টা করতে আপত্তি কী! আছে আপনাদের মধ্যে কেউ এমন দৈবজ্ঞ?
পিজারো তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারেননি। প্রথমটা কারও নামই মাথায় আসেনি তাঁর। তারপর হঠাৎ বেদে গানাদোর কথা মনে পড়েছিল। জ্যোতিষবিদ্যা সত্যি সে জানে কি না তা পিজারো নিজেই বলতে পারেন না। কিন্তু জাতে বেদে বলে তার অদ্ভুত কিছু ক্ষমতা-টমতা বোধ হয় আছে। তার পরিচয়ও একটু-আধটু পাওয়া যায়নি এমন নয়। আর কিছু না হোক, আতাহুয়ালপাকে কিছুটা ভুলিয়ে রাখতে সে পারবে। আতাহুয়ালপার পেটের কথাও একটু-আধটু বার করা তার পক্ষে হয়তো অসম্ভব হবে না।
পিজারো গানাদোকেই আতাহুয়ালপার কাছে একদিন পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পাঠাবার আগে তাকে একটু তালিম দিতে ভোলেননি।
তোমার তো ভর-টর হত বলেছিলে। ভর হলে আবার নাকি দিব্যদৃষ্টি খুলে যায়। তা এখন ভর-টর হয়? একটু যেন কড়া গলাতেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন পিজারো।
যাঁরা ভর করেন তাঁদের মর্জি হলেই হয়, আদেলানতাদো। সবিনয়ে জানিয়েছে গানাদো।
আদেলানদো ছাড়া আর কিছু বলে গানাদো তাঁকে সম্বোধন করে না। আগে বিরক্তি লাগত। এখন সয়ে গেছে।
তবু ধমক দিয়ে পিজারো বলেছেন, ও-সব প্যাঁচালো কথা ছাড়ো। দেবতা-অপদেবতার ভর হালফিল হয়েছে কি না জানতে চাইছি।
আজ্ঞে তা অনেক দিন হয়নি। কুণ্ঠিতভাবে যেন স্বীকার করেছে গানাদো। হুঁ, পিজারো বিদ্রূপের খোঁচাটুকু না দিয়ে পারেননি, যাঁরা ভর করতেন তাঁরা সাগর পেরিয়ে আর তোমার নাগাল পাচ্ছেন না কেমন?
গানাদো লজ্জাতেই যেন কোনও জবাব দেয়নি।
পিজারোই আবার বলেছেন, শোনো, ইংকা নরেশ আতাহুয়ালপার আমাদের জ্যোতিষীদের দিয়ে ভাগ্য গণাবার শখ হয়েছে। পারবে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে?
দেবতারা যদি দয়া করেন, আদেলানতাদো, তাহলে নিশ্চয়ই পারব।—প্রায় করুণভাবে জানিয়েছে গানাদো।
দেবতারা দয়া করুন না করুন, আতাহুয়ালপাকে খুশি তোমায় করতেই হবে, এবার কঠিন আদেশের স্বরেই বলেছেন পিজারো, আর চেষ্টা করতে হবে গণনা করার ছলে ওর পেটের কথা বার করবার। ওর সোনাদানা কোথায় কী লুকোনো আছে যদি জানতে পারো–
তাহলে আপনাকে তৎক্ষণাৎ জানাব, আদেলানতাদো। পিজারোর কথাটা পূরণ করে দিয়েছে গানাদো মাঝখানে বাধা দিয়ে।
পিজারো এ বেয়াদপি কিন্তু গ্রাহ্যই করেননি। লুব্ধ প্রত্যাশায় বদান্য হয়ে বলেছেন, হদিস যা তুমি দেবে তা নির্ভুল হলে সোনাদানা যা কিছু উদ্ধার হবে তার মোটা বখরা তোমার।
