উত্তর যা শুনেছেন তা তাঁকে বিমুঢ় করে দিয়েছে। আতাহুয়ালপা জানিয়েছেন, ভীরাকোচার এ আদেশ আপনাদের একজনেরই মুখ দিয়ে পেয়েছি।
আমাদেরই একজনের মুখ দিয়ে সন্দিগ্ধ স্বরটা লুকোতে পারেননি পিজারো।
হ্যাঁ, আপনাদেরই একজন। অবিচলিতভাবে বলেছেন আতাহুয়ালপা, আপনারা যাকে গানাদো বলেন সেই দৈবজ্ঞই জানিয়েছেন এ আদেশ। এ দৈবজ্ঞ আপনারই। পাঠানো মনে আছে বোধহয়?
আতাহুয়ালপার কাছে দৈবজ্ঞ পাঠাবার কথা পিজারোর ঠিকই মনে পড়েছে। না মনে পড়বার কথা নয়।
এই তো মাত্র কয়েকদিন আগের ব্যাপার। আতাহুয়ালপা সম্বন্ধে একটা মজার। খবর পিজারোর কানে আসছিল। খবরটা এমন কিছুই বলতে গেলে নয়। অন্য কোথাও বা অন্য সময় হলে হেসেই উড়িয়ে দেওয়া যেত।
আতাহুয়ালপাকে ক-দিন ধরে মাঝে মাঝে কীরকম সব রংচঙে সুতো নাড়াচাড়া করতে দেখা যাচ্ছে, এই ছিল খবর।
খবর এনেছিল অবশ্য গুপ্তচরেরা। ইংকা নরেশকে রাজসমাদরে রাখলেও। পিজারো তাঁকে পুরোপুরি বিশ্বাস তো আর করেননি। আতাহুয়ালপার মহল ঘিরে সারাক্ষণ কড়া পাহারা যেমন ছিল, তেমনই ছিল এ দেশেরই বাছা বাছা আর শেখানো পড়ানো দু-একজনকে দিয়ে তাঁর ওপর গোপনে নজর রাখবার ব্যবস্থা।
এসব গুপ্তচর হয় পুনা দ্বীপ কিংবা কুজকো শহরের কাছাকাছি দক্ষিণ অঞ্চলের লোক। পুনা দ্বীপের অধিবাসীরা ইংকা সম্রাট মাত্রেরই বিরুদ্ধে শত্রুতা করে আসছে বহুকাল ধরে। কোনও ইংকা সম্রাটের অধীনতাই তারা খুশিমনে মেনে নেয়নি। তারা দুর্দান্ত লড়াইবাজ। পিজারো নিজেই তাদের হাতে দলবল সমেত প্রায় মারা পড়তে বসেছিলেন একবার। তা সত্ত্বেও ইংকা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাদের মজ্জাগত আক্রোশের কথা জেনে তাদের দু-একজনকে দলে নিতে তিনি দ্বিধা করেননি।
পেরুর দক্ষিণ অঞ্চলের লোকও সানন্দে পিজারোর হয়ে গুপ্তচরের কাজ করেছে। আতাহুয়ালপার ভাই হুয়াসকারকেই তারা সত্যকার ইংকা মনে করে বলে। কুইটো নয়, কুজকোই তাদের কাছে আসল রাজধানী। কুইটোর ভিনদেশি রাজকুমারীর গর্ভে যার জন্ম সেই আতাহুয়ালপাকে তারা ইংকা বলেই স্বীকার করে না।
এই দুই জাতের চরই পিজারোর কাছে অদ্ভুত রঙিন সুতোর খবরটা দিয়েছিল।
খবরটা শুনে মনে মনে হাসিই পেয়েছিল পিজারোর। আতাহুয়ালপার ওপর। এদের জাতক্রোধের কথা তিনি ভালো করেই জানেন। সেই রাগে এরা নেহাত তিলকে তাল করে তুলেছে বলে মনে হয়েছিল তাঁর।
তবু জিজ্ঞাসা করেছিলেন চরেদের একটু ঠাট্টার সুরে, রঙিন সুতোগুলো কীরকম? নিজের বা অন্য কারও গলায় ফাঁস দেবার মতো কিছু?
না, তা নয়। জানিয়েছিল চরেরা প্রত্যেকেই, নেহাত রংবেরং-এর ক-টা গিট-বাঁধা সুতুলি।
এসব সুতুলি পেলেন কোথায় আতাহুয়ালপা? মুখটা কষ্ট করে গম্ভীর রেখে জিজ্ঞাসা করতে হয়েছিল পিজারোকে।
তা জানি না। একই উত্তর দিয়েছিল জনে জনে।
দোষটা কী, অমন দুচারটে রঙিন সুতো নাড়াচাড়া করলে? ইংকা নরেশের হয়তো ওগুলো একরকম খেলার জিনিস! বলে চরেদের মুখের দিকে একটু বাঁকাভাবে চেয়ে পিজারো জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ওগুলো নিয়ে ভাবনা করবার কিছু আছে? শুধু ক-টা
রঙিন গিট-পড়া সুতো বই আর কিছু তো নয়?
চরেদের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলেছিলেন পিজারো। তাঁর শেষ প্রশ্নের জবাব তারা কেউ দেয়নি।
আতাহুয়ালপা আর ইংকা-সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জন্মগত আক্রোশ নিয়েও রঙিন গিট-পড়া ক-টা সুতোর বিষয়ে খবরটুকু মাত্র জানিয়ে তারা নীরব থেকেছে।
কিন্তু ওগলো তো কিপু!—হঠাৎ উত্তেজিত উচ্ছাস শোনা গেছে। গিট-দেওয়া যে-রঙিন সুতো দিয়ে পেরুতে লেখাপড়ার কাজ চলত!
ষোড়শ শতাব্দীর কোনও এসপানিওল কি পেরুবাসীর কণ্ঠ নয়, ওই উচ্ছাস শোনা গেছে মেদভারে যিনি হস্তীর মতো বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবুর কণ্ঠে।
দাসমশাই কি বিরক্ত হয়েছেন?
আর সকলেই প্রায় তটস্থ হয়ে চেয়েছেন তাঁর দিকে। এ ধরনের মূঢ় বেয়াদবির ফল কী হতে পারে, তাঁদের অজানা নয়। দাসমশাই মুখে একেবারে তালাচাবি দিতে পারেন। মাঝপথেই পূর্ণচ্ছেদ পড়তে পারে কাহিনীর ধারায়।
মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ দাসমশাই-এর প্রতি নাতিপ্রসন্ন সেই ঐতিহাসিক শিবপদবাবুও ভবতারণবাবুর মূঢ়তাকে ঈষৎ তিরস্কার করেছেন বিপদটা কাটাবার জন্যে। বলেছেন, আপনার এখুনি বিদ্যে জাহির না করলে চলছিল না ভবতারণবাবু! ওগুলো কী, তা কি শুধু আপনিই জানেন যে কিপু বলে না চেঁচিয়ে উঠলে আমরা অন্ধকারে পড়ে থাকতাম! পিজারো নিজেই কি কিপু-র কথা একেবারে জানতেন না।
না, তিনি জানতেন না বিন্দুবিসর্গও।দাসমশাই শিবপদবাবুকে সংশোধন করতে পেরেই খুশি হয়েছেন। কিপু তখন সত্যিই তাঁর কাছে হেলাফেলার কটা রঙিন সুতো ছাড়া কিছু নয়। আতাহুয়ালপাকে জব্দ করার এমন একটা সুযোগ পেয়েও গুপ্তচরেরা কিপু-র রহস্য ফাঁস করে দিতে পারেনি।
কেন?
হিংসা, বিদ্বেষ, স্বার্থবুদ্ধির চেয়ে মনের আরও গহিন গভীর কোনও নির্দেশে বোধহয়। ব্যক্তিগত সত্তা ছাড়িয়ে যে নির্দেশ এসেছে রক্তের অতলতা থেকে।
চরেরা সব বলতে চেয়েও এক জায়গায় এসে থেমে গেছে এবং পিজারোও আতাহুয়ালপার হাতে সামান্য ক-টা রঙিন সুতোর খবর নিয়ে ব্যস্ত হবার কিছু পাননি।
তা সত্ত্বেও ওরই মধ্যে একদিন কথায় কথায় আতহুয়ালপার কাছে প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন পিজারো।
আপনি নাকি কী সব রঙিন সুতো নিয়ে খেলা করেন, সম্রাট?
