এর পর তো এ দেশের লোকের মনে সন্দেহ জাগবে আমাদের ক্ষমতায় আর আমাদের নিজেদের সৈনিকদের মনে ভয়। পিজারো যেন যন্ত্রণার সঙ্গে বলেছেন, এত কষ্টে যে চেষ্টা প্রায় সফল করে তুলেছি তা তো সব যাবে পণ্ড হয়ে। গাল্লিয়েখোকে সরিয়ে দিতে বলছেন তা দিচ্ছি, কিন্তু তাতে কি ধিকিধিকি সন্দেহের আগুন নিভবে, না লোকের মুখ বন্ধ হবে!
দে সটো আর দে কান্ডিয়া নিজেদের মনের সংশয় নিয়ে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাননি। পিজারো নিজে থেকে এবার হেরাদাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ইংকা নরেশকে বন্দি করার ব্যাপারে তার বাতলানো শয়তানি ফন্দি সফল হবার পর থেকে পিজারোর কাছে হেরাদার খাতির বেড়ে গেছে।
হেরাদা এসে সমস্যা শুনে সব দিক রক্ষা করবার জন্যে যে রটনার পরামর্শ দিয়েছে তাতে একেবারে মুশকিল আসান না হলেও হেরাদার বিচক্ষণতারই পরিচয় পাওয়া গেছে সন্দেহ নেই।
কাকসামলকা নগরের ইংকা প্রজাদের কাছে এ রটনা কতখানি পৌঁছেছে আর। তারা কীভাবে সেটা নিয়েছে তা বোঝবার সুবিধে পিজারোর সৈনিকদের হয়নি, কিন্তু তাদের নিজেদের মনে গাল্লিয়েখোর কথা চাপা দেবার জন্যে কোনও চতুর রটনার আর বিশেষ দরকার হয়নি। এমন এক উত্তেজনায় এর পর তারা মেতে উঠেছে যা অন্য সব ভয়-ভাবনা ফিকে করে দিয়েছে।
এ উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছে আতাহুয়ালপার দরবার-ঘরে দে কান্ডিয়া আর দে সটো যখন পিজারোর সঙ্গে দেখা করতে যান তার কিছুক্ষণ মাত্র আগে।
আতাহুয়ালপা তাঁর দোভাষীকে দিয়ে সেইদিনই পিজারোকে বিশেষ একটি অনুরোধ করে পাঠিয়েছিলেন। পিজারো সেই সকালেই সময় করে তাঁর একটি বিশেষ প্রস্তাব যদি শুনে যান তাহলে আতাহুয়ালপা অত্যন্ত খুশি হবেন।
পিজারো মনে মনে একটু বিরক্তি নিয়েই আতাহুয়ালপার কাছে গেছলেন। বাইরে থেকে ইংকা নরেশের মর্যাদা রক্ষার কোনও ত্রুটি না রাখলেও তাঁর কাছে দণ্ডবৎ রাজভক্তির ভান করতে কত আর ভাল লাগে! আতাহুয়ালপা ক-দিন ধরে আবার মুক্তি পাবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছেন। মুক্তি চাইবার ধরনটা ভিক্ষের মতো না হলেও দেখা করলেই সেই এক কথা, তোমরা তো এখন ইংকা সাম্রাজ্যের সহায় আর আমি তোমাদেরই লোক। আমার কি আর এই কাকসামালকা শহরের অতিথি মহল্লায় বসে বসে দিন কাটানো ভাল দেখায়? চলো, তোমাদের নিয়ে আমার সাম্রাজ্য ঘুরিয়ে দেখাই।
তা তো দেখাবেনই। আতাহুয়ালপাকে নানাভাবে স্তোক দিতে হয়েছে পিজারোকে, এখানকার গোলমালগুলো একটু সামলেই আপনার সঙ্গী হব।
সেদিন সকালের তলবটাও ওই এক কথার জন্যে ধরে নিয়ে অপ্রসন্ন মনে আসবার পর আতাহুয়ালপার প্রস্তাবটা শুনে থ হয়ে গেছেন পিজারে।
প্রথমটা আতাহুয়ালপার প্রস্তাব সত্যি বলে বিশ্বাস করতেই পারেননি। অবাক হয়ে।
আতাহুয়ালপাকে না জিজ্ঞেস করে পারেননি, আপনি আমার সঙ্গে পরিহাস করছেন নিশ্চয়!
পরিহাস করব! আপনার সঙ্গে? আতাহুয়ালপা একটু আহত হয়ে দোভাষী মারফত জানিয়েছেন, ইংকা সাম্রাজ্যের অধীশ্বরেরা পরিহাস করতে জানে না, সাগর-পারের বীর। তারা চিরকাল হয় তিরস্কার করেছে, না হয় পুরস্কার দিয়েছে। আমি আপনাকে পুরস্কার দিতে চাই। এমন পুরস্কার যা আপনার কল্পনার বাইরে।
আতাহুয়ালপা সেদিন তাঁর মুক্তির কথা একবার ইঙ্গিতেও জানাননি, পিজারোকেও তাই ঘুরিয়ে কথা বলতে হয়েছে।
আপনার কাছে পুরস্কার পাব, এ তো আমার পরম সৌভাগ্য, কিন্তু তা পাবার মতো কী যোগ্যতা আমার আছে? সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন পিজারো।
এবার আতাহুয়ালপা যা বলেছেন, তা অনুবাদ করতে দোভাষীর বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ইংকা নরেশ বলেছেন, কী আছে তা আমার চেয়ে তিনি বেশি জানেন, সারা বিশ্বের দীপ্তিদাতা পরমারাধ্য সূর্যদেবের যিনি দোসর ও অগ্রদূত। আপনাদেরই মতো শুভ্র বর্ণ নিয়ে যিনি পশ্চিম সমুদ্রকূলে ইংকা রাজশক্তির অভ্যুদয় বার্তা নিয়ে এসেছিলেন সেই মহিমান্বিত ভীরাকোচাই আমায় এ আদেশ দিয়েছেন।
ভীরাকোচা! অস্ফুটভাবে নিজের অজ্ঞাতেই পিজারোর মুখ দিয়ে বিস্মিত উচ্চারণটা বেরিয়ে গেছে। কিছুদিন ধরেই ভীরাকোচা দেবতার নামটা নানাভাবে তাঁর কানে আসছে। ভীরাকোচার নতুন করে আবির্ভাবের কিংবদন্তিও তিনি কয়েকজনের কাছে শুনেছেন।
মনের বিস্ময়-চাঞ্চল্যটা চাপা দিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন, কিন্তু আপনাদের আরাধ্য তো সূর্যদেব। ভীরাকোচাকে আপনারা মানেন? তিনি তো সূর্যদেবের প্রতিদ্বন্দ্বী।
প্রতিদ্বন্দ্বী! আতাহুয়ালপার মুখে একটু বিদ্রূপের হাসি দেখা দিয়েছে দোভাষীকে বোঝাবার সময়, আপনাদের পণ্ডিতরা তাই আপনাকে বুঝিয়েছে বুঝি! দু-দিন আমাদের দেশে পা দিতে না দিতেই আমাদের জাতি-ধর্ম-সমাজ তারা বুঝে ফেলেছে!
একটু থেমে আতাহুয়ালপা গম্ভীর হয়ে আবার বলেছেন, না, আপনি যা শুনেছেন তা ভুল। ভীরাকোচা সূর্যদেবের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, দোসর। তাঁর আর-এক নাম পাচাকামাক। সে নামের মানে হল যিনি জীবন দেন। তিনি সৃষ্টির মধ্যে জীবনের উৎস আর সূর্যদেব তার প্রাণশিখা। দু-জনের কোনও বিরোধ নেই। ভীরাকোচা তাঁর দোসরের অগ্রদূত হয়ে বরং আগে আমাদের রাজ্যে পদার্পণ করেছেন। পশ্চিম সমুদ্র উপকূলে তাঁর বিশাল দেবায়তন আপনাদের দেখাবার বাসনা রাখি।
কী করে তাঁর আদেশ পেলেন একটু জানতে পারি? পিজারো তাঁর এ কয়দিনের শোনা উদ্ভট কল্পনা-কিংবদন্তিগুলোতে আতাহুয়ালপারই অদৃশ্য হাত আছে কি না কৌশলে জানবার চেষ্টায় সরল সশ্রদ্ধ কৌতূহলের ভান করেছেন।
