ঘটনার পরের দিন থেকেই গাল্লিয়েখকে আর কামালকায় দেখা যায়নি।
কোথায় সে গেছে জানতে পারেনি কেউ। জল্পনা কল্পনা অবশ্য কয়েকদিন চলেছে। নানারকম। কেউ বলেছে লজ্জায় অপমানে আত্মঘাতী হয়েছে গাল্লিয়েখো, স্বয়ং পিজারোই তাকে এসপানিওলদের মুখে চুনকালি দেবার অপরাধে গোপনে কোতল করবার হুকুম দিয়েছেন বলেছে কেউ। কার হাতে গাল্লিয়েখোর এমন লাঞ্ছনা হয়েছিল তা নিয়ে লুকোছাপা আলোচনাটা এবার একটু অন্য দিকে বাঁক নিয়েছে। কাপিতানদেরই কাউকে, হয়তো স্বয়ং দে কাণ্ডিয়া কি দে সটোর মতো মানুষকেই ঘাঁটাতে গেছল বলে গাল্লিয়েখোর শাস্তি আর লাঞ্ছনাটা অমন চরম হয়েছে বলে শোনা গেছে কারও কারও মুখে।
এ গুজবে পুরোপুরি বিশ্বাস কেউ বোধহয় করেনি। তবু গাল্লিয়েখো সামনে থাকলে অস্ফুট সন্দেহ আর ভয়টা যে ইন্ধন পেয়ে সাংঘাতিক হয়ে উঠতে পারত সেটা না পাওয়ার দরুন এ গুজবও সৈনিকদের আশ্বস্ত করবার কাজে কিছুটা লেগেছে।
কাপিতানদের কারও হাতে শিক্ষা পেয়ে গাল্লিয়েখোর বেমালুম গায়েব হওয়ার গুজব রটাবার ফন্দিটা কিন্তু দে সেটোর নয়, কূটচক্রী সেই হেরাদার, মাকিয়াভেল্লী থেকে চুরি করা বিদ্যে দিয়ে এক হিসেবে যে ইংকা সাম্রাজ্য ধ্বংসের সবচেয়ে শয়তানি উপায় বাতলেছে।
দে সটোর হেরাদার উপর ভক্তি-শ্রদ্ধার বদলে বেশ একটু ঘৃণাই ছিল। তার কাছে। পরামর্শের জন্যে তিনি যাননি।
সদর রাস্তার ওপর গাল্লিয়েখোর লজ্জাকর লাঞ্ছনাটা শহরসুদ্ধ সবাই-এর চোখে পড়বার পর এসপানিওল বাহিনীর মান-সম্ভ্রম বাঁচাবার জন্যেই দে সটো তাকে : কামালকা থেকে সরিয়ে দেবার কথা ভেবেছেন।
এ বিষয়ে পরামর্শ করবার জন্যে প্রথমে গানাদোরই খোঁজ করেছিলেন। তাকে কোথাও না পেয়ে গাল্লিয়েশখা যাঁর দলের লোক সেই দে কান্ডিয়ার সঙ্গেই পরামর্শ করেছেন গোপনে। দে কান্ডিয়া তাঁর মতেই সায় দেবার পর দুজনে মিলে গেছেন পিজারোর কাছে।
পিজারোর কাছে খবরটা ঠিক মতো তখনও পৌঁছোয়নি। সকাল থেকে তিনি বন্দি ইংকা সম্রাট আতাহুয়ালপার কাছেই উপস্থিত আছেন বলে বোধহয় সবাই তাঁকে যথার্থ খবরটা দিতে দ্বিধা করেছে।
শহরে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে এমনই একটু ভাসা-ভাসা খবর ছাড়া পিজারোর কানে আর কিছু পৌঁছোয়নি। ইংকা নরেশ আতাহুয়ালপার সঙ্গে এমন একটা অত্যন্ত লোভনীয় আলোচনায় তিনি তখন তন্ময় যে দে সটো আর দে কান্ডিয়ার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে সেখানে আসাটা তিনি উপদ্রবই মনে করেছেন প্রথমে।
আসলে বন্দীনিবাস হলেও ইংকা নরেশ আতাহুয়ালপার জন্যে নির্দিষ্ট মহলে সম্রাটোচিত স্বাচ্ছন্দ্যবিলাসের কোনও উপকরণেরই অভাব নেই বললে হয়। পিজারো সে দিক দিয়ে কোনও ত্রুটি না রাখবার ঢালাও হুকুম দিয়েছেন। আতাহুয়ালপা যেন তাঁর নিজের ঝরনা-মহল ছেড়ে সাধ করেই অতিথি মহল্লায় কিছুদিন ডেরা বেঁধেছেন বাইরে থেকে দেখলে এমনই মনে হবে। তাঁর পেয়ারের সব পত্নীরা সেখানে জায়গা পেয়েছেন, তাঁর সেবা করবার খিদমদগার আগে যেমন থাকত এখনও তেমনই আছে। অভিজাত থেকে সাধারণ তাঁর ভদ্র প্রজারা নিত্য ভেট নিয়ে যথাসময়ে তাঁকে এখানে দর্শন করে যাবার সুযোগ পায়। পিজারো স্বয়ং আর তাঁর হুকুমে এসপানিওলরা সবাই তাঁকে সম্রাটের উপযুক্ত খাতিরই দেখায়।
সেদিন সকালেও পিজারো যেন রাজদর্শনে আসার ভঙ্গিতে আতাহুয়ালপার কাছে। বসেছিলেন। আতাহুয়ালপার সেটি এখানকার দরবার-ঘর। তিনি নিজে তাঁর বিশেষ সোনা-রুপোর কাজ করা আসনে বসে আছেন, পিজারোও দাঁড়িয়ে নেই। কিন্তু তিনি বসেছেন অতি সাধারণ আর আরও নিচু একটি আসনে। ঘরে আর একটি মাত্র লোক দাঁড়িয়ে আছে। সে দোভাষী।
পিজারো তাঁর আলোচনায় একেবারে তন্ময় থাকার দরুন প্রথমে দে সটো আর দে কান্ডিয়াকে দেখতেই পাননি। দোভাষীই তাঁদের উপস্থিতির কথা তাঁকে জানিয়েছে। পিজারোর মুখে তাতে একটু ভুকুটি ফুটে উঠেছে গোড়ায়। সেটা এক মুহূর্তের জন্যেই। তাঁর দুই প্রিয় কাপিতানকে পরে দেখা করবার কথা বলতে গিয়ে তাই তিনি থেমেছেন। দে সটো আর দে কান্ডিয়ার মুখের ভাব দেখেই গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে তাঁর দেরি হয়নি। তাঁরা মুখ ফুটে কিছু বলার আগে, নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বে হলেও, নিজে থেকেই তিনি উঠে পড়ে ইংকা নরেশের কাছে সসম্রমে বিদায় চেয়েছেন।
কিন্তু আমার যে আরও কিছু বলার ছিল। দোভাষীর মারফত জানিয়েছেন আতাহুয়ালপা। তাঁর বক্তব্যটায় ক্ষোভের আভাস থাকলেও মুখ তাঁর নির্বিকার উদাসীন।
আমি ফিরে এসেই সব শুনব। পিজারোই কুণ্ঠিত প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলেছেন, আমায় সামান্য কিছুক্ষণের জন্যে মাপ করুন, সম্রাট।
সম্রাটের কথা পুরো না শুনে চলে যাওয়ার যে স্পর্ধার জন্যে এককালে মাথাটাই কেটে রাখতেন, আতাহুয়ালপাকে প্রসন্ন মুখে তা মাপ করবার উদারতা দেখাতে হয়েছে।
পিজারো দুই কাপতানকে নিয়ে নিজের কামরায় যেতে যেতেই সমস্ত ব্যাপারটা শুনেছেন। শুনে চিন্তিত হয়েছেন অত্যন্ত বেশি। দে সটোর গাল্লিয়েখোকে কামালকা থেকে সরিয়ে দেবার প্রস্তাবে সায় দিয়েও উদ্বিগ্ন দুশ্চিন্তা তাঁর ঘোচেনি।
কে এ কাজ করতে পারে, এ প্রশ্নের চেয়ে একজন এসপানিওল সৈনিকের এ। রকম লজ্জাকর প্রকাশ্য দুর্গতির কী প্রতিক্রিয়া এ দেশের লোকের ও এসপানিওল বাহিনীর অন্য সকলের মনে হতে পারে তাই নিয়েই তাঁর দুশ্চিন্তা অত্যন্ত বেশি দেখা গেছে।
