আচার্য নাভা সবিস্ময়ে মাথা নেড়ে জানিয়েছেন, হ্যাঁ।
লোকটি কোমরের একটি থলি খুলে এক মুঠো মণিমুক্তা আশরফি আর হুন তাঁর হাত ভরে দিয়ে বলেছে, শিগগির আমায় তর্পণ করান।
নাভা বিমূঢ়ভাবে সেই অবিশ্বাস্য সম্পদ বস্ত্রপ্রান্তে বেঁধে অপরিচিত লোকটিকে গঙ্গাতীরে তর্পণ করাতে বসেছেন।
তর্পণ করতে করতেই কোথায় শারগাল শোনা গেছে ঘাটের ওপরে।
লোকটি হঠাৎ নাভার কো-কুশি কমণ্ডলু নিজের কাছে টেনে নিয়ে চাপা-গলায় বলেছে, এবার আমিই আপনাকে তর্পণ করাচ্ছি। ভক্তিভরে হাতজোড় করে বসুন।
হতভম্ব হয়ে নাভা তা-ই করেছেন।
ঘাটের ওপরে খোলা তলোয়ার হাতে নগররক্ষী সেপাই আর মহল্লার দারোগাকে এবার দেখা গেছে।
তারা নীচে নামতে শুরু করেছে।
অজানা লোকটি তার আগেই গায়ের চাদর খুলে ফেলেছে। দেখা গেছে তার গলায়ও উপবীত জড়ানো। ডান কাঁধে সে উপবীত আর উত্তরীয় রেখে দক্ষিণমুখো হয়ে বসে মাটিতে বাঁ হাটু রেখে ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মূল দিয়ে এক অঞ্জলি জল নিয়ে সে তখন বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে মন্ত্রপাঠ করছে, ওঁ যমায় ধর্মরাজায় মৃত্যবে চান্তকায় চ। বৈবশ্যতায় কালায় সর্বভূতক্ষরায় চা ঔড়ুস্বরায় দমায় নীলায় পরমোষ্ঠিনে। বৃকোদরায় চিত্রায় চিত্রগুপ্তায় বৈ নমঃ।
সেপাই আর দারোগা ঘাটের নীচে এসে দাঁড়িয়ে দুজনকেই লক্ষ করেছে কিছুক্ষণ।
অজানা লোকটি তখন নমো-তর্পণ সেরে পিতৃ আবাহন শুরু করেছে, ওঁ উশন্তা নিবীমবুশন্তঃ সমিধীমহি। উশন্ন শত আবহ পিতৃন হবিষে অন্তবে।
মন্ত্রপাঠের মাঝখানেই অধৈর্য হয়ে মহল্লার দারোগা আচার্য নাভাকে জিজ্ঞাসা করেছে, তাঁরা গঙ্গার ঘাটে নামবার পর আর কাউকে এদিকে আসতে দেখেছেন কি না?
ব্রাহ্মণকে মিথ্যা কথা বলতে হয়নি। তিনি বিনাদ্বিধায় জানিয়েছেন যে, তাঁরা দু-জন ছাড়া এ ঘাটে এ পর্যন্ত আর কেউ আসেনি।
দারোগা আর সেপাইরা তারপর চলে গেছে। অজানা লোকটির দিকে একবার দৃপাতও করেনি।
ব্রাহ্মণ অজানা লোকটির দিকে চেয়ে এবার তীব্র কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছেন, কে আপনি? আপনার পিতৃ আবাহনের মন্ত্রপাঠ শুনে বুঝলাম, আপনি ঋগ্বেদী কি যজুর্বেদী ব্রাহ্মণ! কিন্তু চেহারা আপনার ক্ষত্রিয়ের মতো! অনুগ্রহ করে জানাবেন, আপনি কে?
অজানা লোকটি একটু হেসে বলেছে, আমার মুখে না-ই শুনলেন। আমি কে তা হয়তো অচিরেই জানতে পারবেন।
ব্রাহ্মণ তা-ই পেরেছেন। লোকটি শেষ কথা বলেই হরিশ্চন্দ্রের ঘাট থেকে গঙ্গায় নেমে ড়ুব দিয়েছিল। একটা কালোমাথা ভোরের অস্পষ্ট আলোয় ভেসে উঠেছিল বহুদূরে গঙ্গার স্রোতের প্রায় মাঝামাঝি। সেই লোকটিই হবে নিশ্চয়।
ব্রাহ্মণ নিজের পূজাপাঠ সেরে ঘাটের ওপর উঠেই সেখানে সমবেত উত্তেজিত জনতার কাছে কিছুক্ষণ আগেকার শোরগোলের কারণ জানতে পেরেছিলেন। খানিক আগে স্বয়ং শিবাজি-ই নাকি এই মহল্লায় মোগল সিপাহিদের হাতে ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে পালিয়ে গেছেন। অকাতরে অত মণিমুক্তো হুন দান করায় অজানা লোকটিকে শিবাজি বলেই বিশ্বাস হয়েছে নাভার, সেই সঙ্গে একটু ধোঁকাও লেগেছে তর্পণের বিশুদ্ধ মন্ত্র আবৃত্তিতে। শিবাজি সারাজীবন শস্ত্র নিয়েই লড়া করতে করতে এমন শাস্ত্র শেখবার সময় পেলেন কখন?
৩.
দাসমশাই একটু থামলেন।
ইতিহাসের অধ্যাপক এই ফাঁকটুকুর জন্যে যেন মুখিয়ে ছিলেন। দাসমশাই নীরব হতে না হতেই বলে উঠলেন, মাপ করবেন, খাফি খাঁর বিবরণ আমিও এক সময়ে পড়েছি। আপনি যা শোনালেন তার সঙ্গে খাফি খাঁর বিবরণের মিল তো বেশি নেই।
না থাকাই স্বাভাবিক। দাসমশাই তাচ্ছিল্যভরে বললেন, খাফি খাঁর বিবরণই যে বেঠিক। তিনি সুরাটের ব্রাহ্মণ চিকিৎসক নাভার—মনে রাখবেন উর্দু হরফের গোলমালে নামটা বাভাও হতে পারে কাছে যা শুনেছেন, তা ভাল করে সবটা বুঝতেও পারেননি। তিনি লিখে গেছেন, নাভা কাশীতে এক ব্রাহ্মণের শিষ্য হয়েছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ গুরুর কাছে কিন্তু তিনি পেটভরে খেতে পেতেন না। ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শিবাজির কথা বলতে গিয়ে গুরুর বাড়িতে নাভার খেতে না পাওয়ার গল্প বলা একেবারে অর্থহীন ও অবান্তর নয় কি? খাফি খাঁ তারপর লিখে গেছেন যে, শিবাজি নাভার হাতের মুঠোয় ধনরত্ন ভরে দেবার পর তাঁরই অনুরোধে নাভা শিবাজিকে কামানো, স্নান ইত্যাদি করাতে শুরু করেন। হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান কিছু জানা থাকলে ব্রাহ্মণ-পুরোহিত যজমানের ক্ষৌরকর্ম করছেন এমন আজগুবি কথা খাফি খা লিখতেন না। খাফি খাঁ যা লিখে গেছলেন, তার ভিত্তিটা খাঁটি হলেও সম্পূর্ণ সঠিক বিবরণ তিনি দিতে পারেননি।
সে-বিবরণ আপনি শুধু পেরেছেন!
না, শিবপদবাবুর কৌতুক-মেশানো বিদ্রূপের খোঁচা নয়, মাথার কেশ যাঁর কাশের মতো শুভ্র, সেই হরিসাধনবাবুর মুগ্ধ সম্ভ্রমের বিহ্বলতা।
মহৎ অনাসক্তিতে এ উচ্ছাস অগ্রাহ্য করে দাসমশাই সবিনয়ে বললেন, শুধু আমি কেন, চেষ্টা করে হারানো আখবরাত খুঁজে বার করলে যে-কেউ এ বিবরণ পেতে পারেন।
ইতিহাসের অধ্যাপক আবার কী যেন ফ্যাকড়া তুলতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে সে-সুযোগ দাসমশাই দিলেন না। তাড়াতাড়ি আগেকার কথার খেই ধরে শুরু করলেন—শুধু সুরাটের ব্রাহ্মণ চিকিৎসক নাভার বিবরণই নয়, শিবাজির দীর্ঘতর ঘোরানো পথে নিজের রাজ্যে ফেরার অন্য জোরালো প্রমাণও আছে। যেমন, গোদাবরীর তীরের একটি গ্রামে এক চাষি পরিবারের অবিশ্বাস্য সৌভাগ্যের কাহিনী।
