রাগে সমস্ত শরীর জ্বললেও তখন কিছু করবার নেই। হাত-পা বাঁধা পঙ্গু অবস্থায় শুধু চেয়ে দেখতে হয় যে সাদা মুখোশ-ঢাকা মূর্তিটা এগিয়ে আসছে।
মূর্তিটা কাছে এসে প্রথমে গাল্লিয়েখোর তলোয়ারটা কুড়িয়ে নেয়। তাই দিয়ে তাতেই ঘোড়ার বাঁধনটা প্রথমে কেটে সেটাকে ছুটিয়ে দেয় খোলা প্রান্তরে। তারপর তলোয়ারটা নিয়ে গাল্লিয়েখোর কাছে এসে দাঁড়ায়।
যার জন্যে এত কাণ্ড সেই মেয়েটা ভয়েই এতক্ষণ বোধহয় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। এতক্ষণে সাড় ফিরে পেয়ে সে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে তার বাড়ির দিকেই ছুটে পালায়। তলোয়ারটা তুলে সে দিকে দেখিয়ে মূর্তিটা হঠাৎ তলোয়ারটা গাল্লিয়েখোর কপালের ওপর দুবার কাঁপায়। গাল্লিয়েখো একটু অস্ফুট চিৎকার না করে উঠে পারে না। চিৎকারটা শুধু কপালের কাটার জ্বালার জন্যে নয়, অক্ষম রাগের জন্যেও বটে। তার চোখের ওপরই মূর্তিটা তার তলোয়ারটা হাঁটুর ওপর দুমড়ে এক ঝটকায় তখন ভেঙে ফেলেছে। ভাঙা টুকরোগুলো মাটির ওপর দূরে ছুঁড়ে দিয়ে মূর্তিটা তারপর তার সাদা ঘোড়ায় চড়ে চলে যায়।
মূর্তিটা আর তার সাদা ঘোড়া তাহলে তুমি স্পষ্ট দেখেছে? গাল্লিয়েখোর বিবরণ শেষ হবার পর দে সটো তাঁর কাছে সবচেয়ে যা অবিশ্বাস্য সেই বিষয়টা সম্বন্ধেই আগে প্রশ্ন করেছেন।
হ্যাঁ, স্পষ্ট দেখেছি কাপিন। বলেছে গাল্লিয়েখো, আর দ্বিতীয়বারও দেখব বলে আশা রাখি।
কীসের ওপর এ আশা? সন্দিগ্ধভাবে প্রশ্ন করেছেন দে সটো।
সত্যিই এ দেশের মানুষের সহায়, অবলা-সরলার বিপদতারণ হলে, মানের দায়ে। সে মূর্তিকে যাতে আসতে হয় সেই ব্যবস্থা করছি বলে। হিংস্র আনন্দের সঙ্গে যেন তারিয়ে তারিয়ে বলেছে গাল্লিয়েখখা, আমার হাত-ফসকানো সুন্দরীকে এখন কোথায় লুকোনো হয়েছে তার পাকা খবর পেয়েছি। সেখান থেকেই তাকে জ্যান্ত বা মরা লুঠ করবই। মুখোশওলার সঙ্গে মোলাকাত সেইখানেই হবে আশা করছি।
শোনো, গাল্লিয়েখখা! অগ্নিমূর্তি হয়ে উঠে দাড়িয়েছেন দে সটো, তোমায় আমি সাবধান করে দিচ্ছি আগে থাকতে। তোমার বিরুদ্ধে এরকম কোনও অত্যাচারের নালিশ যদি আমার কানে আসে তাহলে আমি নিজে হাতে তোমায় কোতল করব।
তা-ই করবেন। কিন্তু আপনার কানে নালিশ এলে তো! গাল্লিয়েখ এখন একেবারে সম্পূর্ণ বেপরোয়া হয়ে বলেছে, নালিশ করতে আসছে কে?
জবাবে কিছুই যে বলবার নেই তা বুঝে দে সটোকে বাধ্য হয়ে চুপ করে থাকতে হয়েছে। সত্যিই গাল্লিয়েখোকে এতক্ষণ যে জেরা করেছেন তা-ই যথেষ্ট। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ করবার মতো কোনও অভিযোগ তো নেই। এই কাক্সামালকা শহরের নিরীহ অসহায় স্ত্রী-পুরুষের ওপর যত বড় অত্যাচারই সে করুক, হাতে হাতে ধরা না পড়লে এসপানিওল সৈনিক বলে কেউ তার বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে সাহস করবে
না, কোনও শাস্তিও তাকে দেওয়া যাবে না তাই।
শাস্তি কিন্তু গাল্লিয়েখো পেয়েছে। অবিশ্বাস্য শাস্তি। কামালকা শহরে একদিন সকালে হই-চই পড়ে গেছে। শহরের বড় রাস্তার ওপরই একটা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা এক এরপানিওল সৈনিক। তার কপালে শুধু নয়, দুই গালেও ঢেরা কাটা দাগ।
হিড্যালগো অর্থাৎ খানদানি বংশের না হোক, ভাল ঘরের নামকরা এক এসপানিওল বীর। সেই বীর কিনা কপালে আর দু-গালে দাগ নিয়ে সদর রাস্তার মাঝখানে বাঁধা! এ লজ্জা যে রাখবার জায়গা নেই।
কিন্তু এ কাজ কে করতে পারে! এতখানি ক্ষমতা কার হতে পারে তাই ভেবেই তো অবাক হতে হয়। গাল্লিয়েখো যেমন-তেমন যোদ্ধা তো নয়। মানুষটা অতি বদ সন্দেহ নেই। তার সঙ্গী-সাথীরাও তাকে সুনজরে দেখে না। বরং বেশ একটু ভয়ে ভয়েই থাকে। দূরে দূরে থাকে গাল্লিয়েখোর দাম্ভিক স্বভাব, অসুরের মতো শরীরের শক্তি আর তারই সঙ্গে হাতিয়ার চালাবার অদ্ভুত দক্ষতার দরুন। মানুষটার সব কিছু। নিন্দের হলেও সাহস শক্তি আর অস্ত্রকৌশলের প্রশংসা না করে উপায় নেই।
সেই অসামান্য বীরের এমন মুখ-পোড়ানো অপমান লাঞ্ছনা কার হাতে হল?
এ কাজ করবার ক্ষমতা যদিবা কারও থাকে তার এত বড় সাহস আর স্পর্ধা হয় কী করে?
এ দেশের মানুষের কাছে এসপানিওলদের দেবতার চেহারা এখন আর নেই। কিন্তু দানবের চেহারাটা তার বদলে খাড়া না রাখলে তো নয়। এমন দানব যে ইচ্ছে করলে যা খুশি করতে পারে, নিজেদের সম্বন্ধে এরকম একটা ভয় জাগিয়ে রাখতে না পারলে মুষ্টিমেয় ক-টা এসপানিওল-এর এ দেশে দু-দিন টিকে থাকাই তো সম্ভব হবে না।
সুতরাং যে কোনও একজন এসপানিওল-এর চূড়ান্ত অপমান এভাবে এ দেশের মানুষের গোচর করার মানে পিজারোর সমস্ত বাহিনীকে এদের চোখে খাটো করে তাদের ভয় ভাঙার ব্যবস্থা করা।
ধরা পড়লে এ কাজের শাস্তি পিজারোর কাছে যে কী হবে তা বোঝা শক্ত নয়। এসপানিওল হয়ে অত বড় সাহস আর স্পর্ধা কারও পক্ষে দেখানো তো অসম্ভব মনে হয়।
কিন্তু এসপানিওল কোনও সৈনিকের যদি না হয় তাহলে কাজটা কার? এ দেশের আজগুবি কুসংস্কারের গল্পই কি তাহলে বিশ্বাস করতে হয়?
পিজারোর বাহিনীর মধ্যে একটা চাপা ভয়ের গুঞ্জন আগে থাকতেই ছিল। এবার তা তীব্রভাবে ছড়াতে শুরু করেছ।
এ গুঞ্জন ক্রমশ কী চেহারা নিত বলা যায় না, কিন্তু পিজারোর কাছে অনুমতি নিয়ে আর দে কান্ডিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করে দে সটো একটা বুদ্ধিমানের মতো ব্যবস্থা করেছেন, ব্যাপারটার মূলেই কোপ দিয়ে।
