তলোয়ারও কি সেই ভেঙেছে?
হ্যাঁ, কাপিন। গাল্লিয়েখো এবার দে সটোর যোগ্য সম্মান দিয়ে রাগে ফুলতে ফুলতে বলেছে, তলোয়ার সে-ই ভেঙেছে। তা যদি না ভাঙত, যদি তলোয়ার নিয়ে আমার সঙ্গে লড়ত—
তাহলে তার দুটো চোখ তুমি উপড়ে নিতে তা জানি। আবার বাধা দিয়ে গাল্লিয়েখোকে থামিয়ে দে সটো বলেছেন, কিন্তু লোকটা কে তাই আগে জানতে চাই।
তা আমি জানি না, কাপিন। সে কোন জাতের কী রকম মানুষ তা-ও আমি জানি না।
জানো না কী রকম! গানাদোর কথাগুলো মনে করেই বোধহয় দে সটোর গলায় উদ্বিগ্ন বিস্ময় ফুটে উঠেছে যে তোমার তলোয়ার ভাঙল, তোমার কপালে দাগ দিল, সে লোকটার কীরকম চেহারা তা তো বলতে পারো অন্তত।
না, তা-ও পারি না। ক্ষুব্ধভাবে মাথা নেড়েছে গাল্লিয়েখো, তার মুখ আমি দেখতে পাইনি। শুধু দেখেছি তার মুখোশ।
শুধু মুখোশ দেখেছ? সাদা মুখোশ? দে সটোর গলাটা আপনা থেকে ধরে গিয়ে যেন বুজে এসেছে, আর তার ঘোড়া যা ছিল তার রংও সাদা?
হ্যাঁ, কাপিনা সংশয়বিমূঢ়তার সঙ্গে তীব্র আক্রোশ মেশানো স্বরে বলেছে গাল্লিয়েখো, রাতের অন্ধকারে যেন প্রেতমূর্তি বলে মনে হয়।
ভূত প্রেত বা সত্যি মানুষ যা-ই হোক, রাত্তিরবেলা তাকে তুমি দেখেছ তাহলে? দে সটোর কণ্ঠস্বর আবার তীব্র হয়ে উঠেছে, কিন্তু হঠাৎ তলোয়ার ভেঙে তোমার কপালেই বা সে দাগ দিতে গেল কেন। আচমকা অকারণে কি তোমার ওপর এসে চড়াও হল?
গাল্লিয়েখোর উত্তর দিতে কয়েক মুহূর্ত এবার দেরি হয়েছে।
অধৈর্যের সঙ্গে দে সটো তাকে ধমক দিতে যাচ্ছেন—এমন সময় নিজে থেকেই। হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে উঠে সে মুখের বাঁধন খুলে দিয়েছে। লজ্জা-সংকোচের বালাই
রেখে বিষটালা গলায় বলেছে, কারণ যদি বলতে হয় তাহলে একটাই তো খুঁজেপেতে ধরা যায়। দিনের বেলা জানলায় একটা মুখ দেখে শহরের একটা বাড়ি চিহ্নিত করে রেখেছিলাম। রাত্রে সে বাড়িতে হানা দিয়ে দরজা ভেঙে বার করে আনছিলাম মেয়েটাকে। ঘোড়াটা বাইরে বাঁধা ছিল। আটকাতে যে দু-চারটে হতভাগা এসেছিল তাদের হাত-পাগুলো উড়িয়ে দিয়ে দামি মালটা টেনে হিঁচড়ে ঘোড়ার পিঠে তুলতে যাব, এমন সময় ঘোড়াটাই চিহি করে বিকট ভয়ের ডাক ছেড়ে খাড়া হয়ে
দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে তখন চেয়ে দেখি, ওই এক অদ্ভুত মূর্তি। সাধা ঘোড়া, সাদা পোশাক, মুখে সাদা মুখোশ। এর আগে কানাঘুষায় এরকম মূর্তির কথা শুনেছিলাম। বিশ্বাস করিনি। এবার স্বচক্ষে দেখলাম। ভয় আমি কিন্তু পাইনি। মওড়া নেবার জন্যে আমি তখন প্রস্তুত।
হ্যাঁ, তুমি খুব সাহসী সবাই জানে। তিক্ত গম্ভীর স্বরে বলেছেন দে সটো, কিন্তু এ দেশের লোকেদের ওপর হামলা করা, তাদের মেয়েদের ওপর অত্যাচার করা যে গুরুতর অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে তা কি তুমি জানো না?
অপরাধ বলে ঘোষণা! কথাটা নেহাত আজগুবি মনে হয়েছে বলে এবার দে সটোর মুখের ওপরই হেসে উঠতে গাল্লিয়েখোর বাধেনি, আমরা সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে জীবনমরণ তুচ্ছ করে এদেশে এসেছি কি গির্জের ব্রহ্মচারী পাদরি হব বলে? এ দেশের লোকের গায়ে জাদুর হাত বুলোব, মেয়েদের দেখলে চোখ বন্ধ করে থাকব, এই আমাদের কাছে আশা করেন? না, কাপিন। ও সব ঘোষণার মানে আপনিও জানেন, আমরাও জানি। লোক দেখানো ওসব ভড়ং একটু করতে হয় বলে সত্যি কিছু দাম ওর আছে না কি!
গাল্লিয়েখো যা বলেছে তাই যে বেশির ভাগ সৈনিকের মনের কথা তা জেনে দে সটো তীব্র প্রতিবাদ আর কিছু করতে পারেননি। সামান্য একটু ভৎসনার সুরে শুধু বলেছেন, পাদরি হতে কাউকে বলা হয়নি, কিন্তু এ দেশের মানুষের ওপর যা খুশি অত্যাচার তো করতে পারো না। জন্তু-জানোয়ার হলেও তা করা যায় না।
এরা জন্তু-জানোয়ারের অধম। বেপরোয়া হবার পর ক্রমশ যেন মনের আর গলার জোর পেয়ে বলেছে গাল্লিয়েখো, এদের ওপর অত্যাচারের আবার জবাবদিহি আছে নাকি! তার জন্যে যদি ওই মূর্তি দেখা দিয়ে থাকে তাহলে ভূত, প্রেত, শয়তানের বাচ্চা যা-ই হোক, তার সঙ্গে আবার আমার মোকাবিলা হবেই আর তখন শোধ কী করে নেব তা আমি জানি।
কিন্তু শোধ নেবার দরকারই বা হচ্ছে কেন? তীব্রভাবেই বিদ্রূপ করে বলেছেন দে সটো, প্রথম দেখা হবার সময় কোথায় ছিল তোমার বীরত্ব। তখন তলোয়ারই বা ভাঙল কেন আর দাগই বা পড়ল কেন কপালে? তখন লড়তে পারোনি?
না, পারিনি বলেই তো আফশোশ। প্রচণ্ড জ্বালা ফুটে উঠেছে গাল্লিয়েখখার গলায়, শয়তানি চালাকিতে আমায় ঠুটো পঙ্গু করে দিয়েছে আগেই। তলোয়ার আমি ধরতেই পারিনি।
তার মানে? এবার সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছেন দে সটো, তোমার সে মূর্তির সঙ্গে লড়াই-ই হয়নি? শয়তানি চালাকি সে করেছে?
গাল্লিয়েখো বলেছে, সাদা মুখোশধারী মূর্তিকে দেখেই হুঁশিয়ার হয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। সাদা মুখোশধারীও তখন তার ঘোড়া থেকে নেমেছে। কোমরে ঝোলানো তলোয়ার তখনও কিন্তু সে খুলে হাতে নেয়নি। গাল্লিয়েখোর হাতে তখন খোলা তলোয়ার। সেই সুবিধেটা কাজে লাগাবার জন্যে গাল্লিয়েখো মূর্তিটার দিকে তলোয়ার উঁচিয়ে এবার ছুটে যায়—মূর্তিটা খাপ থেকে তলোয়ার খুলতে খুলতে গাল্লিয়েখো তাকে বেকায়দায় পেয়ে যাবে। কিন্তু সে সুযোগ আর মেলে না। হঠাৎ দড়ির মতো একটা বাঁধনে জড়িয়ে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে। তলোয়ারটা ছিটকে যায় হাত থেকে। তলোয়ারটা কুড়োবার জন্যে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে সে টের পায় যে অদ্ভুত একটা দড়ির ফাঁসে হাত-পা তার জম্পেস করে বাঁধা হয়ে গেছে। এ বাঁধনটা যে মূর্তিটারই কারসাজি তা বুঝতে দেরি হয় না। তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে যাবার সময় মূর্তিটাকে অন্ধকারে মাথার ওপর হাত তুলে কী যেন একটা করতে দেখেছিল। কিন্তু সেটা যে এই শয়তানি ফাঁস ছোড়া তা কল্পনা করতে পারেনি।
