দে সটো অনেক ওপরওয়ালা কাপিন। তবু গাল্লিয়েখো তাঁর সামনে একটু যেন ব্যাজার মুখেই এসে দাঁড়িয়েছে। সে নিজে অন্য একজন সেনাপতির অধীন বলেই বোধহয় দে সটোর ডাকে আসতে বাধ্য হওয়াটা তার পছন্দ নয়।
বিরক্তিটুকু দে সটোর নজর এড়ায়নি। কিন্তু তখন অন্য একটা কারণে ভেতরে। ভেতরে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। বাইরে তবু সেটা দমন করে তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন যথাসাধ্য শান্তভাবেই, তোমার নাম তো গাল্লিয়েখো?
হ্যাঁ, সে সটোকে যেন কথাটা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যেই অতিরিক্ত পরিচয় দিয়ে বলেছে, দে কান্ডিয়া আমাদের দলপতি।
অযাচিত এ অতিরিক্ত খবরটুকু দেওয়ার মধ্যে ইঙ্গিত নিশ্চয় এই যে দলপতি ছাড়া আর কারও কোনও সৈনিককে এভাবে তলব করা ঠিক দস্তুর নয়।
দে সটো এ ইঙ্গিত বোঝেননি এমন নয়, কিন্তু তা অগ্রাহ্য করে এবার একটু কঠিন গলায় জানতে চেয়েছেন, তুমি আরমেরিয়া থেকে নতুন তলোয়ার নিয়েছ কেন?
নতুন তলোয়ার! প্রথমটায় চমকে ওঠার পর এক মুহূর্তের মধ্যে গাল্লিয়েখোর মুখ লাল হয়ে উঠেছে রাগে।
কে বললে আমি নতুন তলোয়ার নিয়েছি! গলার স্বরেই বোঝা গেছে যে বেশ একটু কষ্ট করেই তাকে নিজেকে সামলাতে হচ্ছে।
আমি বলছি! গাল্লিয়েখখার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে জলদগম্ভীর স্বরে বলেছেন দে সটো, তাড়াতাড়ি জবাব দাও আমার প্রশ্নের। নতুন তলোয়ার কেন তোমার দরকার হল?
গাল্লিয়েখো খানিকক্ষণ চুপ করে থেকেছে। তার চোখ মুখের ভাব দেখে এমন সন্দেহও একবার হয়েছে যে সে হয়তো হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে সেনাদের অবশ্যবাধ্যতার অলঙ্ঘ্য আইনটাই ভেঙে বসবে।
কিন্তু তা সে করেনি। সম্ভবত প্রতিবাদ নিস্ফল বুঝেই এবার অন্য ভঙ্গি নিয়েছে। একটু চাপা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে যেন সহজভাবে জবাব দিয়েছে, নতুন তলোয়ার যে জন্যে দরকার হয় সেই জন্যেই নিয়েছি। আগেরটা ভেঙে গেছে বলে।
আগেরটা ভাঙল কী করে? দে সটোর সেই বজ্রগম্ভীর স্বর।
গাল্লিয়েখো আবার খানিক চুপ করে থেকেছে। বোধহয় ভাববার সময় নেবার জন্যেই। জিভের ডগায় তার যে উত্তরটা আপনা থেকে উঠে এসেছে, সেটা খুব বিনীত বোধহয় নয়। সেটাকে একটু বদলে তাই সে প্রশ্নের আকার দিয়েছে। কী করে ভাঙল তার কৈফিয়ত দিতে হবে? আগে তো কখনও হত না।
আগে না হলেও এখন দিতে হবে। গাল্লিয়েখো সম্বন্ধে রীতিমতো সন্দিগ্ধ হয়ে উঠে দে সটো কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করেছেন, আগে কখনও তোমার তলোয়ার ভেঙেছে কি?
না, ভাঙেনি। গাল্লিয়েখোর গলার ঔদ্ধত্যটা সম্পূর্ণ চাপা থাকেনি, ভেঙেছে এইবারই। তলোয়ার কি কারও কখনও ভাঙে না!
নিশ্চয়ই ভাঙে। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে বলেছেন দে সটো, সুতরাং কী করে ভেঙেছে বলতে তোমার এত আপত্তি কেন?
আপত্তি! গাল্লিয়েখো যেন অবাক হয়ে অস্বীকার করে বলেছে, আপত্তি থাকবে কেন? ব্যাপারটা বলার মতো কিছু নয় তাই বলতে চাইনি। খোলা তলোয়ার নিয়ে এ-দেশি ক-টা হতভাগাকে ঝরনামহল থেকে তাড়িয়ে বার করছিলাম। হঠাৎ ঘোড়াটা হোঁচট খেয়ে পড়ায় তলোয়ারের ফলাটা একটা পাথুরে থামে লেগে দু-টুকরো হয়ে যায়।
কৈফিয়তটা বেশ সাজানো গোছানো। খুঁত ধরবার কিছু নেই।
সেই জন্যেই কি দে সটো চুপ করে গিয়ে শুধু একটু ভুকুটিভরে গাল্লিয়েশখার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তা যে নয় তা তাঁর পরের কথাতেই বোঝা যায়। তীক্ষ্ণ তীব্র বিদ্রূপের স্বরে গাল্লিয়েখোকে শুধু নয়, ঘরটাকে পর্যন্ত কাঁপিয়ে তিনি বলেন, আর তাইতেই তোমার কপালের মাঝখানে ওই দুটো ঢেরা দাগ আপনা থেকে কেটে বসল! খোলো তোমার ও মাথার বাহারে ফেটি। দাগ দুটো আমি ভাল করে দেখতে চাই।
একেবারে চুপ হয়ে গেছে এবার গাল্লিয়েখো। আর মুখ-চোখ তার রাগে লাল নয়, বেশ একটু ফ্যাকাশে।
মাথার বাহারে ফেটি খোলবার জন্যে হাত সে তোলেনি বটে, কিন্তু দে সটোর কথার কোনও প্রতিবাদও করেনি। নীরবে ফ্যাকাশে মুখে কেমন একটু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
কই? খুলবে তোমার মাথার ফেটি। না, তার অন্য ব্যবস্থা করতে হবে?
দে সটোর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে গাল্লিয়েখো আর দেরি করেনি। মাথার চারিধারে জড়ানো ইংকা নরেশের বোলা-র ধরনের ফেটিটা ধীরে ধীরে খুলে ফেলেছে। ফেটিটার নীচে সামান্য যে কাটাটুকু লক্ষ করে দে সটো সন্দিগ্ধ হয়েছিলেন তা এবার স্পষ্ট দুটি চেরার মতো কাটা দাগ বলে বোঝা গেছে। দে সটোর অনুমান সুতরাং ভুল হয়নি।
কাটা দাগ তোমার কপালে হল কী করে? কঠিন স্বরে জিজ্ঞাসা করেছেন দে সটো, কিছু লুকোবার চেষ্টা কোরো না। বলো, কেউ কি এ দাগ দিয়েছে?
হ্যাঁ, দিয়েছে! গাল্লিয়েখোর গলা দিয়ে যেন আগুনের হলকা বার হয়েছে এবার। তবে তার জ্বলন্ত রাগের লক্ষ্য এখন আর দে সটো নন।
তখনই পেলে যেন দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে এমনই হিংস্র আক্রোশে সে আবার বলেছে, এ যার কাজ, সে যদি শয়তানের খাস সাগরেদ কি স্বর্গের দেবদূতও হয় তবু এই দাগের শোধ আমি নেবই। তলোয়ারের ডগায় তার দুটো চোখ আমি উপড়ে নেব। একটা একটা করে হাতের পায়ের সমস্ত আঙুল আমি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কাটব, তার পর
তার পর হাতের সুখ যা করবে তা আরও ভাল করে পরে ভেবে নিও। কঠিন হলেও এতক্ষণে তার সঙ্গে একটু কৌতুক মেশানো অবজ্ঞার সুরে দে সটো ধমক দিয়ে গাল্লিয়েখোকে থামিয়ে দিয়ে বলেছেন, এখন লোকটা কে বলো তো? তোমার
