বাছাই করা কজনের ওপর হয়েছে। গানাদোর কথাটাই আবার আউড়ে দে সটো বিমূঢ়ভাবে জানতে চেয়েছেন, কী হিসেবে বাছাই করা?
তাদের কীর্তি ধরে বাছাই করা। গানাদোর গলাটা একটু যেন তীব্র মনে হয়েছে, এ-দেশের নিরীহ অসহায় স্ত্রী-পুরুষের ওপর সবচেয়ে অন্যায় অত্যাচার যারা করেছে, শুধু তাদের কয়েকজনকেই যেন ভুতুড়ে সওয়ার বেছে নিয়ে শাস্তি দিয়েছেন দেখা যাচ্ছে।
তুমি তো তাহলে এ-দেশের লোকের অন্ধ কুসংস্কারেই সায় দিচ্ছ? গানাদোর দিকে সবিস্ময়ে চেয়ে বলেছেন দে সটো।
কোন অন্ধ কুসংস্কার? জিজ্ঞাসা করে যেন সরলভাবেই মন্তব্য করেছেন গানাদো, এদের অন্ধ কুসংস্কারের তো অন্ত নেই।
এদের পুরাকালের দেবতা ভীরাকোচা সম্বন্ধে এরা যা বলছে, সেই অন্ধ বিশ্বাসের কথা বলছি। দে সটো ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ভীরাকোচাই এদের হয়ে প্রতিশোধ নিতে নেমেছেন বলে এদের ধারণা। তুমি তা বিশ্বাস করো?
বিশ্বাস ঠিক করি না, কিন্তু অবিশ্বাসও বা পুরোপুরি করতে পারছি কই! গানাদো ধরাছোঁয়া না দিয়ে বলেছেন, দেবতারা কখন কীভাবে দেখা দেন কেউ কি জানে!
এ-দেশের দেবতাও তাহলে তুমি মানো! সাদাসিধে মানুষ দে সটোর গলাতেও একটু তিক্ত বিদ্রূপের সুর শোনা গেছে তুমি যে জাতে খিতানো, সেটাই আমি ভুলে গিয়েছিলাম।
হ্যাঁ, কাপিতান, আমি যে আসলে বেদে, সেটা আমাকেও ভুলতে দেবেন না, বলে গানাদো একটু অদ্ভুতভাবে হেসে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দাঁড়াও বলে সে সটো তাঁকে থামিয়েছেন।
তারপর একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই তাঁর দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, আচ্ছা, সন্ধের পর ক-দিন তোমায় খুঁজে পাইনি কেন বলো তো? তুমি-ই তো বলেছ সন্ধের পর এখন কেউ লুঠ করে, কেউ লুকোয়। তুমি নিজে কী করেছ? লুঠের ধান্দায় বেরিয়েছ,
লুকিয়েছ?
দুটোর কোনওটাই করিনি, কাপিন। একটু হেসে বলেছেন গানাদো। তাহলে? সন্দিগ্ধভাবে গানাদোর দিকে তাকিয়েছেন দে সটো। পাছে-ভেঙে-যায় ভয়ে একটা স্বপ্নকে আমি পাহারা দিয়ে রাত কাটিয়েছি, কাপিতান। আর সেই পাহারা দিতে গিয়ে ভীরাকোচা সত্যি কোথায় নামতে পারেন সন্ধান নিয়েছি তারও।
হতভম্ব দে সটোর এর পর অনেক কিছু হয়তো বলবার ছিল। কিন্তু সে-সুযোগ হয়নি। মোক্ষম হেঁয়ালিটুকু ছেড়েই গানাদো সেখান থেকে উধাও হয়ে গেছেন।
এসপানিওলদের কাছে যিনি গানাদো আমাদের সেই ঘনরাম দে সটোর কাছে সব শেষে যা বলেছিলেন তা কি সত্যিই নেহাত অর্থহীন হেঁয়ালি ছাড়া আর কিছু নয়? না, তার ভেতর অন্য কোনও গৃঢ় ইঙ্গিত ছিল?
পাছে-ভেঙে-যায় ভয়ে একটা স্বপ্নকে আমি পাহারা দিয়ে রাত কাটিয়েছি কাপিন। তিনি বলেছিলেন। সেই সঙ্গে বলেছিলেন, আর সেই পাহারা দিতে গিয়ে ভীরাকোচা সত্যি কোথায় নামতে পারেন সন্ধান নিয়েছি তারও।
দুটো উক্তিরই ওপর থেকে বিচার করলে কোনও মানে আছে বলে মনে হয় না। শুধু যেন একটু ধোঁয়াটে ধাঁধা তৈরি করবার জন্যেই তা বলা।
খিনো মানে এসপানিয়ার বেদেদের ওরকম একটু-আধটু মিথ্যে হেঁয়ালি দিয়ে বাহাদুরি করা যে স্বভাব তা দে সটোর অজানা ছিল না। শেষ পর্যন্ত কথা দুটোকে তাই তিনি তেমন আমল দেননি। গানাদোর কাছে এসপানিওল সৈনিকের আরমেরিয়া থেকে ভাঙার বদলে নতুন তলোয়ার চাওয়ার ব্যাপারটা যা শুনেছেন তা কতখানি ঠিক যাচাই করাই তাঁর কাছে বেশি জরুরি মনে হয়েছে।
যাচাই করে যা জেনেছেন তা সত্যিই তাঁকে রীতিমতো ভাবিত করে তুলেছে। একজন দু-জন নয়, প্রায় সাতজন সৈনিক এ ক-দিনে নতুন তলোয়ার অস্ত্রাগার থেকে নিয়ে গেছে। ব্যাপারটা খোদ কাপিন জেনেরাল পিজারোর কানে তোলবার মতো।
তবে তার আগে আর একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার।
সেই চেষ্টায় অস্ত্রাগারের ভাণ্ডারীর কাছে নতুন তলোয়ার যারা বদলি নিয়েছে দে সটো তাদের নাম জানতে চেয়েছেন। কিন্তু সঠিকভাবে তা জানা সম্ভব হয়নি। সত্যিকারের কেতাদূরস্ত আরমেরিয়া তো নয়, নেহাত ঢিলেঢালা ব্যাপার। সৈনিকদের নিজেদের সঙ্গে যা থাকে তার ওপর বাড়তি অস্ত্রশস্ত্রের একটা সঞ্চয় অভিযাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে বওয়া হয়। সকলে যার যখন যা দরকার হয় তা থেকে নেয়। নামকা ওয়াস্তে একজন ভাঁড়ারি আছে। সে খাতাপত্র কিছু রাখে না বললেই হয়।
আর খাতাপত্র থেকে পাওয়াই বা যাবে কী! বেশির ভাগই তো মুখখু। নাম লেখার বদলে ঢেরা কাটে মাত্র। সেরকম কয়েকটা ঢেরাই শুধু খাতায় পাওয়া গেছে। সই দিতে যারা জানে তারাও ধরা না পড়বার জন্যে ঢেরা কেটেছে কি না কে জানে।
অস্ত্রাগারের ভাঁড়ারির নাম সোটেলো। এই অভিযানেই প্রথম যোগ দিয়েছে। একটু আনাড়ি। দে সটোর তাগাদায় তলোয়ার যারা নিয়েছে তাদের একজনের নাম অতি কষ্টে সে মনে করে বলতে পেরেছে। দে সটোর ধমকে তার অপ্রস্তুত ধবনধারণে বোঝা গেছে যে একদিন লুঠপাটের উত্তেজনায় সে নিজেও এমন মেতে ছিল যে আর কোনও কিছুর হুশ রাখেনি।
একটিমাত্র যে নাম পেয়েছেন দে সটো তাই দিয়েই শুরু করেছেন তাঁর সন্ধান। খবর দিয়ে সৈনিকটিকে ডেকে পাঠিয়েছেন অতিথিশালায় তাঁর নিজের ঘরে। সৈনিকের নাম গাল্লিয়েখো। ঠিক কাবালিয়েরো মানে ভদ্রবংশের না হলেও একেবারে হেঁজিপেঁজি ইতর সাধারণ থেকে সেনাদলে নাম লেখায়নি। লম্বা-চওড়া বলিষ্ঠ চেহারায় একটু বড় ঘরোয়ানার ছাপ আছে। চালচলনে একটা উগ্র দাম্ভিকতাও। শরীরের শক্তি সত্যিই অসুরের মতো, অন্য সৈনিকরা দু-চারবার ঠেকে শিখে তাকে একটু সমীহ করে চলে বলেই আস্ফালনটা একটু বেশি।
