না, কাপিন। একটু যেন ভয়ে কাঁপানো গলায় বলেছেন গানাদো, আপনাকে হলফ করে বলতে পারি, এ-মূর্তি নিজের চোখে দেখার ভাগ্য আমার হয়নি। তবে সাদা ঘোড়ায় সাদা মুখোশ-ঢাকা সওয়ার দেখার ব্যাপারটা সত্য বা কাল্পনিক যা-ই বলুন না কেন, সেইরকম অদ্ভুত কোনও কিছুর ধরবার ছোঁবার মতো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দু-একটা যে নেই এমন নয়।
একটু থেমে দে সটোকে তাঁর প্রশ্নটা করবার অবসর না দিয়ে গানাদো আবার বলেছেন, প্রমাণগুলো অবশ্য লুকিয়ে রাখবার চেষ্টাই হয়েছে। যারা ভুক্তভোগী তারাই ব্যস্ত হয়েছে লুকিয়ে রাখতে। তবু রহস্যটা সম্পূর্ণ চাপা দেওয়া যায়নি।
কী বলছ তুমি আবোল-তাবোল? দে সটো এবার একটু বিরক্তির সঙ্গেই বলেছেন, কী প্রমাণ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে? যারা ভুক্তভোগী তারাই বা প্রমাণ লুকোতে ব্যস্ত হয়েছে কেন?
ব্যস্ত হয়েছে প্রমাণগুলো একটু লজ্জার বলে। গম্ভীরভাবে বলেছেন গানাদো, আস্ত না থেকে তলোয়ার যদি কারও দু-টুকরো হয়, তাহলে ঢাক পিটিয়ে তা জানাতে নিশ্চয় কেউ ব্যাকুল হয় না। সাহসী বীরের হাতের তলোয়ার দু-টুকরো হওয়ার কৈফিয়ত বানানো তো সোজা নয়। ভাঙা তলোয়ার লুকিয়ে ব্যাপারটা বেমালুম চেপে যাওয়ার চেষ্টাই তাই করতে হয়। মুশকিল হয় শুধু কপালের কলঙ্কের দাগটা নিয়ে।
ভাঙা দু-টুকরো তলোয়ার, কপালে কলঙ্কের দাগ, এসব কী হেঁয়ালি করছ, গানাদো? দে সটো ক্ষুব্ধস্বরে বলেছেন, আমি তোমার কাছে হেঁয়ালি শুনতে চাইনি, তার জবাব চেয়েছি।
জবাবই আপনাকে দিয়েছি, কাপতান। এবার একটু হেসে বলেছেন গানাদো, একটু খোঁজ নিলে ভাঙা দু-টুকরো তলোয়ার আর কপালের দাগের প্রমাণ আপনি নিজেই বার করতে পারবেন। প্রথমে আরমেরিয়ায় গিয়ে অস্ত্রাগারের ভাঁড়ারির কাছে গত এক হপ্তার মধ্যে ক-জন সৈনিক নতুন তলোয়ারের আর্জি জানিয়েছে খবর নিন, তার পর পারেন তো কুচকাওয়াজে সবাইকে ডেকে কপাল পরীক্ষা করে দেখুন।
একটু চুপ করে দে সটোর বিমূঢ় মুখের দিকে চেয়ে গানাদো আবার বলেছেন, কপাল পরীক্ষা করাটা এসপানিওলদের পক্ষে একটু বেশি অপমান হয়ে যাবে, কাপিন। সুতরাং তার দরকার নেই। শুধু ভাঙা তলোয়ারের হিসাবটা গোপনে নিলেই বুঝতে পারবেন একটা অদ্ভুত কিছু ঘটনা নিশ্চয়ই তার পেছনে আছে। সেই অদ্ভুত কিছু ঘটনার সঙ্গে সাদা মুখোশধারী ঘোড়সওয়ারের কিংবদন্তির সম্পর্ক কী, আর কতটুকু, তা আপনাকে বলতে পারব না।
বেশ কিছুক্ষণ দে সটো বিস্ময়বিমূঢ় হয়েই নীরব হয়ে থেকেছেন। তারপর গভীর সংশয়েরই সুর গলায় নিয়ে বলেছেন, ভাঙা তলোয়ারের ব্যাপারটার নির্ভুল প্রমাণ যখন আছে তখন তার মূলে সাদা মুখোশধারী কোনও শত্রু ঘোড়সওয়ারের রহস্য থাকতেও পারে তুমি মনে করো?
তা করি। স্বীকার করতে যেন বাধ্য হয়েছেন গানাদো।
কিন্তু, দে সটো তাঁর অবিশ্বাসের কারণগুলো প্রকাশ করেছেন, এই কাকসামালকার পাহাড়-ঘেরা অধিত্যকায় ওরকম সাদা ঘোড়া আর তার সওয়ার আসবে কোথা থেকে? ঘোড়া তো এ-দেশের প্রাণী নয়। আমরা যে-কটি সঙ্গে এনেছি তা ছাড়া একটি ঘোড়াও এই বিশাল রাজ্যে নেই। রোগে, অপঘাতে যে-ক-টা গেছে, তা বাদে ঘোড়া এখনও আমাদের যা আছে, তা গোনাগুনতি। সে-সব ঘোড়ার মধ্যেও সত্যিকার দুধে ঘোড়া যাকে বলে, তা তো একটাও নেই যে বলব কেউ চুরি করে নিয়ে গিয়ে চালাচ্ছে। আমাদের কোনও ঘোড়া চুরি সত্যিই যায়নি এ পর্যন্ত। তা গিয়ে থাকলেও তো রহস্যের কিনারা হয় না। মুখোশধারী সওয়ার তার ঘোড়া নিয়ে কোথা থেকে আসে, চলে যায়ই বা কোথায়? তাহলে ব্যাপারটা কি সত্যিই ভৌতিক বলে ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই? অশরীরী কোনও মূর্তি কি হঠাৎ দেখা দিয়ে আবার শূন্যে মিলিয়ে যায়?
দে সটো শেষ প্রশ্নটা নিজেকেই যেন করেছেন। দরকার নেই বলেই বোধ হয় গানাদো তার কোনও জবাব দেবার চেষ্টা করেননি।
দে সটো আবার নিজেই অন্য প্রশ্ন তুলেছেন, সাদা ঘোড়ার মুখোশধারী মূর্তি অশরীরী ছায়া মাত্র হতে পারে, কিন্তু সে যা করে থাকে, তা তো অলীক স্বপ্ন গোছের কিছু নয়। ভাঙা দু-টুকরো তলোয়ার আর কপালের কাটা চিহ্নের কথা যা বলছ, তা
যদি ঠিক হয়, তাহলে সে তো বিশ্রী বাস্তব সত্য। অলীক ছায়া আর এই বাস্তব সত্যে যে মেলানো যাচ্ছে না।
মেলাবার দরকার কী, কাপিন দে সটো! এবার হেসে বলেছেন গানাদো, দু-চারটে ভাঙা তলোয়ার আর কপালের কাটা দাগ কত আর আপনাদের ক্ষতি করবে? আপনাদের পেরু বিজয় তাতে আটকে থাকবে না।
তা হয়তো থাকবে না। চিন্তিতভাবে বলেছেন দে সটো, কিন্তু এরকম একটা রহস্যের কিনারা না হলেও তো নয়। আস্ত তলোয়ার কেমন করে দু-টুকরো হয়, সৈনিকদের কপালে কী করে কাটা দাগ আসে, তার ঠিক মতো হদিস না পেলে অজানা আতঙ্কটা ক্রমশ আরও ছড়িয়ে যাবে। ভুতুড়ে অত্যাচারটা বাড়তে বাড়তে কতদূর পৌঁছবে, আর কখন কার ওপর পড়বে তারই বা ঠিক কী?
না, কাপিতান। প্রতিবাদ জানিয়েছেন গানাদো, ভুতুড়ে রহস্যের মীমাংসা হবে কিনা জানি না, কিন্তু যেটুকু দেখা গেছে তাতে এটুকু বোধহয় বলা যায় যে, ভুতুড়ে অত্যাচারটা এলোপাথাড়ি খামখেয়ালিভাবে যার-তার ওপর হয়নি ও হবে না।
তার মানে? দে সটো সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছেন।
তার মানে, যাকে অত্যাচার বলছেন, তা এ পর্যন্ত যার-তার ওপরে নয়, বাছাই করা কয়েকজনের ওপরেই শুধু হয়েছে।
