ঘনরাম এ সমস্ত বিবরণই তন্ন তন্ন করে সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু কী লাভ তাঁর এ নীচ পৈশাচিক চক্রান্তের কথা খুঁটিয়ে জেনে? যা ঘটে গেছে তার পর কিছু কি তাঁর করবার আছে এ অন্যায়ের প্রতিবিধানের জন্যে?
সত্যিই কিছু নেই। আতাহুয়ালপার নিজের সৈন্য সামন্ত আর প্রজামণ্ডলীই এ নিয়তি মেনে নিয়েছে নির্বিচারে।
হত্যাতাণ্ডবের পরের দিন সকালে পিজারো যেখানে যত মৃতদেহ জমে আছে সমস্ত সরিয়ে নগর পরিষ্কার করবার হুকুম দিয়েছেন। মৃতদেহ তো দু-চারটি নয়। পিজারোর, সচিব সেরেস হাজার দুয়েক ইংকা প্রজার নিহত হওয়ার কথা লিখে গেছেন। গার্সিলার্সে দা ভেগার চেয়েও বিশ্বাসযোগ্য আর-এক বিবরণে দশ হাজার মৃতদেহের কথা পাওয়া যায়। এ বিবরণ যিনি লিখে গেছেন তিনি নিজেও একজন ইংকা বংশধর। হুয়াইনা কাপাক-এর তিনি নাতি, সুতরাং আতাহুয়ালপার ভাইপো!
তাঁর বিবরণ পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও সেই এক ভয়ংকর রাত্রে বড় জোর এক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত হাজার পাঁচেক ইংকা সাম্রাজ্যের প্রজা যে পিজারোর জল্লাদসৈনিকদের হাতে প্রাণ দিয়েছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
পিজারোর হুকুমে নগর পরিষ্কার করা হয়েছে, সেই সঙ্গে উষ্ণ-প্রস্রবণ ঘেরা আতাহুয়ালপার বিশ্রাম বা বিলাস শিবির লুণ্ঠন করতেও ভুল হয়নি।
সোনা রুপোর বাসন-কোসন গয়না-পত্রের যে পাকার সম্পদ তাতে পাওয়া গেছে তা সোনার নামে পাগল এসপানিওল সেনারা স্বপ্নেও বোধহয় আশা করতে পারেনি।
সোনাদানা নিয়ে যেমন উৎফুল্ল হয়েছে পিজারো আর তার দলবল তেমনই ফাঁপরে পড়েছে বন্দিদের সমস্যা নিয়ে।
তাদের রাজ্যেশ্বরই বন্দি হবার পর বিমূঢ় হতাশায় অতিসম্ভ্রান্ত থেকে সাধারণ অসংখ্য ইংকা প্রজা প্রায় স্বেচ্ছাতেই এসপানিওলদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। স্বয়ং ইংকা নরেশকেই যারা এত সহজে বন্দি করতে পারে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার চেষ্টাই বৃথা, ইংকা প্রজাদের এ-ই তখন বদ্ধমূল ধারণা। দলে দলে তারা দাসত্ব স্বীকার করেছে এসপানিওলদের।
কিন্তু এই অসংখ্য বন্দিকে নিয়ে কী করা হবে তা-ই কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পিজারোর বাহিনীর কাছে।
হোমরা-চোমরারা তো বটেই, সাধারণ পাঁওদল সৈনিকরাও জনে জনে অমন দশটা বিশটা করে বিনা মাইনের খিদমদগার পেয়েছে। কিন্তু তাতে সমস্যা মেটেনি। খিদমদগার পেলেই তো হবে না, তাদের খোরাক তো জোগাতে হবে। তা জুটবে কোথা থেকে?
গরম জলের ফোয়ারাগুলির কাছাকাছি পাহাড়ি উপত্যকায় প্রচুর গ্লামার পালের সন্ধান অবশ্য পিজারো পেয়েছেন। ইংকা নরেশের রাখালরা সেখানে সে পশুপাল চরায়।
সে গ্লামার পাল দিনে প্রায় শ-দেড়েক করে মেরে পিজারোর বাহিনীর রসদ জোগানো হয়েছে। সে বরাদ্দ থেকে গোলামদের ভাগ দেবার কথা নিশ্চয় ভাবা যায় না।
কয়েকজন তাই যুক্তি দিয়েছে বন্দির সংখ্যা কিছু কমিয়ে ফেলবার জন্যে।
কেমন করে? কেন, স্রেফ নিকেশ করে দিয়ে। কমপক্ষে পাঁচ-ছ হাজার যেখানে আগেই খতম হয়ে গেছে সেখানে আর দু-তিন হাজার গেলে এমন কী আসবে-যাবে?
এ যুক্তি অনুসারে কাজ অবশ্য হয়নি। কিন্তু পেরুবাসীদের ওপর অত্যাচার ক্রমশ বেড়েই গেছে অবাধে।
কামালকা উপত্যকার একটি অদ্ভুত কিংবদন্তির সূত্রপাত হয়েছে বুঝি তখন থেকেই।
আশ্চর্য সে কিংবদন্তি। হয়তো তা পরাজিত নিপীড়িত নিরুপায় পেরুবাসীর মিথ্যে সান্ত্বনা খোঁজার জন্যে বানানো অলীক কাহিনী মাত্র।
নিজেদের হাতে যে প্রতিকার করবার ক্ষমতা তাদের নেই, দেবতাকে দিয়ে তাই করাবার কল্পনা করে তারা মনের আশা মেটাতে চেয়েছে হয়তো।
এ দেবতা হলেন ভীরাকোচা। সুদূর অজানা সমুদ্র পর্বত পার হয়ে যারা ইংকা সাম্রাজ্যে এসেছে সেই এসপানিওলদের মতোই ভীরাকোচার গায়ের রং শুভ্র। তিনি নাকি এসপানিওলদের বিচার ও শাস্তি নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাক্সামালকার
পর্বত বেষ্টিত অধিত্যকায় মাঝে মাঝে সশরীরে দেখা দেন।
এসপানিওলদের কানেও এ কিংবদন্তি পৌঁছেছে। বাইরে হেসে উড়িয়ে দিলেও অনেকেই মনে মনে এ কাহিনী সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করতে পারেনি।
কারণ ভীরাকোচাকে স্বচক্ষে সুস্পষ্ট না দেখলেও এ দেবতার রহস্যময় আবির্ভাবের প্রমাণ কেউ কেউ একটু বিশ্রীভাবেই পেয়েছে।
পেরুবাসীদের ভীরাকোচা নামে দেবতাটি বেশ একটু অসাধারণ ও রহস্যময়।
ভীরাকোচা ইংকা সম্রাটদের আরাধ্য সূর্যদেব নন। অথচ তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি আর মহিমা সূর্যদেবেরই সমান। এই দেবতাটি শুধু ভীরাকোচা নয়, পাচাকামাক নামেও পরিচিত। এই নামের একটি নগর পাচাকামাক দেবতার পীঠস্থান হিসেবে সে-যুগে বিখ্যাত ছিল। এনগরের অবস্থান কর্ডিলিয়েরা অর্থাৎ আন্ডিজ পাহাড়ের শীর্ষদেশের কোনও মালভূমিতে নয়, পশ্চিমের সমতল সমুদ্রতীরে।
সেখানে পাচাকামাক বা ভীরাকোচার পূজামন্দিরের স্থাপত্যও ইংকা সম্রাটদের প্রতিষ্ঠিত সূর্যমন্দিরের চেয়ে অনেক বেশি পুরনো বলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের সিদ্ধান্ত।
পাচাকামাক বা ভীরাকোচা হলেন সেই দেবতা, সমস্ত সৃষ্টির যিনি প্রাণের উৎস। এ-সৃষ্টির রক্ষকও তিনি।
ইংকা সম্রাটরা বিজয়ীরূপে দেখা দিয়ে সমস্ত পেরু রাজ্যে যে সূর্যপূজার প্রবর্তন করেন, ভীরাকোচা দেবতা হিসাবে তার অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।
ইংকা বিজয়ীরা রাজনৈতিক সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে এই আগেকার দেবতাকে সূর্যদেবের সঙ্গেই সমান মর্যাদা দিয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন। আমরা যে-রাজ্যকে পেরু বলে জানি ইংকা সম্রাটদের কাছে জিভে গিঠ-পড়ানো তার একটা অদ্ভুত নাম ছিল—তাভতিনসুইয়ু। শব্দটার মানে হল, দুনিয়ার চার তরফ। এই তাভতিনসুইয়ুর মধ্যে পাচাকামাক-এর মন্দিরের দৈববাণীর খ্যাতি ছিল অসামান্য। সমস্ত পেরু রাজ্য থেকে তীর্থযাত্রীরা আসত এই পাচাকামাক বা ভীরাকোচার মন্দিরে দৈববাণীর জন্যে ধরনা দিতে। ভীরাকোচার প্রাধান্য ইংকা সম্রাটদের আরাধ্য সূর্যদেব তাই খর্ব করতে পারেননি।
