কে তুই কুত্তা? এত বড় অপমান শুনেও ছায়ামূর্তির কোনও চাঞ্চল্য কিন্তু দেখা যায় না। ঠিক যেন একটা অসাড় কবন্ধের মতো নিঃশব্দে ধীরে ধীরে মূর্তিটা এগিয়ে আসে।
কবন্ধের মতো মনে হবার কারণটা বুঝতে সওয়ার সৈনিকের দেরি হয় না। কিছুটা কাছাকাছি আসার দরুন দেখা যায় যে মূর্তিটার মুখটা মুখোশের মতো কালো পর্দায় যেন ঢাকা।
এসপানিওল বীর নিজের অজান্তেই দু-পা পিছিয়ে যায় এবার। কোমরের খাপ থেকে তলোয়ারটা খুলে সে তখন হাতে নিয়েছে।
মূর্তিটা কিন্তু তখনও নির্বিকারভাবে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে। তার কোমরবন্ধ থেকেও খাপে-ভরা তলোয়ারটা ঝুলতে দেখা যায়। কিন্তু সে তলোয়ার খোলবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে মূর্তিটা মাথার ওপর দু হাত তুলে কী যেন করে মনে হয়।
সওয়ার সৈনিক হাত ভোলার মানে বোঝবার জন্যে আর অবশ্য অপেক্ষা করে। মূর্তিটা আর-এক-পা বাড়াতে-না-বাড়াতে খোলা তলোয়ার নিয়ে হিংস্রভাবে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ওই ঝাঁপিয়ে পড়াই সার। হঠাৎ কী যেন কোথা দিয়ে হয়ে যায় এসপানিওল বীর বুঝতেই পারে না।
ঝাঁপিয়ে পড়ার পরমুহূর্তে দেখা যায় সওয়ার সৈনিক মাটির ওপর সচাপ্টে আছড়ে পড়ে আছে। তার শিথিল হাত থেকে তলোয়ারটা ছিটকে পড়েছে একটু দূরে। মুখোশ ঢাকা মূর্তিটা কাছে এসে সে তলোয়ারটা কুড়িয়ে নেয়। তারপর যা করে তা অদ্ভুত। অন্ধকারেই সেই তলোয়ারটা সৈনিকের মুখের ওপর একটু শুধু যেন সে কাঁপায়।
কপালে হাতটা তুলে সওয়ার সৈনিক অস্ফুষ্ট একটা চিৎকার করে ওঠে এবার। চিৎকার শুধু কপালের ওপর সূক্ষ্ম আঘাতের জন্যেই নয়। তার তলোয়ারটা সেই ভয়ংকর মূর্তি নিজের হাঁটুর ওপর নিয়ে এক চাপে তখন দু-টুকরো করে ফেলেছে। ভাঙা টুকরো দুটো সৈনিকের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে মূর্তিটা তারই ঘোড়ার ওপর লাফিয়ে গিয়ে উঠে সবেগে সেটা খোলা প্রান্তরে ছুটিয়ে দেয়।
১৯. ঘনরামকে তাঁর নির্দিষ্ট সেনাবাসে
পরের দিন সকালে ঘনরামকে তাঁর নির্দিষ্ট সেনাবাসে ঠিক মতোই দেখা যায়।
আগের রাতের হত্যাতাণ্ডবের উত্তেজনার পর ক্লান্ত সৈনিকদের কোনও কিছু খুঁটিয়ে লক্ষ কর মতো তখন অবস্থা নয়। সে অবস্থা থাকলে একজন এসপানিওল সৈনিকের কপালের ওপরকার অদ্ভুত কাটা দাগটা অনেকেরই বোধহয় বিস্ময় জাগাত।
তার কপালের ঠিক মাঝখানে নাকের ওপর কে যেন সূক্ষ্ম ছুরির ফলা দিয়ে গুণর্ক চিহ্নের মতো দুটো লম্বা ঢ্যারা কেটে দিয়েছে।
শুধু তার কপালের ওই কাটা দাগ নয়, তার মুখের চেহারাও লক্ষ করবার মতো। কী যেন এক অজানা আতঙ্কে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে তখনও।
সেই সৈনিককে ছাড়া ঘনরামকেও লক্ষ করবার মতো কিছু ছিল। ঘনরামের এরকম চেহারা আগে কখনও অন্তত দেখা যায়নি। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যারা পরিচিত তাদের কেউ, যেমন কাপিন সানসেদোও, ঘনরামের এ চেহারা দেখলে বোধহয় চিন্তিত হতেন।
না, বেশি বা অল্প, ঘনরাম কোনওরকম আহত হননি। আগের রাত্রে তাঁর মুখে যে ক্লান্ত হতাশার ছাপ পড়েছিল তা সম্পূর্ণ মুছে না গেলেও তার চেয়ে আর একটা রহস্যজনক কিছু তাঁর মুখের ওপর যেন গভীর ছায়া ফেলেছে। ভাসাভাসাভাবে দেখলে সেটা এক রকম অন্যমনস্কতা বলেই মনে করবার মতো। বাইরে যা-ই করুন, ভেতরে ভেতরে তিনি যেন আর কোনও দূর ভাবনায় তন্ময় হয়ে আছেন।
অতিথি-মহল্লার সৈন্য শিবিরে ফিরে ঘনরাম অবশ্য নিজের ভাবনায় তন্ময় হয়েই সময় কাটাননি। তাঁর প্রথম কাজ হয়েছে গত দিনের অবিশ্বাস্য ব্যাপার কেমন করে সম্ভব হল তার বিবরণ সংগ্রহ করা।
যা ঘটেছে তার পেছনে শুধু আকস্মিক উত্তেজনা যে ছিল না, সমস্ত ব্যাপারটা যে আগে থাকতে সুপরিকল্পিত, ঘনরাম তার সমস্ত খুঁটিনাটি প্রমাণই ক্রমে ক্রমে পেয়েছেন।
বাতুল হাস্যকর বলে যা ধরে নেওয়া হয়েছিল হেরাদার সেই পরামর্শই গ্রহণ করেছেন পিজারো আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা। মাকিয়াভেল্লী থেকে চুরি করে হেরাদা সিসিলির পিশাচ আগাগোক্লিস-এর সার্থক শয়তানির যে দৃষ্টান্ত দিয়েছিল তারই ছক ধরে পিজারো ইংকা নরেশকে হাতের মুঠোয় নেবার কূটকৌশল সাজিয়েছেন।
কাক্সামালকা শহরের অতিথি-মহল্লার মাঝখানে যে বিরাট উদ্যান-প্রাঙ্গণ তার তিন দিক বিশাল সব মণ্ডপালয় দিয়ে ঘেরা। সেই সব মণ্ডপের বড় বড় দরজা উদ্যানপ্রাঙ্গণের দিকেই উন্মুক্ত।
পিজারো এই সব মণ্ডপের ভেতর দু-ভাগে তাঁর সওয়ার সৈন্য রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন। পদাতিকদের তিনি রেখেছিলেন অন্য একটি আয়তনে। তা থেকে নিজের সঙ্গে তিনি বাছাই করা কুড়িজন মাত্র রেখেছিলেন বিশেষ প্রয়োজনের জন্যে। এসব ব্যবস্থা ছাড়া পেড্রো দে কানডিয়ার অধীনে দুটি ছোট কামান সমেত কয়েকজন বন্দুকধারী তিনি রেখেছিলেন নগর তোরণের দুর্গের ভেতর।
সকলের ওপরই হুকুম ছিল নির্দিষ্ট সংকেত পাবার আগে কেউ যেন ঘুণাক্ষরে নিজের উপস্থিতি জানতে না দেয়।
নির্দিষ্ট সংকেত হল একটি কামানের আওয়াজ। সে সংকেত পাওয়ার পর যে যেখানে আছে বন্যাবেগে ইংকা নরেশ আর তাঁর অনুচরবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এ-ই ছিল নির্দেশ।
সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও এই অতর্কিত আক্রমণের চমকেই শত্রুবাহিনী বিহ্বল দিশাহারা হয়ে ভেড়ার পালের মতো প্রাণ দেবে ও হার মানবে এই অনুমানই ছিল পিজারোর কূট পৈশাচিক যুদ্ধ-কৌশলের ভিত্তি।
তাঁর অনুমান আশাতীতভাবে অবশ্য নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
