ঘটনার সময়েই দূর-দূরান্তর থেকে সে সব কাহিনীর ঢেউ আগ্রা পর্যন্ত পৌঁছে ভারতসম্রাটকে বিভ্রান্ত ও উত্ত্যক্ত করে তুলেছিল।
শিবাজি কী কৌশলে তাঁর মোগল দুশমনদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছিলেন, স্কুলপাঠ্য ইতিহাসেও তার উল্লেখ মিলবে, পূজার নৈবেদ্যের নামে পাঠানো মিষ্টান্নের ঝুড়ির মধ্যে লুকিয়েই তিনি আর তাঁর ছেলে শম্ভুজি পাহারাদারদের এড়িয়ে তাঁর বন্দিশিবিরের বাইরে যান ঠিকই। কিন্তু তারপর কী করেছিলেন তিনি! কোন পথে রওনা হয়েছিলেন নিজের রাজ্যের দিকে?
আওরঙ্গজেব-এর সতর্ক পাহারায় ব্যবস্থার তো কোনও ত্রুটি ছিল না। বন্দিশিবিরে জয়সিংহের পুত্র রামসিংহের নিজস্ব রাজপুত অনুচরেরা শিবাজিকে পাহারা দেবার জন্যে মোতায়েন। দিবারাত্রি তারা ঘিরে থাকে শিবাজির শিবির। দিনে রাত্রে বহুবার। শিবাজির শয্যা পর্যন্ত তদারক করে যায়। শিবাজিকে গুপ্তঘাতকের হাত থেকে রক্ষা করাই অবশ্য তাদের আসল উদ্দেশ্য।
রাজপুত প্রহরীদের দ্বারা শিবাজির বন্দিশিবির ঘিরে শহর-কোতোয়াল সিদ্দি ফুলাদ জিসি আর দতি, মানে কামান-বন্দুক নিয়ে এক বিরাট বাহিনীকে পাহারায় রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন।
তা সত্ত্বেও পালিয়ে শিবাজি হঠাৎ অমন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন কী করে? শিবাজির পালানোর খবর জানাজানি হয়েছিল প্রায় চোদ্দো ঘণ্টা পরে। এই চোদ্দো ঘণ্টা সময় হাতে পেয়েই শিবাজি কিন্তু যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন মনে হয়েছে।
খবর পাওয়া মাত্র আওরঙ্গজেব এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেননি। আগ্রার সবচেয়ে সেরা ঘোড়ায় চড়ে ওস্তাদ সওয়ারেরা দিগ্বিদিকে ঝড়ের বেগে ছুটে গেছে শিবাজির সব পালাবার রাস্তা বন্ধ করবার নির্দেশ জানাতে। মালোয়া খাণ্ডেশের ভেতর দিয়ে শিবাজির দক্ষিণ দিকে যাবার সম্ভাবনা বেশি। সেদিকের সমস্ত ফৌজদারদের সতর্ক করে দেবার ব্যবস্থা হয়েছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তবু শিবাজিকে ধরা সম্ভব হয়নি।
প্রথম উড়ো খবর এসেছে মথুরা থেকে। আওরঙ্গজেব সে খবর বিশ্বাস করতে পারেননি। শিবাজিকে সেখানে নাকি সন্ন্যাসীর বেশে দেখা গেছে একদিন।
মথুরা আগ্রার উত্তরে। শিবাজির কি ভীমরতি ধরেছে যে, আওরঙ্গজেব-এর সেপাইরা ডালকুত্তার মতো তার সন্ধান করছে জেনেও দক্ষিণে নিজের রাজ্যের দিকে ছুটে উত্তরে রওনা হবেন!
প্রথমে খবরটায় বিশ্বাস না হলেও পরে শিবাজির এটা একটা সূক্ষ্ম চাতুরী বলেই সন্দেহ হয়েছে। সবাই যখন দক্ষিণ দিকে তাকে ধরবার জন্যে বিনিদ্র পাহারায় আছে তখন উত্তরে যাওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। শিবাজির ফন্দি যে এরকম কিছু হতে পারে, তার প্রমাণও যেন পাওয়া গেছে। উত্তর নয়, এবার পূর্বাঞ্চল থেকে। শিবাজিকে ছদ্মবেশে ইলাহাবাদে দেখা গেছে বলে লিখে পাঠিয়েছে এক হরকরা। বারাণসীধামে গঙ্গার ঘাটে একদিন সকালে শোরগোল উঠেছে শিবাজি ধরা পড়েছেন বলে। সংবাদটা সত্য নয় জানা গেছে তারপর।
সত্য মিথ্যা বিচারই কঠিন হয়ে উঠেছে এবার। গয়া, এমনকী সুদূর পুরী থেকেও শিবাজিকে স্বচক্ষে দেখার খবর লিখে জানিয়েছে অনেকে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। শিবাজি যেন ভোজবাজিতে নানা জায়গায় হঠাৎ দেখা দিয়ে আবার শূন্যে বিলীন হয়ে গেছেন।
ওদিকে আবার আওরঙ্গাবাদ থেকে এক খুফিয়ানবিশ-এর যে গোপন চিঠি ১৬৬৬-র ১৪ই নভেম্বর দিল্লি এসে পৌঁছেছে, তাতে আগ্রা থেকে পালাবার পঁচিশ দিন বাদেই শিবাজি রাজগড়ে পৌঁছে গেছেন বলে খবর দেওয়া হয়েছে। মথুরা ইলাহাবাদ বারাণসী গয়া পুরী হয়ে গণ্ডোয়ানা, হায়দরাবাদ ও বিজাপুরের পথে দিন-রাত্রি ঘোড়া চালিয়েও তো পঁচিশ দিনে আগ্রা থেকে রাজগড়ে পৌঁছনো অসম্ভব!
আগ্রা থেকে রাজগড় পর্যন্ত নাকের সোজা উড়ে যেতেই ছ-শো সত্তর মাইল।
কিন্তু উড়ে না গেলে সোজা একমুখো হয়ে তো চলা যায় না। রাস্তায় পাহাড় পর্বত। জঙ্গল আছে, আছে বহু নদী পার হওয়ার ঝামেলা, তার ওপর মোগল প্রহরীদের দৃষ্টি এড়াতে জানা সুগম পথ ছেড়ে দুর্গম ঘুরের পথে যাওয়ার প্রয়োজন। সরল রেখায় যা। ছ-শো সত্তর মাইল, আসলে তা হাজার মাইলের ওপর গিয়ে দাঁড়ায়। আর মথুরা বারাণসী গয়া পুরীর রাস্তায় তো কমপক্ষে কয়েক হাজার মাইল।
শিবাজি কোন পথে রাজগড়ে গেছেন তাহলে? আওরঙ্গাবাদের গুপ্তচরের খবর যদি ঠিক হয় তাহলে কাশী, ইলাহাবাদ, পুরী হয়ে পঁচিশ দিনে তাঁর রাজধানীতে পৌঁছনো অসম্ভব। এপথে যদি না গিয়ে থাকেন তাহলে অত জায়গা থেকে। শিবাজিকে অত লোকের দেখার গুজব ওঠে কী করে? সব গুজবই তো আজগুবি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য কয়েকটি খবরের উৎসও আছে। যেমন, খাফি খাঁ সুরাটের যে ব্রাহ্মণ চিকিৎসকের কথা লিখেছেন, তাঁর বিবরণ অবিশ্বাস করবার নয়।
ব্রাহ্মণের নাম নাভা। সুরাটে তাঁর বিরাট জমকালো প্রাসাদগোছের বাড়ি। যে বাড়ি কেনার রহস্য যে তাঁর কাছে যায় তাকেই তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে শোনান। সে-বাড়ি নিজের চিকিৎসার উপার্জনে তিনি তৈরি করেননি। তীর্থ করতে তিনি কাশী গেছলেন। আশ্বিনের তখন শেষ। একদিন ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে গঙ্গায় তিনি স্নান পূজাপাঠ করতে নেমেছেন হরিশ্চন্দ্রের ঘাটে। ঘাট তখন নির্জন। মাথায় পাগড়ি আর গায়ে মুড়িসুড়ি দিয়ে চাদর জড়ানো একটি লোক হঠাৎ তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেছে, আপনি ব্রাহ্মণ?
