তা কিন্তু হয় না।
অতিথিমহল্লার বিরাট চত্বরে আতাহুয়ালপার সঙ্গে কমপক্ষে হাজার ছয়েক সৈন্য তখন উপস্থিত। কামান-বন্দুক যা-ই থাক, পিজারোর হয়ে লড়বার লোক তো বাষট্টিজন ঘোড়সওয়ার আর একশো ছয় পদাতিক নিয়ে সবসুদ্ধ একশো আটষট্টিজন মাত্র।
ইংকা নরেশের বাহিনী যদি একবার শুধু দৃঢ়সংকল্প নিয়ে রুখে দাঁড়াত, কামানবন্দুক আর সওয়ারি ঘোড়া নিয়েও পিজারোর দল কতক্ষণ পারত যুঝতে! তাদের সব গোলাবারুদ কখন যেত ফুরিয়ে, আর সেই সঙ্গে ছ-হাজার ইংকা সেনার পায়ের চাপেই তারা দলে পিষে যেত।
তার পরিবর্তে যা অসম্ভব কল্পনাতীত তা-ই ঘটেছে এবার। পিজারোর সওয়ার সৈনিকরা খোলা তলোয়ার এলোপাথাড়ি চালাতে চালাতে ছুটে গেছে জনতার ভেতর দিয়ে। বন্দুক-কামানের গুলিগোলা আর তীরন্দাজদের তীর এই জনতার ওপর বর্ষিত হয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে। নিহত আহত হয়েছে অসংখ্য ইংকা নরেশের সৈন্য। যারা তা হয়নি, তারা গুলিগোলার ভয়ংকর ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে আর তার অজানা উৎকট গন্ধমিশ্রিত ধোঁয়ার আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে এ মরণফাঁদ থেকে পালাবার চেষ্টাতেই নিজেদের গুরুতরভাবে দলিত পিষ্ট করে গেছে। পিজারোর মুষ্টিমেয় ক-জন সৈনিক সওয়ার ঘোড়া চালিয়ে আর কামানবন্দুক ছুড়ে যা পারেনি ভয়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে ইংকাবাহিনী নিজেরাই নিজেদের সে দারুণ সর্বনাশ করেছে। চত্বরে ঢোকবার ও তা থেকে বাইরে যাবার একটিমাত্র পথই ছিল ভোলা। সে পথ পালাবার জন্যে ব্যাকুল ইংকা সেনাদের উন্মত্ত ঠেলাঠেলিতেই যারা নিহত তাদের স্তুপীকৃত শবে রুদ্ধ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত শুধু মানুষের প্রচণ্ড চাপেই চত্বর প্রকারের একটি মাটি ও পাথরে গাঁথা অংশ ধ্বসে পড়েছে আর সেই ফাঁক দিয়ে ইংকাবাহিনীর যারা পেরেছে তারাই ছুটে পালিয়েছে নগর ছাড়িয়ে যতদূর সম্ভব বাইরের মুক্ত প্রান্তরে।
সেখানে গিয়েও তারা রক্ষা পায়নি। হত্যার আনন্দে এসপানিওল সওয়ার সৈনিকরা তখন উন্মত্ত। তারা অসহায় আতঙ্কবিহ্বল পলাতকদের ভেতর সবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে অবাধে তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করেছে ডাইনে-বাঁয়ে তলোয়ার চালিয়ে।
ইংকা নরেশ আতাহুয়ালপার তখন কী হয়েছে? তিনিও কি এই আকস্মিক পৈশাচিক আক্রমণের শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন?
না, প্রাণ তাঁকে দিতে হয়নি। দেওয়াই যদিও তাঁর পক্ষে আর ইংকা সাম্রাজ্যের ইতিহাসের পক্ষে গৌরবের হত।
আতাহুয়ালপা তখন পিজারোর হাতে বন্দি হয়েছেন। প্রাণে মারা নয়, এই বন্দি করাই ছিল পিজারোর অভিপ্রায়। আতাহুয়ালপাকে জীবন্ত অবস্থায় বন্দি করবার জন্যে শেষ পর্যন্ত পিজারো বেশ একটু আহতও হয়েছিলেন ইংকা নরেশের ওপর এসপানিওল এক সৈনিকের নিক্ষিপ্ত অস্ত্র ঠেকাতে।
সে এসপানিওল সৈনিক অধৈর্য হয়েই নিশ্চয় ইংকা নরেশকে মারবার জন্যে অস্ত্র ছুড়েছিল। অধৈর্য হবার কারণ আতাহুয়ালপাকে কিছুতেই অক্ষত অবস্থায় বন্দি করবার মতো বাগে না পাওয়া।
আতাহুয়ালপার সঙ্গে যারা ছিল সেই বাহক-সেবক অনুচরেরা সবাই নিরস্ত্র। পিজারোর সৈনিকদের অতর্কিত ভয়ংকর আক্রমণের পর আর সকলের মতো তারা কিন্তু পালাবার জন্যে ব্যাকুল হয়নি। তারা সকলে অভিজাত বংশের বীর। এই কল্পনাতীত বিভীষিকার মধ্যেও তারা তাদের অধীশ্বরকে রক্ষা করবার জন্যে নিরস্ত্র অবস্থাতেই মরণপণ করে যুঝেছে।
পিজারোর আদেশ ছিল আতাহুয়ালপাকে বিন্দুমাত্র আহত না করে বন্দি করতে হবে। অতর্কিত আক্রমণে গোড়া থেকেই এসপানিওল সওয়ার সৈনিকরা সেই চেষ্টা করেও কিন্তু সফল হয়নি। সওয়ার সৈনিকরা ঘোড়ার ওপর থেকে খোলা তলোয়ার চালিয়েছে আর নিরস্ত্র নিরুপায় ইংকাবীরেরা তাদের বাধা দেবার চেষ্টা করেছে জীবন তুচ্ছ করে সে ঘোড়ার লাগাম ধরে ঝুলে পড়ে। একের পর এক বীর কাটা পড়েছে, কিন্তু তার জায়গা নেবার লোকের অভাব হয়নি।
এদিকে সূর্য অস্ত গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হয়ে আসছে। পিজারোর সৈনিকদের ভয় হয়েছে শেষ পর্যন্ত সেই অন্ধকার বিশৃঙ্খলার মধ্যে ইংকা নরেশ তাদের খপ্পর থেকে না পালাবার সুযোগ পায়। অসহিষ্ণু এক সৈনিক তখনই আতাহুয়ালপাকে লক্ষ্য করে বল্লম ছুড়ে মেরেছে আর নিজে আহত হয়ে সে বল্লম ঠেকিয়েছেন স্বয়ং পিজারো।
সে সন্ধ্যার একতরফা হত্যা-তাণ্ডবে এসপানিওলদের নিজেদের ক্ষতির পরিমাণ নাকি ওইটুকুই! পিজারো ছাড়া তাঁর সৈন্য-সামন্তদের একজনও নাকি বিন্দুমাত্র আহত হয়নি।
পিজারোর ওই আঘাতটুকু নেওয়া অবশ্য সার্থক হয়েছে পুরোমাত্রায়। কিছুক্ষণ বাদেই শিবিকাবাহী বীরদের প্রায় সবাই একে একে প্রাণ দেবার পর আতাহুয়ালপার শিবিকাই ভেঙে পড়েছে মাটিতে। পিজারো আর তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ইংকা নরেশকে সেই অবস্থাতেই বন্দি করে নিয়ে গেছেন অতিথিশালার একটি পাহারা দেওয়া কামরায়। আতাহুয়ালপার মাথায় রাজ চক্রবর্তীর প্রতীক-চিহ্ন রক্তিম বোলা তখন আর নেই। তাঁর শিবিকা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণ এক সৈনিক তা। ছিনিয়ে নিয়েছে।
এই বোলা ছিনিয়ে নেওয়ার দৃশ্যটুকু ঘনরাম নিজের চোখেই দেখেছেন। অবিশ্বাস্য এ হত্যা-তাণ্ডব শুরু হবার পর প্রথমটা বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেও তারপর তিনি আতাহুয়ালপার শিবিকা ঘিরে যেখানে উন্মত্ত সংগ্রাম চলেছে সেইদিকেই অগ্রসর হবার চেষ্টা করেছেন।
অগ্রসর হওয়া অবশ্য সহজ হয়নি। মানুষের উন্মত্ত বন্যাস্রোত ঠেলে কাছাকাছি যখন গিয়ে পৌঁছোতে পেরেছেন তখন সেখানকার নিষ্ঠুর করুণ নাটক শেষ হয়ে এসেছে। রক্তাক্ত বাহকরা ধরাশায়ী হবার সঙ্গে সঙ্গে ইংকা নরেশের টলমল শিবিকা মাটিতে ভেঙে পড়েছে এবার, আর ঘনরামের চোখের ওপরেই মিগুয়েল এসতেতে নামে এক সাধারণ সৈনিক আতাহুয়ালপার মাথার বোলা খুলে নিয়েছে টান মেরে।
