ঘনরামের ডান হাতটা আপনা থেকেই তাঁর কোমরে বাঁধা তলোয়ারের হাতলের ওপর গিয়ে একবার পড়েছিল। তৎক্ষণাৎ নিজেকে তিনি কিন্তু সামলে নিয়েছেন। বুঝেছেন যে নীরবে নিস্পন্দ দর্শকমাত্র হওয়া ছাড়া তাঁর করণীয় আর কিছু নেই।
করণীয় সত্যিই কি কিছু তাঁর ছিল?
করণীয় কিছু আছে মনে করেই কি তিনি এতক্ষণ তা হলে প্রাণপণে আতাহুয়ালপার শিবিকার কাছে পৌঁছোবার চেষ্টা করেছিলেন?
কী-ই বা তাঁর পক্ষে করা সম্ভব ছিল? কী তিনি চেয়েছিলেন করতে? কাক্সামালকা নগরের কয়েকটি অদ্ভুত পরবর্তী ঘটনায় তার আভাস পরে হয়তো পাওয়া যেতে পারে।
সেই মুহূর্তে ঘনরাম কিন্তু নির্লিপ্ত দর্শকের মতোই সব কিছু দেখেছেন, তারপর নিঃশব্দে এক সময়ে অতিথিমহল্লার চত্বর ছেড়েই বেরিয়ে গেছেন রাতের গাঢ় অন্ধকারে। আতাহুয়ালপার সম্মানে আয়োজিত পিজারোর ভোজসভায় সে রাত্রে তাঁকে দেখা যায়নি।
হ্যাঁ, পিজারো তাঁর কথার মর্যাদা রেখে সত্যিই সেই রাত্রে ইংকা নরেশকে ভোজ দিয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা আগে যেখানে ইংকাবাহিনীর রক্তবন্যা বয়ে গেছে। কাক্সামালকার সেই অতিথিমহলেরই একটি বিরাট হল-এ ভোজসভার আয়োজন হয়েছে। পিজারো আতাহুয়ালপাকে সসম্মানে নিজের পাশের আসনে বসিয়ে আপ্যায়িত করেছেন।
সেই ভোজসভায় উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য যাদের হয়েছিল তারা আতাহুয়ালপাকে দেখে বেশ একটু বিস্মিতই হয়েছে। কল্পনাতীত এই আকস্মিক ভয়ংকর ভাগ্য বিপর্যয়ের পর ইংকা নরেশ বিমূঢ় বিহ্বলতায় বিবশ হয়ে পড়লে অবাক হবার কিছু ছিল না। ভেতরে ভেতরে তাঁর মনের মধ্যে যে আলোড়নই চলুক, আতাহুয়ালপার বাইরের চেহারায় তার বিন্দুমাত্র আভাস কিন্তু কেউ দেখতে পায়নি। সম্রাটোচিত প্রশান্তিই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর মুখের ভাবে। তিনি যেন নিজের ঔদার্যে অনুগ্রহ করে এই অজানা বিদেশিদের ভোজসভা অলংকৃত করতে এসেছেন মনে হয়েছে তাঁর আলাপে আচরণে।
পিজারোর এই পৈশাচিক শঠতা সম্বন্ধেও আতাহুয়ালপা প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন বলে এই ভোজসভার একজন নিমন্ত্রিত প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ রেখে গেছেন।
আতাহুয়ালপা কি সত্যিই তাঁর বন্দিত্বের সম্পূর্ণ ভয়াবহ তাৎপর্য তখনও বোঝেননি? না, এত বড় বিরাট সাম্রাজ্যের বুকের একটি কোণে মুষ্টিমেয় ক-জন বিদেশি শত্রুর উন্মত্ত বাতুল স্পর্ধার উপযুক্ত জবাব দিতে ইংকা রাজশক্তির দেরি হবে
না, নিশ্চিত নিশ্চিন্ত এই বিশ্বাসে পিজারো আর তাঁর সঙ্গীদের একটু প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ করেছেন মাত্র।
১৮. আতাহুয়ালপা যখন পিজারোর ভোজসভায়
আতাহুয়ালপা যখন পিজারোর ভোজসভায় আপ্যায়িত হচ্ছেন ঘনরাম তখন কামালকা নগরের বাইরে উষ্ণ প্রস্রবণের কাছে ইংকা নরেশের নিজের বিশ্রাম-শিবিরের একটি বেদির ওপর একলা বসে আছেন।
এই জায়গাটিতে এসে বসবার আগে বহুক্ষণ নগরের বাইরের প্রান্তরে তিনি প্রায় অপ্রকৃতিস্থের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। পিজারোর এই পৈশাচিক শঠতায় তাঁর সমস্ত শরীর মন তখন আগুনের মতো জ্বলছে। কাক্সামালকা শহরে কিছুক্ষণ আগে যে হত্যা-তাণ্ডব হয়ে গেল তাতে তাঁর বিন্দুমাত্র হাত নেই। কিন্তু প্রত্যক্ষ যোগ না থাকলেও এই অবিশ্বাস্য পরিণামের নিমিত্তমাত্র হিসাবেও তাঁর কিছুটা দায়িত্বও অস্বীকার করবার নয়। সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের অভিযান সফল করবার জন্যে চেষ্টার ত্রুটি তো সত্যিই তাঁর ছিল না।
সে সাফল্যের এই চেহারা শুধু যদি তিনি কল্পনা করতে পারতেন! নির্মম পৈশাচিকতায় এই সোনার দেশে রক্তগঙ্গা বহাবার তিনি সহায় হবেন জানলে কাপিন সানসেদোর গণনা সফল করবার জন্য এমন ব্যাকুল তিনি নিশ্চয় হতেন না। কাপিন সানসেদোর গণনায় এত কিছু ধরা পড়া সত্ত্বেও এই ভয়ংকর নিয়তির কোনও আভাস কেন পাওয়া যায়নি?
এই নিয়তি ঘটনার স্রোতকে কোন অমোঘ সর্বনাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে তা তিনি জানেন না। জানতেও তিনি চান না। ফল যাই হোক, তাঁর জীবনের একমাত্র কাজ এখন এই নিয়তির গতিতে বাধা দেওয়া।
এখনও হয়তো একেবারে হতাশ হবার কিছু হয়নি। সর্বনাশা ঘটনা-প্রবাহের মুখ ফিরিয়ে এখনও হয়তো জল্লাদ পিশাচদের অত্যাচারের উপযুক্ত জবাব দেওয়া যায়।
অভ্রভেদী পর্বতশৃঙ্গের দেশের সমগ্র সাম্রাজ্য-শক্তির দরকার নেই। এই কাক্সামালকা শহরের ইংকাবাহিনী আর নাগরিকদের একবার রুখে দাঁড় করাতে
পারলেই এসপানিওল পিশাচেরা ফুৎকারে উড়ে যাবে এ পর্বতশিখর থেকে।
ইংকা নরেশের সেনাবাহিনী আর কাক্সামালকার নাগরিকেরা তখন আতঙ্কে
উন্মত্ত হয়ে শহর ছাড়িয়ে দিগ্বিদিক-জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে পালাতে ব্যস্ত।
ঘনরাম ইংকা বাহিনীর একজন সৈনিককেই ধরে থামিয়েছেন। কোথায় পালাচ্ছ? লজ্জা করে না তোমার! বলেছেন তীব্র কঠিন স্বরে।
ঘনরামের হাত ছাড়াবার চেষ্টায় আকুলি-বিকুলি ত্রতে করতে লোকটা পশুসুলভ একটা আর্তধ্বনি ছাড়া একটা স্পষ্ট শব্দও উচ্চারণ করতে পারেনি। আবছা অন্ধকারেও লোকটার মুখে কসাই-এর হাতে-পড়া মেষশিশুর কাতর ভয়-বিহ্বলতা শুধু দেখা গিয়েছে।
তাকে ছেড়ে দিয়ে আরও অনেককে ঘনরাম থামিয়েছেন। দু-একজন তাঁর কথার জবাবও দিতে পেরেছে।
সে জবাব শুনে হতাশায় স্তব্ধ হয়ে গেছেন ঘনরাম।
আকাশের বজ্র যাদের অস্ত্র, বিদ্যুৎগতি দানবীয় পশু যাদের বাহন, গায়ের বর্ণ যাদের তুষারের মতো শুভ্র সেই অতিমানবদের বিরুদ্ধে যোঝবার চেষ্টাই বাতুলতা!আতঙ্কবিহ্বল আর্তনাদ হিসাবে এই বিশ্বাসই নানাভাবে ধ্বনিত হয়েছে। নানাজনের মুখে।
