শুধু পাদরিসাহেবের ভাষণের অর্থ যখন তাঁকে অনুবাদ করে শোনানো হয়েছে। তখনই তাঁর মুখ কঠিন হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে।
দোভাষী পাদরিসাহেবের বক্তৃতার যথাযথ অনুবাদ নিশ্চয়ই করতে পারেনি। তার অক্ষম অনুবাদ থেকে এইটুকু কিন্তু বোঝা গেছে যে পাদরিসাহেব পেরু সাম্রাজ্যের অধীশ্বরকে তাঁর নিজের অপবিত্র মিথ্যা ধর্ম ছেড়ে নবাগত এসপানিওলদের সত্য ধর্ম গ্রহণ করে ধন্য হতে বলছেন।
নতুন ধর্মের মাহাত্ম্য ও সুখ-সুবিধা বোঝাতে পারিসাহেব ক্রুশবিদ্ধ যিশুর জীবনী থেকে শুরু করে রোমের পোপের মহিমা আর স্পেনের সম্রাটের অসামান্য প্রতাপ প্রতিপত্তি সব কিছুই সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন।
দোভাষীর কাঁচা অনুবাদ থেকেই আতাহুয়ালপা কতখানি যে বুঝেছেন তা তাঁর জবাবেই এবার বোঝা গেছে।
আমি পৃথিবীর যে কোনও অধীশ্বরের চেয়ে বড়। জ্বলন্ত স্বরে তিনি বলেছেন, কারও অধীন আমি হব না। তোমাদের সম্রাট মস্ত কেউ হতে পারেন। এত দূরে সমুদ্র পারে তোমাদের যখন তিনি পাঠাতে পেরেছেন তখন তাঁর অসাধারণত্ব আমি স্বীকার করি। তাঁর সঙ্গে তাই আমি বন্ধুত্ব পাতাতে চাই। আর যে পোপের কথা তুমি বলছ তাঁর তো মাথা খারাপ বলে আমার মনে হয়। নইলে যা তাঁর নয় সে দেশ তিনি দান করেন কী হিসেবে? আমার ধর্ম আমি ছাড়ব না জেনে রাখো। তুমি নিজেই বলছ তোমাদের ঈশ্বরকে তাঁর তৈরি মানুষই হত্যা করেছে। আর চেয়ে দেখো, আমার ঈশ্বর এখনও নিজের দেবলোক থেকে তাঁর সন্তানদের দিকে করুণার দৃষ্টি মেলে আছেন।
পশ্চিম আকাশে কাক্সামালকার পর্বত প্রাচীরের আড়ালে রক্তিম সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। সূর্যপ্রভব ইংকাবংশের শেষ সম্রাট আতাহুয়ালপাকে সেই দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে তাঁর আরাধ্য ঈশ্বরকে যে দেখাতে হয়েছিল তার মধ্যেই নিয়তির নির্মম ইঙ্গিত কি ছিল না?
অস্তাচলের রাঙা সূর্যকে ইংকা সাম্রাজ্যের একেশ্বর দেবতা হিসাবে দেখিয়ে প্রায় তেমনই রক্তনেত্রে ইংকা নরেশ আতাহুয়ালপা পাদরি বাবা ভালভেদের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন কঠিনস্বরে, আমায় এইমাত্র যা শুনিয়েছ সেসব কথা বলবার অধিকার কে তোমায় দিয়েছে? কার হুকুমে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছ?
এরপর যা ঘটেছে তার কোন বিবরণ সম্পূর্ণ সঠিক তা বলা শক্ত। প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও একটু দূরে থাকার দরুন ঘনরামও তখনকার বিশৃঙ্খল উত্তেজনার মধ্যে ঘটনার ধারা ঠিকমতো অনুসরণ করতে পারেননি।
আতাহুয়ালপার ক্রুদ্ধ কণ্ঠ শোনবার পরই তাঁর অনুচর বাহক ও প্রহরীরা অস্থির চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
আতাহুয়ালপার রক্তচক্ষু দেখে আর জ্বলন্ত স্বর শুনে পাদরি বাবা ভালভের্দে-ও তখন বেশ ভড়কে গিয়েছেন নিশ্চয়। তিনি নাকি তাঁর হাতের একটি বই। আতাহুয়ালপার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেছেন, হুকুম আমি পেয়েছি এইটি থেকে।
আতাহুয়ালপা বইটি হাতে নিয়ে দু-একটা পাতা উলটেই নাকি রেগে ফেটে পড়েছেন। বইটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বজ্রস্বরে পাদরিসাহেবকে শাসিয়ে বলেছেন, তোমার সঙ্গীদের গিয়ে বলো যে তারা এ পর্যন্ত যা যা অন্যায় করেছে সব কিছুর জবাবদিহি না নিয়ে আমি যাব না।
এই বই ছুঁড়ে ফেলাই নাকি বারুদের গাদায় আগুনের ফুলকির কাজ করেছে, কারণ বইটি ছিল নাকি বাইবেল।
পাদরিবাবা ভালভেদে এরপর বাইবেলটি কুড়িয়ে নিয়ে অতিথিশালার ভেতরে পিজারোর কাছে ছুটে ফিরে গিয়েছেন। আর তার কয়েক মুহূর্ত বাদেই যা শুরু হয়েছে।
তা ঘনরামের কাছেও অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়েছে।
ভিড়ের মধ্যে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখান থেকে বাইবেল ছুড়ে ফেলার মতো কোনও ব্যাপার ঘনরাম দেখতে পাননি। আতাহুয়ালপাকে ঘিরে জনতার একটা ক্রুদ্ধ উত্তেজিত আলোড়নই শুধু লক্ষ করেছেন। পাদরি-বাবা ভালভের্দে-র ব্যস্ত হয়ে অতিথিশালার ভেতরে ছুটে যাওয়াটা অবশ্য তাঁর নজর এড়ায়নি।
কিছু একটা অপ্রত্যাশিত যে ঘটতে যাচ্ছে এটুকু তিনি ঠিকই অনুমান করেছেন। শুধু অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা যে কী হতে পারে তা কল্পনাও করতে পারেননি।
আতাহুয়ালপার অভ্যর্থনার ব্যাপারটা এমন বিশৃঙ্খল হয়ে যাবার কারণ ভাল করে বোঝবার জন্যে ঘনরাম অতিথিশালার দিকেই তখন এগুতে শুরু করেছিলেন। হঠাৎ তাঁকে চমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছে।
চমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন তিনি অকস্মাৎ কামানের গর্জনে।
এই সময়ে কামান গর্জে উঠল কী করে, কোথা থেকে? বিস্মিত বিহ্বলভাবে চারদিকে চেয়ে ঘনরাম এবার কোথা থেকে কামান ছোড়া। হচ্ছে দেখতে পেয়েছেন। অতিথিমহল্লার প্রবেশদ্বারের দুর্গ থেকেই কামান ছোড়া হচ্ছে ইংকা বাহিনীর ওপর। ছুঁড়ছে পিজারোরই সৈনিকরা। সুকৌশলে কামান ঢেকে রেখে এতক্ষণ তারা ভেতরে লুকিয়ে ছিল।
লুকিয়ে থাকা এসপানিওল সৈন্য চারিদিকের সমস্ত অতিথিশালা থেকেই এবার পিলপিল করে বেরিয়ে এসেছে। নেতা হিসেবে তাদের চালনা করছেন স্বয়ং ফ্রানসিসকো পিজারো। জয় সন্ত খাগো-র! মেরে শেষ করো ওদের!—এই চিৎকার-ধ্বনি তুলে নিজের রিসালা নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ইংকাবাহিনীর ওপর।
সম্পূর্ণ অতর্কিত অন্যায় এ আক্রমণ। এর চেয়ে নীচ জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা আর কিছু হতে পারে না!
কিন্তু এ পৈশাচিক শঠতায় লাভ কিছু হবে কি? এ তো শুধু অন্ধ মূঢ়তায় সাধ করে সর্বনাশ ডেকে আনা। ইংকা নরেশের হাজার হাজার প্রহরী অনুচর আর সৈন্যবাহিনীর মধ্যে ওই ক-টি এসপানিওল যোদ্ধা তো দেখতে দেখতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
