ইংকা নরেশের অভিজাত সব সেবকদের সারা অঙ্গে বিচিত্র সব সোনার অলংকার। বিকেলের রোদে সেই সব স্বর্ণালংকার যেন আগুনের মতো জ্বলছে।
অভিজাত অনুচর আর সেবক ছাড়া ইংকা নরেশের শোভাযাত্রায় আছে অগণন সৈন্যসামন্ত। রাজপথে তাদের সকলকে কুলোয়নি। বেশির ভাগ পথের ধারের প্রান্তরে যতদূর দৃষ্টি যায় ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘনরাম তাঁর ঘোড়াটি এক জায়গায় বেঁধে রেখে এসে কাক্সামালকার নাগরিকদের সঙ্গে মিশে এ দৃশ্য দেখছিলেন।
দেখতে দেখতে মনে তাঁর একটু আশঙ্কাই জেগেছে। ইংকা আতাহুয়ালপা এত সমারোহ করে পিজারোকে দেখা দিতে আসছেন শুধু কি নিজের ঐশ্বর্যের পরিচয় দিয়ে এসপানিওলদের চমকে দিতে? না, এই দেখা দিতে যাওয়ার মধ্যে ভয়ানক
কোনও উদ্দেশ্য সত্যিই আছে?
ইংকা নরেশের অনুচরদের ভাল করে লক্ষ করে সেরকম সন্দেহের কারণ আছে বলে কিন্তু মনে হয়নি। তাদের ভাবভঙ্গি চালচলনে উৎসবের আনন্দমত্ততার লক্ষণই দেখা গেছে। মনে মনে অন্য অভিসন্ধি থাকলে দু-একজনের পক্ষে তা হয়তো গোপন করা সম্ভব, কিন্তু এত বড় বিশাল বাহিনীর সকলেই অমন নিপুণ অভিনেতা নিশ্চয় হতে পারে না।
ইংকা নরেশের এটা কপট মিছিল নয় বোঝবার পরও কেন যে মনটা তাঁর সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়নি, ঘনরাম সত্যিই তখন ভেবে পাননি।
আতাহুয়ালপার একটি সিদ্ধান্তে ঘনরাম কিছুটা তবু আশ্বস্ত হয়েছেন! পিজারো আর তাঁর বাহিনী নগরের যে অতিথি-মহল্লা অধিকার করে আছে তার আধমাইলটাক দূরে এসে শোভাযাত্রা থেমে গেছে। থেমে গেছে আতাহুয়ালপারই আদেশে।
চারিদিকের মাঠে শিবির পাতবার আয়োজন দেখে ঘনরাম বুঝেছেন ইংকা নরেশ সে রাত্রের মতো তাঁর বাহিনী নিয়ে সেখানেই কাটাতে চান।
ঘনরাম এবার নাগরিকদের ভিড় ঠেলে নিজেদের আস্তানার দিকেই এগিয়েছেন। কিন্তু বেশিদূর যাবার সুযোগ তাঁর হয়নি। রাজপথ মুক্ত রাখবার জন্যে আবার নাগরিকদের পথের পাশে সরিয়ে দিয়েছে ইংকা নরেশের সেবকবাহিনী।
জানা গেছে যে আতাহুয়ালপা তাঁর মত পরিবর্তন করেছেন পিজারোর খাতিরে। ইংকা নরেশকে রাত্রের মতো অতিথিপল্লী থেকে দূরে মুক্ত প্রান্তরে বিশ্রামের আয়োজন করতে দেখে পিজারো দূত পাঠিয়ে তাঁকে এ সংকল্প ত্যাগ করবার অনুরোধ জানিয়েছেন। অনুরোধের কারণ বলা হয়েছে এই যে পিজারো সেই রাত্রেই মহামান্য ইংকা অধীশ্বরের অভ্যর্থনার আয়োজন করে সেই সঙ্গে ভোজন-সভার সব ব্যবস্থা করেছেন। ইংকা নরেশ তাঁদের অনুগ্রহ না করলে সমস্ত আয়োজনই শুধু পণ্ড হবে না, মনে মনে পিজারোর বাহিনীর সকলে অত্যন্ত দুঃখ পাবে।
পিজারোর অনুরোধ রক্ষা করতে আতাহুয়ালপার রাজকীয় শোভাযাত্রা আবার অগ্রসর হয়েছে।
এবার আগের চেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে ঘনরাম ইংকা নরেশ আর তাঁর বাহকসেবকদের শোভাযাত্রা দেখবার সুযোগ পেয়েছেন।
আতাহুয়ালপার অনুচরদের বেশভূষা অত্যন্ত বিচিত্র তো বটেই, তাঁর নিজের পোশাকপরিচ্ছদ অলংকারও অপূর্ব।
যে শিবিকায় তাঁকে বয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে তা সোনা রুপোর পাত দিয়ে মোড়া আর নানা বিচিত্র রংবেরং-এর পাখির পালক দিয়ে অপূর্ব শোভায় সাজানো। এই শিবিকার ওপর নিরেট সোনার তৈরি একটি সিংহাসনে আতাহুয়ালপা বসে আছেন। আগের ব্রত উপবাসের দিনের সঙ্গে আতাহুয়ালপার এদিনের সাজসজ্জার অনেক তফাত। রাজচক্রবর্তীর নিদর্শনস্বরূপ কপাল ঢাকা রাঙা বোলাটি তাঁর মাথায় আগের দিনের মতোই আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে গলায় যে অসাধারণ পান্নার মালাটি দেখা যাচ্ছে তা পিজারোর নিজের দেশের যে কোনও জহুরির চোখ ধাঁধিয়ে দেবার মতো।
সাজপোশাক অলংকারের চেয়ে আতাহুয়ালপার চেহারা ও মুখের ভাবই ঘনরাম বেশি করে লক্ষ করেছেন।
সত্যিই বেশ একটু সশঙ্ক সম্ভ্রম জাগাবার মতো চেহারা। চারশো বছরের মহিমান্বিত ইংকা রক্তের ধারা তাঁর মুখে অনায়াস অসামান্য আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে।
ইংকা নরেশের শিবিকা বহন করে বিরাট শোভাযাত্রা ধীরে ধীরে এবার অতিথিপল্লীর প্রশস্ত চত্বরে প্রবেশ করেছে।
রাজশিবিকাকে পথ করে দেবার জন্য ইংকা নরেশের নিজের বাহিনীর লোকেরা দু-ধারে সরে গিয়েছে। সমস্ত ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল। কোথাও একটু বিভ্রান্তি কি গোলযোগ নেই। ইংকা নরেশের হাজার পাঁচেক সেবক অনুচর তখন অতিথিভবন বেষ্টিত মহাচত্বরে সমবেত।
নিঃশব্দে আতাহুয়ালপার শিবিকা চত্বর পার হয়ে সামনের মহামণ্ডপের প্রায় কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ থেমেছে। থামবার আদেশ আতাহুয়ালপা নিজেই দিয়েছেন। তাঁর প্রশান্ত গম্ভীর মুখে এবার একটু সন্দিগ্ধ ভুকুটি দেখা গেছে। সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
যাদের তিনি দর্শন দিতে এসেছেন সেই এসপানিওলরা কোথায়? সমস্ত চত্বরে পিজারোর বাহিনীর একটি লোককেও তো দেখা যাচ্ছে না।
কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ঘনরামও তখন এই ব্যাপারে বেশ বিস্মিত হয়েছেন। ইংকা নরেশকে অভ্যর্থনা করবার এ কী রকম ব্যবস্থা? ব্যবস্থার কোথাও কোনও গুরুতর ভুল হয়েছে কি!
না, তা বোধহয় হয়নি। সেই মুহূর্তে পিজারোর বাহিনীর ডোমিনিসিয়ান পাদরি ফ্রে ভিসেন্তে দে ভালভের্দেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে। তাঁর এক হাতে একটি ক্রুশ-প্রতীক, আর-এক হাতে একটি বাইবেল।
আতাহুয়ালপা একটু অপ্রসন্নভাবেই পাদরি-বাবার দিকে তাকিয়েছেন। অভ্যর্থনার এ অভিনব রীতিটা তিনি ঠিক পছন্দ করতে পারেননি।
তবু রাজকীয় ধৈর্য তাঁর যথেষ্ট বলতে হবে। পাদরিসাহেব ইংকা নরেশের সামনে এসে দাঁড়িয়েই এক নিঃশ্বাসে কী যেন বলতে শুরু করেছেন। আতাহুয়ালপা মুখে একটু বিরক্তি প্রকাশ করা ছাড়া সে দীর্ঘ বক্তৃতায় বাধা দেননি।
