সব তো বুঝলাম!—শিবপদবাবু আর বোধহয় নীরব থাকতে পারলেন না— কিন্তু আসলে ব্যাপারটা হল কী! পিজারোর গোপন মন্ত্রণাসভায় হেরাদা চুরি করা বিদ্যে জাহির করে কী বলেছিল, কী? যা বলেছিল তার সঙ্গে মাকিয়াভেল্লীর কী এমন সম্পর্ক যে সে-নামটা শোনালেই মুখে নুন-দেওয়া জোঁকের মতো সে জব্দ হবে ভেবেছিলেন আপনার গানাদো?
হেরাদার কাছে মাকিয়াভেল্লী নামটা কেন জোঁকের মুখে নুনের মতো জিজ্ঞাসা করছেন? পরম ধৈর্য আর অনুকম্পার সঙ্গে বললেন দাসমশাই, তা হলে হেরাদা মন্ত্রণাসভায় যা বলেছিল, সেইটে একটু বিশদভাবে আগে শোনা দরকার। হেরাদা সিসিলি দ্বীপের আগাগোক্লিস-এর নাম করে তার উপায় নিতে বলেছিল। উপায়টা কী আর আগাগোক্লিস-ই বা কে? আগাগোক্লিস বড় ঘরের ছেলে নয়, একেবারে অতি সাধারণ দীন দরিদ্র এক কুমোরের ছেলে। বেপরোয়া সাহস আর বদমায়েশি বুদ্ধির জোরে সে সিরাকুস নগরের পৃটার পর্যন্ত হয়। তারপর সিরাকুস-এর শাসনপরিষদের সমস্ত নগরপ্রধানদের সে একদিন সকালে ডেকে পাঠিয়ে জড়ো করে তার নিজের সেনাদের দিয়ে অতর্কিতে নির্মমভাবে হত্যা করায়। হোমরা-চোমরাদের একজনও এ-মরণফাঁদ থেকে রেহাই পায় না। এইভাবে পথের সব কাঁটা সরিয়ে সাগাথোক্লিস সিসিলির রাজদণ্ড অনায়াসে শুধু নীচ নৃশংসতার জোরেই অধিকার করে।
হুঁ, শিবপদবাবুর মুখে এবার একটু গর্বের হাসি ফুটল, এসব তো মাকিয়াভেল্লীর দ্য প্রিন্স মানে রাজপুত্র বই-এ আছে। তাই থেকে নেওয়া।
না।দাসমশাই গম্ভীর প্রতিবাদে শিবপদবাবুকে নীরব করে পাণ্ডিত্যের শিলাবৃষ্টি করলেন, মাকিয়াভেল্লী বিখ্যাত হয়ে আছেন, অবশ্য যাকে দ্য প্রিন্স বা রাজপুত্র বলছেন সেই ইল প্রিনসিপে বইটির জন্যে। এ-বইটি পেরকুসসিনা গ্রামের উপান্তে তাঁর বিশ্রামাবাসে থেকে ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে মাকিয়াভেল্লী শেষ করেন। ইল প্রিনসিপে বইটি আসলে কিন্তু আরও একটি বড় বই ডিসকোরসি সোপ্রা লা প্রাইমা দেকা দি টিটো লিভিওর একটি অংশ মাত্র। এই বড় বইটি লেখা শুরু হয় রাজপুত্র-এর আগে, শেষও হয় অনেক পরে। মাকিয়াভেল্লী ছিলেন প্রাচীন রোমক ঐতিহাসিক লিভিও অর্থাৎ টাইটস লিভিয়স-এর দারুণ ভক্ত। ওই বড় বইটির লম্বা নামটার বাংলা মানে হল লিভিওর দশকগুলি সম্বন্ধে আলোচনা। লিভিও-র বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে ইউরোপের মধ্যযুগের নবকৌটিল্য মাকিয়াভেল্লী তাঁর বিচক্ষণ কূটনীতির পুরো পরিচয় ওই বড় বইটিতে রেখে গেছেন। হেরাদার সেই বইটি কোনওরকমে পড়া ছিল। তাই বেমালুম গাপ করে সে পিজারোর মন্ত্রণাসভায় নিজের বলে চালিয়ে বাহাদুরি দেখিয়েছে—
আর গানাদো মানে ঘনরাম তা ধরে ফেলেছেন! এতক্ষণ আচ্ছন্ন অভিভূত থাকার পর শিবপদবাবুর স্বরে একটু ঝাঁজ ফুটে উঠল—কিন্তু তাতে হল কী?
যা হল তা বড় সাংঘাতিক!—দাসমশাই সকলকে যেন তৈরি হবার সুযোগ দিতে একটু থেমে হঠাৎ নাটকের যবনিকা তুললেন—চারশো বছরের প্রাচীন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইংক্রা রাজশক্তি কর্ডিলিয়েরার তুষার-ঢাকা পার্বত্য সাম্রাজ্য থেকে কুয়াশার মতো চিরকালের জন্যে মিলিয়ে গেল।
মিলিয়ে গেল! উদরদেশ যাঁর কুম্ভের মতো স্ফীত, ভোজনবিলাসী সেই রামশরণবাবুর কণ্ঠ থেকে বিমূঢ় আক্ষেপ শোনা গেল—কেমন করে?
যেমন করে মিলিয়ে গেল তা প্রায় অবিশ্বাস্য। দাসমশাই বলে চললেন, মাত্র বাষট্টি জন সওয়ার আর একশো-ছ-জন পদাতিক যাঁর সম্বল, ইংকা সম্রাটের নিজের দুর্গনগরে অগণন বিপক্ষবাহিনীর মধ্যে যিনি একরকম বন্দি, সেই পিজারো এক কল্পনাতীত স্পর্ধা দেখিয়ে এ অসম্ভব সম্ভব করে তুললেন।
একটি বিশেষ দুঃখের কথা এই যে, ঘনরাম সম্পূর্ণভাবে এই ব্যাপারটার প্রত্যক্ষদর্শী হবার সুযোগ পাননি।
যে-রাত্রে দে সটোর কাছে মন্ত্রণাসভার বিবরণ তিনি শোনেন তার পরের দিন সকালে কাক্সামালকার পাহাড়-ঘেরা উপত্যকাটির অন্ধিসন্ধি ভাল করে একটু জানবার জন্যে একা একাই তিনি বেরিয়েছিলেন।
১৭. ইংকা আতাহুয়ালপা
তারিখটা ষোলোই নভেম্বর, ১৫৩২, শনিবার।
ইংকা আতাহুয়ালপা সেইদিনই পালটা লৌকিকতা করতে সদলে পিজারোকে দর্শন দিতে আসবেন এরকম একটা কথা ঘনরাম শুনেছিলেন। কিন্তু আতাহুয়ালপা এত তাড়াতাড়ি সে-অনুগ্রহ করবেন, ঘনরাম তা বিশ্বাস করতে পারেননি।
সেইখানেই তাঁর সর্বনাশা ভুল।
এ ভুল না করলে ইংকা সাম্রাজ্যের ইতিহাস কি ভিন্ন হত?
তা হয়তো হত না, কিন্তু পিজারো আর তাঁর বাহিনীকে ইচ্ছাপূরণের জন্যে আর একটু বেশি দাম দিতে হত নিশ্চয়।
ঘনরাম নিশ্চিন্ত নিরুদ্বিগ্ন মন নিয়েই সকালবেলা একটি ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়েছিলেন। ডিম্বাকৃতি কামালকা উপত্যকার চারিধারে কঠিন আকাশ-ছোঁয়া পর্বতপ্রাচীর। সেই পর্বতপ্রাচীর সত্যিই কতখানি দুর্ভেদ্য তা জেনে আনা ঘনরামের প্রয়োজন মনে হয়েছিল।
বেলা দুপুর পর্যন্ত দূর পাহাড়ের কোলে কোলে কাটিয়ে ঘনরাম ফিরে এসে শহরে ঢুকতে গিয়ে অবাক হয়েছেন। শহরের চেহারাই বদলে দিয়েছে। চারিদিকে উৎসবমত্ত জনতার উত্তেজিত আনন্দ কোলাহল। তার ভেতর দিয়ে ইংকা নরেশ আতাহুয়ালপা সদলবলে পিজারোকে দর্শন দিতে আসছেন।
শোভাযাত্রার সামনে আসছে অসংখ্য অনুচর। ইংকা রেশের যাত্রাপথে এতটুকু আবর্জনা কোথাও যাতে না থাকে তার জন্যে তারা তাগে আগে পথ পরিষ্কার করতে করতে চলেছে। তার পরে আসছে অভিজাত ইংকা প্রধানরা সারিবদ্ধ হয়ে। তাদের মধ্যে যারা মানে সবচেয়ে বড় তারা ইংকা সম্রাটকে তাঁর শিবিকায় কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসছে।
