না, এক মুহূর্তও আর নষ্ট করবার নয়। পিজারোকে শশব্যস্ত হয়ে মন্ত্রণাসভা ডাকতে হয়েছে।
মন্ত্রণাসভায় স্থির-ধীর আলোচনা সম্ভব হয়নি। সবাই কেমন দিশেহারা।
পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই এখন, বলেছেন কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ-এর প্রতিনিধি খাজাঞ্চি।
অনেকেই তাতে সায় দিয়েছেন। কিন্তু তাতে হবে কী?
সবাই মিলে সায় দিলেও ও-পরামর্শ যে বেকার তা কারও জানতে বাকি নেই।
পালিয়ে বাঁচবার কোনও আশা তাদের নেই, সুতরাং অন্য কোনও উপায় ভাবতে হবে।
উপায় আর কী? যতক্ষণ প্রাণ থাকবে ততক্ষণ অকাতরে লড়ে যাওয়া, বীরের মতো বলেছেন দে সটো।
আহাম্মকের মতো মিছিমিছি প্রাণটা এখানে রেখে যেতে কি এতদূরে এসেছি? দে সটোকে একটু বিদ্রূপ করেই বলেছে পিজারোর আর-এক সেনাপতি জুয়ান দে হেরাদা, রাদা নামে যে পরিচিত।
বুদ্ধিমানের মতো প্রাণটা লাভের সঙ্গে রাখার উপায়টা তা হলে বাতলাও শুনি!
দে সটো পালটা খোঁচা না দিয়ে পারেননি।
উপায় হল, সিসিলির আগাগোক্লিস যা করেছিল তা-ই। উদ্ধতভাবে জবাব দিয়েছে হেরাদা। অদূর ভবিষ্যতের ইতিহাস গাঢ় রক্তের ছোপে সে যে কলঙ্কিত করে যাবে তার ইঙ্গিত তখনই যেন তার আলাপে আচরণে দেখা গেছে।
সিসিলির আগাগোক্লিস আবার কে? কী-ই বা করেছিল সে? পিজারোর মন্ত্রণাসভার সবাই হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবার।
সে প্রশ্নের উত্তরে হেরাদা যা বলেছে সবাই তাতে থ।
শেষ মীমাংসা কিছুই অবশ্য তখন হয়নি। কিন্তু মন্ত্রণাসভার আর সকলের মতো পিজারো নিজেও কেমন বিমূঢ় দুশ্চিন্তায় সে রাতটা কাটিয়েছেন।
পিজারোর এ গোপন মন্ত্রণাসভায় গানাদো নামে পরিচিত বেদিয়ার যে জায়গা হয়নি তা বলাই বাহুল্য।
সভার সব বিবরণ সেই রাত্রেই কিন্তু তিনি পেয়েছেন। পিজারোর সেনাপতিদের মধ্যে দুটি মানুষ, অন্যদের তুলনায় অনেক সরল সোজা ও সৎ। এ দুজন হলেন। দানবাকার গ্রীক পেড্রো দে কানডিয়া আর দুর্ধর্ষ বীর দে সটো।
কী কারণে সঠিক বলা শক্ত, দে সটো প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই গানাদো নামে বেদিয়াকে একটু বেশি রকম সমীহ করেন। সময়ে-অসময়ে এই অদ্ভুত মানুষটার কাছে অত্যন্ত দামি শলাপরামর্শ কয়েকবার পেয়েই বোধহয় দে সটোর শ্রদ্ধাটা অত গভীর হয়েছে।
মন্ত্রণাসভা থেকে বেরিয়েই দে সটো প্রথমে গানাদোর খোঁজ করেছেন। তারপর একটু নিরিবিলিতে নিয়ে গিয়ে গানাদোর কাছে সভার বিবরণের সঙ্গে হেরাদা যা বলেছে তা সবই শুনিয়েছেন সবিস্তারে।
সব কিছু শোনবার পর গানাদোর মুখে একটু বিদ্রূপের হাসি দেখা গেছে। একটু বিরক্ত হয়েই দে সটো বলেছেন, এতে হাসবার কী পেলে? হাসবার পেলাম আপনাদের হেরাদার ঠগবাজি! হেসে বলেছেন গানাদো, যে বিদ্যে জাহির করে সে আপনাদের হতভম্ব করেছে তা তার বেমালুম চুরি করা।
চুরি করা বিদ্যে? দে সটো অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, তার মানে কী?
মানেটা সত্যি ভয়ানক!—এবার গম্ভীর হয়েছেন গানাদো—সেনাপতি হেরাদা। আপনাদের কাছে চুরি করা বিদ্যেরই ভড়ং করেছে। সেটা দোষের বটে, কিন্তু তার চেয়ে যা সে পরামর্শ দিয়েছে তা অনেক বেশি সাংঘাতিক। আশা করি তার কথায় কেউ কান দেবে না, কিন্তু চুরি করা বিদ্যের জোরেই এ শয়তানির প্যাঁচ যার মাথায় খেলে সে মানুষ সম্বন্ধে সাবধান থাকা দরকার বলে মনে করি।
হেরাদা সম্বন্ধে গানাদোর এত বিরাগের কারণটা ভাল করে না বুঝলেও দে সটো সে বিষয়ে প্রতিবাদ করবার কিছু পাননি। হেরাদা মানুষটাকে তাঁর নিজেরও কেন বলা যায় না অত্যন্ত খারাপ লাগে।
গানাদোর সঙ্গে একমত হয়ে হেরাদার বিদ্যের ভড়ং সম্বন্ধেই ঘৃণাভরে দে সটো এবার প্রশ্ন করেছেন, যে বিদ্যে জাহির করে তা হলে তা ওর চুরি করা?
হ্যাঁ, হেসে বলেছেন গানাদো, ওর চুরি ধরিয়ে দিয়ে ভড়ং ভাঙতে চান তো এক কাজ করুন। জোঁকের মুখে তা হলে নুন পড়বে।
কী কাজ? আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করেছেন দে সটো। আজ তো আবার আপনাদের মন্ত্রণাসভা বসবে? কৌতুকের স্বরে বলেছেন গানাদো, আজ ওর কাছে শুধু একটা নাম উচ্চারণ করবেন। শুধু বলবেন, মাকিয়াভেল্লী।
কী বললেন? মেকিয়াভেলি?
এবারের প্রশ্নটা দে সটোর নয়, মর্মরের মতো মস্তক যাঁর মসৃণ সেই শিবপদবাবুর।
মেকিয়াভেলি নয়, অনুকম্পাভরে বলেই ফেললেন দাসমশাই, ওটা হল ইংরেজি উচ্চারণ। হেরাদা যখন পিজারোর দলের কাছে চুরি করা বিদ্যে জাহির করেছে তখন ফ্লোরেন্সের নবচাণক্য মাকিয়াভেল্লীর নাম ইংরেজরা শুনেছে কি না সন্দেহ।
ইংরেজদের কাছেও কূটনীতির যে নবকৌটিল্যের নাম পৌঁছোয়নি, তা তখনই শুনেছিলেন শুধু আপনার সেই গানাদো!
শিবপদবাবুর বিস্মিত মন্তব্যে বিদ্রূপের খোঁচা নিশ্চয় একটু ছিল, কিন্তু দাসমশাই-এর নির্বিকার প্রশান্তি তা ভেদ করতে পারল না।
বরং এরকম একটা উপযুক্ত প্রশ্নে যেন খুশি হয়ে তিনি ব্যাখ্যা করে বোঝালেন— হ্যাঁ, ঘনরাম তা শুনেছিলেন আর শোনা খুব একটা আশ্চর্য কিছুও নয়। নিককলো দি বেনাদো মাকিয়াভেল্লী মাত্র পাঁচ বৎসর আগে ইতালির ফ্লোরেন্সে মারা গেছেন। ইতালি আর স্পেনের দূরত্ব এমন কিছু নয়। আর ইংরেজরা না জানলেও লাতিন দেশগুলিতে সে-যুগে জ্ঞান বিদ্যা রাজনীতির চর্চা যাঁরা করতেন ইতালির এই অসামান্য মানুষটির খবর তাঁরা অনেকেই রাখতেন—বিশেষ করে গনজালো ফার্নান্ডেজ দে ওভিয়েডো ঈ ভালডেজ-এর মতো স্বনামধন্য মানুষ তো বটেই। তিনি রাজনীতিবিদ পণ্ডিত শুধু ছিলেন না, এক সময়ে ইতালি গিয়ে নেসের রাজা ফার্ডিন্যান্ডের অধীনে কাজও করেছেন। গানাদো বলে যাঁর পরিচয়, এককালে এই ওভিয়েডোর কাছেই তিনি ক্রীতদাস ছিলেন। লেখাপড়া শেখবার সুযোগও পেয়েছিলেন সেইখানেই। মাকিয়াভেল্লীর নাম সুতরাং তাঁর অজানা থাকাটাই অস্বাভাবিক।
