ঘোড়া জানোয়ারটিই সম্পূর্ণ অজানা বলে নতুন মহাদেশের লোকের মনে তখন গভীর বিস্ময়, কৌতূহল আর আতঙ্ক জাগায়। এসপানিওল সওয়ার সৈনিকদের মধ্যে দে সটোর ঘোড়াটাই আবার সবার সেরা। তাঁর ঘোড়াও যেমন বিরাট আর তেজি দে সটো নিজেও তেমনই ওস্তাদ সওয়ার। ঘোড়ার পিঠে ইংকা আতাহুয়ালপার সবচেয়ে কাছে তিনিই দাঁড়িয়েছিলেন।
হঠাৎ কী কারণে বলা যায় না, দে সটোর তেজি ঘোড়াটা হ্রেষাধ্বনি করে একটু অস্থির হয়ে ওঠে। তারপর যা ঘটে তা কতটা দৈবাৎ আর কতটা ইচ্ছাকৃত বলা শক্ত।
দেখা যায়, দুরন্ত ঘোড়াটা লাগাম চিবিয়ে, গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে পায়ের খুরে মাটি আঁচড়াতে আঁচড়াতে যেন অকস্মাৎ খেপে গিয়ে সামনের বিরাট চত্বরে ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করেছে।
এই বার বোঝা যায় দে সটোর কেরামতি। অদ্ভুত কৌশলে কখনও বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়ে, কখনও চরকিবাজির মতো ঘুরপাকের পর ঘুরপাক খাইয়ে, দৌড়ের মধ্যেই বেপরোয়া বাঁক নিয়ে বা সামনের দু-পা শূন্যে তুলিয়ে দে সটো সওয়ারগিরিতে তাঁর আশ্চর্য নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন।
শুরুতে ঘোড়াটার অস্থির হয়ে ওঠাটা হয়তো আকস্মিক। কিন্তু ঘোড়া নিয়ে পরের বাহাদুরকা খেল দে সটো ইচ্ছে করেই দেখিয়েছেন বলে মনে হয়। ঘোড়াটা নিজে থেকে চঞ্চল হয়ে ওঠার পর তার দৌড়ঝাঁপ নাচন-কোঁদন দেখিয়ে ইংকা প্রধানদের আর বিশেষ করে স্বয়ং আতাহুয়ালপাকে একটু ভড়কে চমকে দেওয়ার মতলব বোধহয় দে সটোর মাথায় আসে। আতাহুয়ালপার নির্বিকার তাচ্ছিল্যের মুখোশটা সরে কিনা দেখবার দুষ্টুবুদ্ধিও তার সঙ্গে ছিল।
চমকে দেওয়ার চেষ্টাটা কিন্তু অমন মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে দে সটোও ভাবেননি বোধহয়। আতাহুয়ালপার একেবারে গায়ের কাছে তুফানের মতো ঘোড়াটাকে হঠাৎ রুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দে সটো তাঁর বাহাদুরকা খেল শেষ করেছেন।
তাঁর সওয়ারগিরির আশ্চর্য কেরামতিতে ঘোড়াটা আতাহুয়ালপার প্রায় মাথার ওপর দু পা তুলে দাঁড়িয়ে উঠে আবার সামলে নিয়ে মাটির ওপর পা নামিয়ে স্থির হয়েছে সত্যি, কিন্তু তেজি ছুটকরানো ঘোড়াটার মুখের কিছুটা ফেনা ইংকা নরেশের পোশাকের ওপর গিয়ে পড়েছে।
ভড়কৈ দিতে গিয়ে এসপানিওল সেনাদল সমেত হার্নারেমন্ডোর সঙ্গে দে সটো নিজেই ভড়কে গিয়ে প্রমাদ গুনেছেন। কী করবেন এবার আতাহুয়ালপা?
কিন্তু কিছুই তিনি করেননি। তাঁর পাথরে খোদাই মূর্তির মতো কঠিন মুখে সমস্ত বাহাদুরির খেলার সময়ে তো নয়ই, শেষ মুহূর্তের এই মাত্রাছাড়া উপদ্রবেও এতটুকু ভাবান্তর দেখা যায়নি। গায়ের ওপর ঘোড়া এসে পড়বার উপক্রম হওয়ায় ইংকা প্রধানদের কাউকে কাউকে নিজের অনিচ্ছাতেই একটু শিউরে সরে দাঁড়াতে দেখা গেছে, কিন্তু আতাহুয়ালপার চোখের পাতাও একটু কাঁপেনি।
হ্যাঁ, পোশাকে ঘোড়ার মুখের ফেনা ছিটিয়ে পড়ার পর আতাহুয়ালপা কিছুই করেননি বলাটা ঠিক নয়। কিছু তিনি সত্যিই করেছেন। যে বেয়াদবিতে তাঁর খেপে ওঠবার কথা তা যেন লক্ষই না করে তিনি অতিথিদের খাদ্যে পানীয়ে আপ্যায়িত করবার আদেশ দিয়েছেন।
এসপানিওলরা ঘোড়া থেকে নামবার অনিচ্ছার দরুন খাবার জিনিস প্রত্যাখ্যান করেছে, কিন্তু ইংকা রাজপরিবারের আয়তাক্ষী সুন্দরীরা বড় বড় সব সোনার পাত্রে চিচা নামের যে দেশোয়ালি সুরা পরিবেশন করেছে তার প্রতি বিমুখতা দেখায়নি।
আতাহুয়ালপাকে বিদায় অভিবাদন জানিয়ে ফিরে আসবার সময় সে সুরার নেশাও দে সটো আর তাঁর সঙ্গীদের চাঙ্গা করতে পারেনি। সবাই বেশ একটু গুম হয়েই ফিরেছেন।
পিজারোকে বিবরণ শোনাবার সময় তাঁদের শঙ্কিত উদ্বেগের কারণগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আতাহুয়ালপা দে সটোর বেয়াদবিতে খেপে উঠে কিছু করলে যা মনে হত তার চেয়ে তাঁর অবিচলিত নির্বিকার ভাবটা ভয়াবহ লেগেছে আরও বেশি।
আর একটি সাংঘাতিক খবর ইতিমধ্যে পিজারোর বর্তমান আস্তানায় পৌঁছে গেছে।
খবর পাওয়া গেছে যে দে সটোর ঘোড়ায় খেলায় যে দু-একজন ইংকা বীর আতঙ্ক গোপন করতে পারেনি, আতাহুয়ালপা সরাসরি তাদের প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।
এই খবরেই আতাহুয়ালপার সমস্ত ব্যবহার আর কথার ওপরকার মোলায়েম খোলসটা সরে গিয়ে ভেতরকার ভয়ংকর চেহারাটা যেন বেরিয়ে পড়েছে।
আতাহুয়ালপা পিজারোর বাহিনীর সঙ্গে ওপর থেকে দেখলে অত্যন্ত ভাল ব্যবহারই করেছেন এ পর্যন্ত। কাকসামালকা শহরে তাদের রাজসমাদরে থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাদের বেয়াড়া বেয়াদবিতে ভুক্ষেপ পর্যন্ত করেননি। নিজে থেকে ইংকা প্রধানদের নিয়ে দর্শন দিতে আসবেন বলেছেন।
শুনতে যেমন চমৎকার ব্যাপারগুলো তেমন সরল সোজা কি?
রাজ-সমাদরে পিজারোর লোকজনদের রাখবার ব্যবস্থা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে ব্যবস্থা তাদের জবাই করবারই ভূমিকা নয়, কে বলবে?
প্রতিদ্বন্দ্বী ভাই হুয়াসকার-এর হিতৈষী ইংকা প্রধানদেরও ডাকিয়ে এনে আতাহুয়ালপা এমনই করে সসম্মানে কুজকো শহরে রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তারপর শেষ করে দিয়েছিলেন সকলকে।
দে সটোর বেয়াদবিতে সুক্ষেপ না করে যেন তা মাপ করেছেন বলেই মনে হয়েছে।
কিন্তু ভয় যারা পেয়েছিল সে সব ইংকা সভাসদদের প্রাণদণ্ড দিয়েছেন কেন?
নিজে থেকে পিজারোর সঙ্গে দেখা করতে আসবেন বলেছেন ইংকা প্রধানদের নিয়ে।
কিন্তু এ কি শুধু সম্রাটোচিত উদারতায় পিজারোকে অনুগ্রহ করতে আসা? ইংকা প্রধানদের নিয়ে সদলবলে আসার আশ্বাসের মধ্যে কোনও ভয়ংকর গূঢ় অভিসন্ধি। লুকিয়ে আছে কি?
