আতাহুয়ালপার চাক্ষুষ যে রূপ দেখা গেছে তার সঙ্গে সে ধারণার একেবারে মিল নেই।
আতাহুয়ালপার মতো এরকম সত্যিকার সম্রাটোচিত চেহারাই এর আগে এদেশে কোথাও পিজারো বা তার সঙ্গীদের কারও চোখে পড়েনি।
দে সটো আর হার্নারেমন্ডো পিজারোর এই ইংকা নরেশের সামনে আপনা থেকেই নিজেদের কেমন ছোট মনে হয়েছে। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য দেখাবার চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁদের ব্যবহারে আর কথায় সন্ত্রম ফুটে উঠেছে আপনা থেকেই।
সত্যি কথা বলতে গেলে দে সটো বা হার্নারেমন্ডো পিজারোর মনে নিজেদের সাদা চামড়া থেকে শুরু করে লম্বা চওড়া চেহারা আর গুলিবারুদ বন্দুক আর ঘোড়া নিয়ে শক্তি সামর্থ্যের একটু গুমর ছিলই। তাঁরা ভেবেছিলেন আর কিছু না হোক এদেশের পক্ষে সম্পূর্ণ অজানা এসব জাঁকজমক দিয়ে ইংকা নরেশকে একটু হকচকিয়ে দিতে অন্তত পারবেন।
তার বদলে দে সটো আর হার্নারেমন্ডোকেই ভেতরে ভেতরে বেশ একটু বিচলিত হতে হয়েছে।
বিচলিত হবার কারণ ইংকা নরেশের রাজসমারোহ কিন্তু নয়। কাক্সামালকা নগরের বাইরে আতাহুয়ালপার সেই সময়ের শিবির এমন কিছু জমকালো নয়। বেশ বড় গোছের খোলা একটা চত্বর, তার চারিধারে ধাপে ধাপে বসবার আসনের ব্যবস্থা। চত্বরের মাঝখানে একটি জলের কুণ্ড। সুড়ঙ্গ নালি দিয়ে তাতে ঠাণ্ডা আর গরম জলের স্রোত আসে।
বিরাট এই চত্বরে বড় ঘরোয়ানা ইংকা নারী-পুরুষ সব জড়ো হয়েছে আতাহুয়ালপার অনুচর হিসাবে পরিচর্যার জন্যে।
আতাহুয়ালপা কুণ্ডের কাছে একটি নিচু আসনে বসে আছেন। তাঁর পোশাক-আশাক সভাসদদের তুলনায় বরং সাদাসিধে। শুধু তাঁর মাথায় কপাল পর্যন্ত ঢাকা ইংকা রাজশক্তির প্রতীকচিহ্ন রক্তের মতো লাল বোলা।
মাথায় এই বোলা না থাকলেও তাঁকে আলাদা করে চেনা যেত এমনই তাঁর বিরল বৈশিষ্ট্য। দে সটো আর হার্নারেমন্ডো পিজারো দু-একজন সঙ্গীকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়েই ইংকা আতাহুয়ালপার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য দেখাবার জন্যে ঘোড়া থেকে কেউই নামেননি।
ব্যবহারের এই ঔদ্ধত্যটুকু কিন্তু গলার স্বরের স্বতঃস্ফুর্ত সম্রমে কাটাকাটি হয়ে গেছে।
দে সটো একটু সবিস্তারেই এ রাজ্যে তাঁদের আসার উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন। জানিয়েছেন যে সাগরপারের এক মহান রাজ্যের সম্রাটের প্রতিনিধি হিসাবে তাঁরা এখানে এসেছেন। ইংকা নরেশের নানা বীরত্বের কীর্তিকাহিনী শুনে তাঁরা মুগ্ধ। তাঁরা ইংকা নরেশের হয়ে লড়তে চান আর পৃথিবীতে একমাত্র যা সত্য ধর্ম তার বাণী তাঁকে শোনাতে চান।
আতাহুয়ালপা কী বলেছেন এ ভাষণের জবাবে? কিছুই নয়। বুঝতে পারেননি বলেই কি তিনি নীরব থেকেছেন?
তা কেন হবে। দে সটোর সব বক্তব্য দোভাষী ফেলিপিলিও তো ভালভাবে। অনুবাদ করে শুনিয়েছে। পিজারোর দলে যে ক-জন নামকরা দোভাষী ছিল ফেলিপিলিও তাঁদের মধ্যে এক রকম প্রধান। টমবেজ শহরে তাঁর বাড়ি। সেখান থেকে তাঁকে দু-দুটো সাগর পার করে কাস্তিল-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শুধু ওস্তাদ দোভাষী বানাবার জন্যেই। ফেলিপিলিও-র অনুবাদে কোনও ত্রুটি নিশ্চয়ই তা হলে ছিল না।
আতাহুয়ালপা সুতরাং সব শুনে-বুঝেও কোনও জবাব দেননি! শুধু যে তিনি নীরব। থেকেছেন তা নয়, মুখের চেহারা যা করে রেখেছেন তাতে মনে হয়েছে এ সব কথা তাঁর কাছে কানে দেবার উপযুক্তও নয়।
দে সটো আর হার্নারেমন্ডো বেশ ফাঁপরে যে পড়েছেন তা বলাই বাহুল্য।
ইংকা নরেশের কঠিন নির্বিকার মুখ দেখে কী তাঁরা বুঝবেন? আতাহুয়ালপা সন্তুষ্ট, অসন্তুষ্ট? তাঁদের ওপর বিরূপ, না সদয়?
আতাহুয়ালপার বদলে তাঁর এক সভাসদ সংক্ষেপে অবশ্য দুটি শব্দ উচ্চারণ করেছেন, ঠিক আছে।
কিন্তু তাতে কী বোঝা যায়? ও দুটি কথার মানে তো দু-দিকেই লাগানো যেতে পারে।
বেশ একটু ব্যাকুল অস্বস্তির সঙ্গে পিজায়োর ভাই হার্নারেমন্ডো এবার আতাহুয়ালপাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছেন, নিজের মুখে তাঁদের কিছু বলবার জন্যে।
বেশ উদ্বিগ্ন ক-টা মুহূর্ত কেটেছে। আতাহুয়ালপা নিজ-মুখে কিছু কি বলবেন? সে অনুগ্রহ যদি করেন তা হলেও কী হবে তাঁর ভাষণ?
দে সটো আর হার্নারেমন্ডো শুধু নন ইংকা প্রধানরাও বেশ একটু শঙ্কা-সংশয় নিয়ে আতাহুয়ালপার মুখের দিকে চেয়ে থেকেছেন।
আতাহুয়ালপার নির্বিকার ভাবলেশহীন মুখে এই প্রথম ঈষৎ বাঁকা হাসির আভাস দেখা গেছে। তারপর এসপানিওলদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তিনি ধীর গম্ভীর স্বরে বলেছেন, তোমাদের সেনাপতিকে বললা গিয়ে যাও যে আমি এক উপবাস ব্রত পালন করছি। এ ব্রত কাল সমাপ্ত হবে। তারপর আমার রাজ্যপ্রধানদের নিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করব। নগরের সমস্ত রাজ-অতিথিশালা তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের জন্যে খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। সেইখানেই তিনি যেন তাঁর অনুচরদের নিয়ে অপেক্ষা করেন।
প্রথমকার কঠিন নীরবতার পর ইংকা নরেশের এই ভাষণটুকুতেই কি পিজারো আর তাঁর সঙ্গীরা অতখানি উদ্বেগের কারণ খুঁজে পেয়েছেন?
না, তা ঠিক নয়! ইংকা নরেশ আতাহুয়ালপার চেহারা, আচরণ ও এই ভাষণ, সব কিছুর ভেতর একটা ভিন্ন অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ফুটিয়ে তুলেছে পরের একটি ঘটনা আর তার প্রতিক্রিয়া।
ঘটনাটা ঘটেছে আতাহুয়ালপা তাঁর বক্তব্য শেষ করবার পরই।
এসপানিওলরা সবাই ঘোড়ায় চড়েই রাজদর্শনে এসেছিল। আতাহুয়ালপাকে সসম্ভ্রমে অভিবাদন জানালেও ঘোড়া থেকে কেউ মাটিতে নামেননি।
