চোখে পড়েছে তাতেই বুক তাঁদের তখন কেঁপে উঠেছে নিশ্চয়।
শহর ঘিরে যে সব পাহাড়ের দেওয়াল উঠে গেছে তার কোলে কোলে ক্রোশের পর ক্রোশ মুঠো মুঠো করে ছড়ানো সাদা তুষারের মতো ওগুলো কী?
ওগুলো যে কী তা বুঝতে দেরি হয়নি। ওগুলো আর কিছু নয়, ইংকা আতাহুয়ালপার বিরাট সৈন্যবাহিনীর অগণন সব তুষারশুভ্র শিবির।
শিবিরই যেখানে অমন অগুনতি সেখানে সৈন্য যে কত তা বুঝে পিজারোর লোকেদের বুক যদি বেশ দমে গিয়ে থাকে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। উপায় থাকলে তাদের ক-জন ওই উত্রাই-এর পথে নীচের উপত্যকায় তখন নামত তা বলা কঠিন। ইংকা আতাহুয়ালপার ওই সৈন্যসমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া মানে নিশ্চিত নিষ্ফল আত্মহত্যা বুঝে অনেকের মনেই ফিরে যাওয়ার আকুলতা যে জেগেছিল, কনকুইস্তেদর মানে অভিযাত্রীদের একজনই তা স্বীকার করে গেছেন তাঁর লেখায়।
ভয় যতই হোক—তিনি লিখে গেছেন—ফিরে যাওয়ার তখন আর সময় নেই। এতটুকু দ্বিধা দুর্বলতা দেখালেও সর্বনাশ। সঙ্গে ওদেশি যেসব লোকজন আছে তারাই তাহলে আমাদের ওপর প্রথমে চড়াও হবে। সুতরাং যথাসাধ্য মনের ভাব মনেই চেপে আমরা উত্রাই-এর পথে নামতে শুরু করলাম।
১৬. মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা
পনেরোশো বত্রিশের পনেরোই নভেম্বর।
মাত্র দুবছর আগে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ভারতবিজেতা বাবর আটচল্লিশ বছর বয়সে আগ্রা শহরে মারা গেছেন। তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী হুমায়ুন আফগান সর্দার শের শাহকে শায়েস্তা করবার উদ্দেশ্যে চুণার দুর্গ অবরোধ করে তাঁকে সাময়িক বশ্যতা স্বীকার করিয়েছেন মাত্র এক বছর আগে।
ইউরোপে তিন বছর আগে তুর্কিরা ভিয়েনা দখল করেছে। ভয়ংকর আইভান বলে সে যুগে যিনি পরিচিত সেই চতুর্থ আইভানের রাশিয়ার জারের সিংহাসনে বসতে আর এক বছর মাত্র বাকি।
পোর্তুগিজরা ইউরোপের প্রতিনিধি হিসেবে মাত্র আঠারো বছর আগে চিনে পা দিয়েছে, কিন্তু নিজেদের জুলুম জবরদস্তির দোষে কোথাও স্থায়ীভাবে বাস করবার
সুযোগ পায়নি। কোথাও তাদের মেরে শেষ করা হয়েছে আর কোথাও থেকে হয়েছে। বিতাড়িত। কান্টনের দক্ষিণে ছোট্ট দ্বীপ সাংচুয়ান থেকে তারা কোনওরকমে তখন ব্যবসা চালাচ্ছে।
পৃথিবীর ইতিহাসের নানা দিক দিয়ে স্মরণীয় এই সময়ে ওই তারিখে সুদূর সাগরপারের এক দেশ থেকে মুষ্টিমেয় ক-টি সৈন্য নিয়ে পিজারো অজানা রহস্যময় পেরু সাম্রাজ্যের অধীশ্বর আতাহুয়ালপার সম্পূর্ণ নিজস্ব পাহাড়ঘেরা সুরক্ষিত দুর্গনগরে নামবার জন্যে পা বাড়ালেন।
কী আছে ভবিষ্যতের গর্ভে তার কোনও আভাস কি পিজারো পেয়েছিলেন?
নইলে তিনি সেদিন যা করেছিলেন তাকে তো উন্মত্ত আত্মঘাতী বাতুলতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। পাহাড়ের ঢালু পথে যখন পিজারো তাঁর দলবল নিয়ে নীচের শহরে নামছেন তখন বিকেল হয়ে এসেছে।
সারাদিন আকাশ পরিষ্কার ছিল। হঠাৎ সেই সময় যেন নিয়তির ইঙ্গিত নিয়ে ঝড় উঠল। ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি। শুধু জলের ফোঁটা নয়, শিলাবৃষ্টিও। সেই সঙ্গে আর হাড় কাঁপানো শীত যা ভয়ের কাঁপুনি লুকোবার সুযোগ দিয়েছে কাউকে কাউকে।
তিনটি দলে ভাগ হয়ে পিজারো নামছিলেন। শহরে নেমে তিনি নিজের দল নিয়ে তাঁর বিশ্রামের জন্যে নির্দিষ্ট পান্থনিবাসে গেলেও তৎক্ষণাৎ দে সটোকে পনেরোজন সওয়ার সমেত ইংকা আতাহুয়ালপার কাছে সেলাম দিতে পাঠিয়েছেন। শুধু দে সটোর দলকে পাঠিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। নিজের ভাই হার্নারেমন্ডোকেও তার পিছনে বিশজন সওয়ার নিয়ে সহায় স্বরূপ যেতে বলেছেন।
দে সটোর পনেরো আর হার্নারেমন্ডোর কুড়ি এই মোট পঁয়ত্রিশ জন তো সওয়ার। সত্যিই যদি বিপদ কিছু ঘটে, কে কাকে কী সাহায্য করবে।
বিপদ কিন্তু কিছু ঘটেনি। পিজারোর প্রতিনিধিরা নিরাপদে বহাল তবিয়তেই ফিরে এসেছে। ইংকা নরেশ তাঁর শিবির ফেলেছেন নগরের বাইরে পাহাড়ের কোলের মুক্ত প্রান্তরে গরম জলের স্বাভাবিক ফোয়ারাগুলির কাছে। সেখান থেকে ফিরে দে সটো আর হার্নারেমন্ডো ইংকা আতাহুয়ালপার চরিত্র চেহারা ও ব্যবহারের বিবরণ দিয়ে যে খবর জানিয়েছে তা শুনে পিজারো সেই রাত্রেই তাঁর বাহিনীর প্রধানদের এক গোপন মন্ত্রণাসভা ডেকেছেন।
সেই দিনই বিকেলে তো সবে পিজারো কামালকা শহরে পা দিয়েছেন ইংকা নরেশের অতিথি হয়ে। শহরে পৌঁছোবার পর কর্তব্য হিসেবে রাজদর্শনে যাদের পাঠিয়েছিলেন তারা ফিরে এসে কী এমন খবর দিলে যে পিজারো সেই রাত্রেই গোপনে মন্ত্রণাসভা ডাকবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
ইংকা আতাহুয়ালপা কি রাজদর্শনে যারা গিয়েছিল তাদের ওপর জুলুম জবরদস্তি কিছু করেছেন, কিংবা অপমান-টপমান?
না, মোটেই নয়।
তবে কি অগ্রাহ্য, অবজ্ঞা?
না, তা-ও নয়। পিজারো তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি দে সটোকে পাঠিয়েছিলেন ইংকা নরেশকে কুর্নিশ করে আসতে আর সেই সঙ্গে ভাই হার্নারেমন্ডোকেও ভরসা দেওয়ার জন্যে সঙ্গে থাকতে বলেছিলেন।
ফিরে এসে তাঁরা যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে বিচলিত হবার কারণ অন্য।
এই নতুন মহাদেশে এ পর্যন্ত এসপানিওলরা অনেক কিছু দেখেছে, বড় ছোট অনেক মানুষের সংস্রবে এসেছে। তুষার ঢাকা অভ্রভেদী পাহাড়ের বুকে সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ যত রহস্যময়ই হোক, সত্য-মিথ্যা নানা বর্ণনা শুনে তার রাজ্যেশ্বর ইংকা আতাহুয়ালপা সম্বন্ধে একটা মোটামুটি ধারণা তাই পিজারো আর তাঁর দলবলের মনে গড়ে উঠেছিল।
