এ বিবরণ আর কারও কাছে নয়, ইংকা বংশেরই উত্তরপুরুষ স্বয়ং সার্সিলাসো দে লা ভেগা-র কাছে পাওয়া বলে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার নয়।
এসব ঘটনার মাত্র কিছুদিন বাদে পেরুতে পৌঁছে পিজারোর, যত বিকৃত জটিলভাবেই হোক, কোনও বিবরণ শুনতে নিশ্চয় বাকি থাকেনি। ভাই-এ ভাই-এ এই ঘরোয়া লড়াই আর দু-পক্ষের দলাদলির খবরই তাঁকে উৎসাহিত করেছে। সাম্রাজ্য বিরাট হতে পারে, কিন্তু তার মাঝখানে এই সর্বনাশা ফাটল যখন ধরেছে। তখন ধ্বংস একেবারে অসম্ভব কিছু হয়তো নয়।
তাঁর সেনাদল নিয়ে পিজারো তখন থারান বলে এক পাহাড়ি শহরে আস্তানা পেতেছেন। তাঁর আস্তানা ইংকা রাজপুরুষদের ব্যবহারের জন্যে নির্দিষ্ট একটি চমৎকার সরাইখানা। সে শহরের কুরাকা মানে মোড়ল পিজারো ও তাঁর লোকজনের যথাসম্ভব পরিচর্যাই করেছে।
কিন্তু সে আদর আপ্যায়নে পিজারোর উদ্বেগ অশান্তি আরও বেড়েছে।
সমুদ্রের তীরভূমি থেকে তুষার ঢাকা পাহাড়ে অনেক দূর পর্যন্ত তো উঠে এসেছেন, এখনও ইংকা আতাহুয়ালপার কোনও সাড়াশব্দ নেই কেন?
এই পাহাড়ি চড়াই উত্রাই-এর গোলকধাঁধার রাজ্যে পিজারো আর তাঁর দলবলের জন্যে নতুন ধরনের কোনও ফাঁদ পাতা হচ্ছে কি?
থারান ছেড়ে নিজে আর না অগ্রসর হয়ে পিজারো তাঁর বিশ্বস্ত বুদ্ধিমান সহকারী হার্নারেমন্ডো দে সটোকে কয়েকজন অনুচর সঙ্গে নিয়ে সামনের পথে কিছুদূর পর্যন্ত টহল দিয়ে আসতে বলেছেন। টহল দিতে পাঠাবার উদ্দেশ্য কাক্সাস বলে একটি জায়গার খবর নেওয়া। পিজারো কয়েকজনের মুখে শুনেছেন যে কাক্সাস-এ ইংকা সেনাদের একটি বড় গুপ্ত ঘাঁটি আছে। এ সব ঘাঁটি কী ধরনের, সেখানকার অস্ত্রশস্ত্র ও লোকবল কী রকম তার একটু আভাস না পেলে অন্ধের মতো সদলবলে এগিয়ে যাওয়া অত্যন্ত আহাম্মকি হবে।
কিন্তু দে সটো সেই যে গেছে তার আর ফেরবার নাম নেই। একদিন দু-দিন করে পুরো হপ্তাই কেটে গেছে, দে সটোর কোনও সাড়া-শব্দ মেলেনি।
এই পাহাড়ি গোলকধাঁধায় সে তার দলবল সমেত কোথাও গুম হয়ে গেল নাকি! পিজারো যখন রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে উঠে সদলে এগোবেননা-পেছোবেন মনে মনে তোলাপাড়া করছেন তখন দে সটো হঠাৎ আশাতীতভাবে ফিরে এসেছে। ফিরে এসেছে একা নয়, সঙ্গে তার স্বয়ং ইংকা আতাহুয়ালপারই এক রাজদূত।
রাজদূত যে পেরুর বড় ঘরোয়ানা তা তাঁর চেহারা পোশাকেই বোঝা যায়। তাঁর সঙ্গে অনুচরই এসেছে বেশ কয়েকজন। কাক্সাস দুর্গ-শহরে দে সটোর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ইংকা রাজ্যেশ্বরের বার্তা আর উপহার তিনি পিজারোর কাছে পৌঁছে দিতে এসেছেন।
উপহার যা তিনি এনেছেন তা বেশ দামি ও অদ্ভুত। এনেছেন আলপাকা আর ভিকুয়ানার পশমে বোনা সোনা রুপোর ভরির কাজ করা পোশাক, খাবার জন্যে নয়, গুঁড়িয়ে সুগন্ধ হিসেবে ব্যবহার করবার জন্যে মশলা মাখা শুখানো বিচিত্র একতাল হাঁসের মাংস আর দুটি পাথরের তৈরি ফোয়ারা। এই শেষের উপহার দুটিই একটু উদ্বিগ্ন করে তোলার মতো খেলনা ফোয়ারা দুটি দুর্গের আকারে তৈরি। এই দুর্গাকার খেলনা উপহার হিসেবে পাঠাবার মধ্যে কোনও গূঢ় ইঙ্গিত আছে কি না পিজারোকে ভাবতে হবে।
ইংকার রাজদূত যে শুধু পেরু সম্রাটের আমন্ত্রণবার্তা নিয়ে সৌজন্য দেখাতে আসেননি, এসপানিওলদের খোঁজখবর নিয়ে তাদের ক্ষমতার বহর জেনে যাওয়াই যে তাঁর আসল উদ্দেশ্য পিজায়োর তা বুঝতে দেরি হয়নি। মনের কথা মনেই চেপে রেখে বাইরে পিজারো যথাসাধ্য সমাদরই করেছেন রাজদূত আর তাঁর অনুচরদের। রাজদূতকে বিদায় দেওয়ার সময় উপহারের বদলি উপহার দিতেও ভোলেননি। সেই সঙ্গে সবিনয়ে জানিয়েছেন যে সুদূর অকূল সমুদ্রপারের এক দেশের মহামহিম অধীশ্বরের প্রজা হিসেবে এই অজানা দেশে এসে ইংকা আতাহুয়ালপার আশ্চর্য বীরত্বের বহু কাহিনী তাঁরা শুনেছেন। তাই শুনে আতাহুয়ালপাকে শত্রু দমনে সাহায্য করতে পিজারো সদলবলে উৎসুক। ইংকা রাজ্যেশ্বরের আমন্ত্রণ পাবার সৌভাগ্য যখন তাঁদের হয়েছে তখন তাঁরা রাজসন্দর্শনে যেতে আর একমুহূর্ত বিলম্ব করবেন না।
তা, বিলম্ব করবেন না ঠিকই, কিন্তু রাজসন্দর্শনে যাবেন কোথায়? ইংকা রাজ্যেশ্বরের দূত তার হদিস তো দিয়ে যায়নি।
শেষ পর্যন্ত সে হদিস পাওয়া গেছে। জানা গেছে যে, ইংকা রাজ্যেশ্বর বিরাট বাহিনী নিয়ে কাক্সামালকায় বিশ্রাম করছেন। হ্যাঁ, সেই স্বাভাবিক উষ্ণ প্রস্রবণের শহর কামালকা, তখনকার ইংকা সম্রাটের মতো আজও যেখানে ধনী-মানীরা স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে যায়।
অনেক দ্বিধা সংশয় দমন করে অনেক বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে পিজারোর বাহিনী একদিন সেই কাক্সামালকার নগর সীমান্তেই উপস্থিত হয়েছে। কামালকায় পৌঁছোতে পাহাড়ের ওপর থেকে উত্রাই-এর পথে নামতে হয়। নামতে নামতে যে দৃশ্য চোখে পড়ে তা অপূর্ব। চারিদিকে অভ্রভেদী পর্বত প্রাচীরে ঘেরা নাতিপ্রশস্ত একটি ডিম্বাকৃতি উপত্যকা। লম্বায় আন্দাজ সাড়ে চার ক্রোশ আর চওড়ায় তিন। এ উপত্যকার মাঝখান দিয়ে বেশ বড় ও চওড়া একটি নদী বয়ে গেছে। এই মনোহর উপত্যকার মধ্যে পরিচ্ছন্ন যেন দুধে ধোওয়া সব বাড়ি দিয়ে সাজানো নগর কামালকা।
পিজারো তাঁর বাহিনীর সঙ্গে পাহাড় ঘেরা উপত্যকার সৌন্দর্য আর নীল আকাশে পতাকার মতো উষ্ণ প্রস্রবণের সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী তোলা শহরের শোভা দেখে মুগ্ধ হওয়ার অবসর কিন্তু পাননি। নীচের শহরের দিকে চেয়ে আর একটি যে দৃশ্য তাঁদের
