হুয়াইনা কাপাকের মৃত্যুর পর প্রথম পাঁচ বছর একরকম নিঝঞাটেই কেটেছে। হুয়াসকার দক্ষিণে আর আতাহুয়ালপা উত্তরে নিজের নিজের অংশে রাজত্ব করেছেন পরস্পরের সম্মান রেখে। কিন্তু বিরোধের কারণ দেখা দিতে দেরি হয়নি।
হুয়াসকার আতাহুয়ালপার চেয়ে বয়সে বছর-পাঁচেক বড়। বিধিসম্মতভাবে একমাত্র ন্যায্য উত্তরাধিকারী হলেও প্রকৃতিটা শান্তশিষ্ট হওয়ার দরুন পিতার পক্ষপাতিত্ব মেনে নিয়ে তিনি হয়তো নির্বিরোধে নিজের অংশটুকুর ওপরে রাজত্ব করেই সুখী থাকতে পারতেন, কিন্তু আতাহুয়ালপার সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের জন্যেই তা সম্ভব হয়নি।
বাইরে থেকে দেখলে বিরোধের প্রথম প্রত্যক্ষ সূত্রপাত হুয়াসকারই করেছেন, কিন্তু করেছেন অনেক কিছুতেই ধৈর্য হারিয়ে।
আতাহুয়ালপার প্রকৃতি হুয়াসকার-এর ঠিক উলটো। সুখে স্বচ্ছন্দে শান্তিতে রাজত্ব করবার মানুষ তিনি নন। রাজ্য পেয়েই তিনি তা বাড়াবার জন্যে নানাদিকে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে হানা দিতে শুরু করেছেন। প্রথমে হুয়াসকার-এর এলাকায় হাত না বাড়ালেও অন্যদিকে তাঁর দুর্দান্ত সব অভিযানের সাফল্যের খবর হুয়াসকারকে ভাবিত করে তুলেছে। রাজসভায় তাঁকে উসকে দেওয়ার লোকের অভাব হয়নি। তারা বুঝিয়েছে , গোড়াতেই বিষদাঁত না উপড়ে নিলে এ-সাপ বড় হয়ে এক দিন হুয়াসকারের রা ধানী কুজকোর ওপর ছোবল দেবে। আতাহুয়ালপার চালচলন। ভাবগতিক দের এ-সন্দেহ আরও জোরদার হয়েছে। শেষপর্যন্ত হুয়াসকার আতাহুয়ালপার রাজধানী কুইটোতে দূত পাঠিয়েছেন।
এসপানিওন দের এ রাজ্যে পা দেওয়ার কিছুদিন মাত্র আগের ঘটনা। তবু পেরুর রাজতক্ত নিয়ে দুই ভাই-এর সংগ্রামের সঠিক বিবরণ কেউ সংগ্রহ করতে পারেনি। এক মত অনুসারে হুয়াসকার কুইটোতে দূত পাঠিয়ে আতাহুয়ালপাকে খুশিমতো নিজের রাজ্যের বাইরে চড়াও হতে মানা করেছিলেন আর তাঁর কাছে বশ্যতার প্রমাণস্বরূপ রাজত্ব চেয়েছিলেন। অন্য এক বিবরণে পাওয়া যায় যে, ঝগড়ার সূত্রপাত টুমেবাম্বা বলে এক প্রদেশ নিয়ে। আতাহুয়ালপার অধিকারে থাকলেও সেটি তাঁর প্রাপ্য বলে দাবি করেই নাকি হুয়াসকার দূত পাঠান।
কারণ যা-ই হোক, ভেতরে ভেতরে যা ধোঁয়াচ্ছিল সে-বিরোধের আগুন দাউ দাউ করে এবারে জ্বলে ওঠে। আতাহুয়ালপা প্রথম দিকে এ লড়াই-এ সুবিধে করতে পারেননি। যে টুমেবাম্বা নিয়ে বিরোধ, সেই জায়গাতেই হুয়াসকার-এর কাছে যুদ্ধে হেরে গিয়ে তিনি বন্দী হন।
পেরুর ভাগ্য নির্ণয় অত সহজে কিন্তু হয়ে যায়নি। আতাহুয়ালপা বন্দিশিবির থেকে পালাবার সুযোগ পেয়েছেন আর তারপর নিজের রাজধানী কুইটোয় ফিরে গিয়ে দুই প্রবীণ বিচক্ষণ সেনাপতির সাহায্যে এমন এক বাহিনী গড়ে তুলেছেন যা প্রলয়ের ঢেউয়ের মতো দুর্বার গতিতে হুয়াসকার-এর রাজধানী কুজকো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আতাহুয়ালপার সহায় এই দুই প্রবীণ সেনাপতির একজন হলেন তাঁর বাবা হুয়াইনা কাপাকেরই বন্ধু কুইথকুইথ, আর দ্বিতীয়জন আতাহুয়ালপার মাতুল চালিকুচিমা।
আতাহুয়ালপার বাহিনী রাজধানী কুজকোর কাছের প্রান্তর কুইপেইপান-এ এসে পৌঁছে গেলেও হুয়াসকার ভয় পাননি। শত্রুকে একেবারে নিজের এলাকায় মুঠোর মধ্যে এনে ফেলাই নাকি ছিল তাঁর গোপন অভিসন্ধি। কোনও নিপুণ অভিজ্ঞ সেনাপতি নয়, এ রণ-কৌশলের পরামর্শ তাঁকে দিয়েছিলেন সূর্যমন্দিরের পুরোহিতরা।
এ-পরামর্শ হুয়াসকার-এর পক্ষে সর্বনাশা হয়ে দাঁড়ায়। কুইপেইপান-এর যুদ্ধে হুয়াসকারের সৈন্যবাহিনী বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, প্রাণ দিয়ে তারা লড়েছে, বিশুদ্ধ ইংকা রক্ত যাঁর মধ্যে বইছে, সাম্রাজ্যের সেই যথার্থ অধীশ্বরের জন্যে, কিন্তু আতাহুয়ালপার সৈনিকদের শিক্ষা ও শৃঙ্খলা অনেক উঁচু দরের। মাতুল চালিকুচিমা আর পিতৃবন্ধু কুইথকুইথ-এর রণকৌশলও অনেক শ্রেষ্ঠ। হুয়াসকারের বাহিনী মৃত্যুপণ করে যুঝেও তাদের সামনে দাঁড়াতে না পেরে ছারখার হয়ে গেছে।
হুয়াসকার হাজারখানেক সেনার ছোট একটি অনুগত দল নিয়ে পালাবার চেষ্টা করে সফল হতে পারেননি। তাঁকে বন্দি করে বিজয়ী বাহিনী কুজকো নগর দখল করেছে।
এর পরেরকার যে-ইতিহাস পাওয়া যায় তা হয়তো অতিরঞ্জিত, কিন্তু তার মধ্যে আতাহুয়ালপার নৃশংতার সব বিবরণ সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করা যায় না।
আতাহুয়ালপা প্রথমে বড়ভাইকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়েই নাকি বন্দি করে রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সে ব্যবস্থা হয়তো একটা ধূর্ত রাজনীতির চাল মাত্র। হুয়াসকারের হিতৈষী অন্য অভিজাত ইংকা-প্রধানরা তাতে বেশ কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিলেন, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। তা না হলে সমস্ত দেশের দূরদূরান্ত থেকে কুজকো নগরে এসে সমবেত হতে তাঁরা রাজি হবেন কেন!
আতাহুয়ালপা তাঁদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন পেরু সাম্রাজ্য দুই ভাই-এর মধ্যে। ন্যায্যভাবে ভাগবাঁটোয়ারায় সাহায্য করবার জন্যে। এমন ভাগাভাগি তিনি চান ভবিষ্যতে যাতে বিরোধের কোনও জড় আর না থাকে।
বিশ্বাস করে যাঁরা কুজকো নগরে সেদিন জড়ো হয়েছিলেন তাঁদের কেউই আর নিজের ঘরে ফিরে যেতে পারেননি। আতাহুয়ালপার সৈন্যরা তাঁদের ঘেরাও করে প্রত্যেককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
শুধু এই ইংকা-প্রধানদেরই নয়, ইংকা রক্তে যাদের জন্ম ও এ-রক্ত ভবিষ্যতে যাদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, এমন বালক-বালিকা যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কাউকেই জীবিত থাকতে দেওয়া হয়নি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে সাম্রাজ্যের অধিকার দাবি করতে পারে এমন সব বংশধারা আতাহুয়ালপা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন।
