উপন্যাসের রং পালিশ তো বুঝলাম, বলেছিলেন ঘনশ্যাম দাস, কিন্তু–কী নিয়ে উপন্যাস? গল্প একটা আছে তো?
আছে না? কিঞ্চিৎ ক্ষুগ্নস্বরে বলেছিলেন হরিসাধনবাবু, ঐতিহাসিক উপন্যাসে যেমন থাকা উচিত ঠিক সেই গল্প আছে। খুন-জখম, মারামারি, কাটাকাটি, তার মধ্যে অকুতোভয় নায়ক, সুন্দরী সপ্রতিভ নায়িকা, ঠিক সময়মতো দৈবের আবির্ভাব, কবি-টবি বা যাত্রার বিবেক গোছের কাউকে মাঝে মাঝে আসরে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া, তারই সঙ্গে বেশ একটু চটচটে করে আদিরস, কিছু আমার গল্পে বাদ নেই।
তা গল্পটা কবেকার? জিজ্ঞাসা করেছিলেন শিবপদবাবু, আগ্রা শহরের ঠিক কোন সময় বাবদ!
ভারতসম্রাট আওরঙ্গজেব-এর বয়স যখন পঞ্চাশ, অর্থাৎ পঞ্চাশের জন্মদিনের কাছাকাছি সময়ে! বলেছিলেন হরিসাধনবাবু।
এইবার সেই পেটেন্ট নাসিকাধ্বনি শোনা গেছল।
সকলে সচকিত হয়ে ঘনশ্যাম দাসের দিকে চাওয়ার পর তিনি একটু চিন্তিতভাবে। বলেছিলেন, সময়টা ভালোই বেছেছেন, কিন্তু তার মান রাখতে পারবেন কি! আগ্রা আর সেই সঙ্গে সমস্ত মোগল সাম্রাজ্যের ভিত ওই সময়কার একটি তারিখেই প্রথম মোক্ষম নাড়া খেয়ে চিরকালের মতো আলগা হয়ে যায়। অবশ্য সেই তারিখটায় ওই আগ্রা শহরে একটি মানুষ যদি উপস্থিত না থাকতেন তাহলে ইতিহাস কোন পথে যেত কিছু বলা যেত না। হয়তো অন্যভাবেই সে ইতিহাস লেখা হত।
একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো একটা শব্দ করে ঘনশ্যাম দাস আবার বলেছিলেন, কিন্তু সেসব আর আপনারা জানবেন কোথা থেকে! বচনরাম দাসের নামই তো আপনারা শোনেননি বোধহয়।
না, শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না! শিবপদবাবু ভ্রু কুঞ্চিত করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বচনরাম দাস বলছেন? তিনি আপনারই কেউ হবেন নাকি? প্রপিতামহ বা তার ওপরে অতিবৃদ্ধ কেউ?
না, তস্য তস্য। তখনই বলেছিলেন ঘনশ্যাম দাস।
২.
তারপর আলোচনাটা যে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে আগস্ট তারিখটার তাৎপর্য বোঝার চেষ্টায় এসে থেমেছে, সে বিবরণ আগেই দেওয়া হয়েছে।
মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই ইতিহাসের অধ্যাপক শিবপদবাবু প্রথম আঁধারে আলোক দেখতে পেলেন।
১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে আগস্ট! তিনি কপাল কুঞ্চিত করে বললেন, সেদিন—সেদিনই শিবাজি আগ্রা থেকে পালিয়েছিলেন না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই তারিখেই! সোৎসাহে শিবপদবাবুকে সমর্থন করলেন হরিসাধনবাবু, মনেই পড়ছিল না এতক্ষণ, অথচ খাতায় আমি টুকে রেখেছি তারিখটা, উপন্যাসে এক জায়গায় সুবিধামাফিক লাগিয়ে দেব বলে।
নেহাত এক জায়গায় লাগিয়ে দেবেন ভেবেছিলেন তারিখটা! ঘনশ্যাম দাসের তীক্ষ্ণ শ্লেষটা হরিসাধনবাবুর কানেও এবার বিধল।
কেমন একটু থতমত খেয়ে বললেন, কেন? লাগিয়ে দেওয়া অন্যায় হবে?
হ্যাঁ, হবে—দাসমশাই-এর স্বর যেন চাবুক—তলোয়ার দিয়ে কুটনো কোটা যেমন অন্যায়, যেমন অন্যায় কামান দিয়ে মশা মারা, চন্দনকাঠে চুলো ধরানো, মুক্তো দিয়ে খুঁটি খেলা। ভারতবর্ষের ইতিহাসের ওই তারিখ শুধু একবার উপন্যাসে উল্লেখ করেই ভুলে যাবেন? ১৮৫৭ সাল নিয়ে আপনি গল্প লিখবেন শুধু কলকাতার বাবুবিলাসের, ১৯৪২ সাল পার হয়ে যাবেন ইঙ্গ বঙ্গ পাড়ার কেচ্ছাই শধু গাইতে গাইতে?
সবাই নীরব হতভম্ব! হরিসাধনবাবু তো অপরাধটা ঠিক না বুঝেও লজ্জায় অধোবদন।
প্রথম সাহস সঞ্চয় করে শিবপদবাবুই বলেন, তারিখটা ভারতের ইতিহাসে ভোলবার নয় জানি, কিন্তু তারিখের সঙ্গে আপনার সেই পূর্বপুরুষ বচনরামের সম্বন্ধ কী? তিনি তখন আগ্রায় না থাকলে কি ও তারিখটা পাঁজি থেকে বাদ যেত, না শিবাজি আগ্রা থেকে পালাতেন না?
শিবপদবাবু কথার শেষে হুলটুকু প্রায় অজান্তেই না রেখে পারলেন না।
হুলের বদলে ছোবলই বুঝি আসে ঘনশ্যাম দাসের।
সবাই যখন সেই ভয়েই সন্ত্রস্ত তখন ঘনশ্যাম দাস অপ্রত্যাশিত উদারতায় সকলকে অবাক করে দিলেন।
হুলটুকু যেন টেরই না পেয়ে বললেন, না, ও তারিখ পাঁজি থেকে বাদ যেত না, আর শিবাজিও আগ্রা থেকে ঠিকই পালাতেন, কিন্তু এদিকে পশ্চিম ওদিকে দক্ষিণ দিকের খুফিয়ানবিশ আর হরকরাদের পাঠানোে উলটোপালটা গুপ্ত খবরে আগ্রার দরবারে আলমগিরের তাহলে মাথা খারাপ হবার জোগাড় হত না, ফৌজদার আলি কুলী আর তাঁর অনুচরেরা বার বার দিনদুপুরে ভূত দেখতেন না, সুরাটের বৈদ্যকুলতিলক দ্বিজোত্তম নাভা তাঁর সুরাটের প্রাসাদোপম ভবনে বারাণসীধামের, এক অত্যাশ্চর্য দৈবানুগ্রহের কাহিনী সকলকে নিত্য শোনাতেন না, আর সেদিনের টলমল আগ্রা শহরের ভিত্তিমূলেই দারুণ আঘাত পেয়ে মোগল সাম্রাজ্য অত তাড়াতাড়ি বোধহয় ধ্বংস পেত না। তা না পেলে কোথায় থাকত তুচ্ছ একটা সাগরপারের হিমেল দ্বীপের রাঙামুখ ক-টা সওদাগর! এই ভাগীরথীর কাদামাটির তীরে শেকড় গাঁথবার আগে কালাপানির জলেই কবে তাদের ইতিহাস তলিয়ে যেত!
এত কিছু সব হতে পারেনি শুধু ওই তারিখে আপনার পূর্বপুরুষ বচনরাম আগ্রায় হাজির ছিলেন বলে!
অকপট বিস্ময় বিমূঢ়তা ফুটে উঠেছে মেদভারে হস্তীর মতো যিনি বিপুল সেই ভবতারণবাবুর কণ্ঠে।
আসলে তিনি থাকায় হয়েছেটা কী? ইতিহাসের অধ্যাপক শিবপদবাবুর গলাটা এখনও বেসুরো। সম্ভ্রমের চেয়ে সন্দেহটাই যেন তার মধ্যে প্রধান।
হয়েছে এই যে, ঐতিহাসিকরা সেদিন পর্যন্ত হিমশিম খেয়েছেন আগ্রা থেকে পালিয়ে শিবাজির রাজগড় পৌঁছোবার বৃত্তান্ত নিয়ে। দাসমশাই অনুকম্পাভরে হেসে বললেন, ১৬৬৬-র ১২ই সেপ্টেম্বর, না তারও দু-মাস পরে ১১ই নভেম্বর, তিনি রাজগড়ে ফিরেছেন, তা-ই সঠিক বলা সম্ভব হয়নি। কৃষ্ণাজি অনন্ত সভাসদের শিব-ছত্রপতি-চেন-চরিত্র আর তারিখ-ই-শিবাজির বিবরণে গরমিল হয়েছে। আওরঙ্গাবাদ থেকে এক গুপ্তচর খুফিয়ানবিশ হিসাবে দিল্লিতে যে চিঠি পাঠিয়েছে তার খবরের সঙ্গে জেধে শাকাবলি-র বিবরণের সামঞ্জস্য হয়নি। সেই সঙ্গে অখণ্ডপ্রতাপ মোগলসাম্রাজ্যের প্রখর পাহারার শ্যেনদৃষ্টিকে উপেক্ষা করে খগরাজের কাছে মূষিকের ন্যায় অকিঞ্চিৎকর শিবাজি ভোঁসলের এই অবিশ্বাস্য পলায়নের যাত্রাপথকে নির্দেশ করে বিচিত্র নানা কাহিনীর ধারা জন্ম নিয়েছে।
