তুমি! তুমি সেই বেদে না? ভুকুটিভরে জিজ্ঞাসা করেন পিজারো।
হ্যাঁ, গোবেরনাদর, আমি সেই বেদে গানাদো—
গানাদোর আর তার কথাটা শেষ করবার সুযোগ মেলে না। পিজারো জ্বলন্ত স্বরে বলেন, তুমি না সান্তা মার্তায় জাহাজ ছেড়ে পালিয়েছিলে সেই বদমাশদের সঙ্গে। আবার তুমি ফিরে এসেছ?
তাতেই তো বুঝবেন, আদেলানতাদো, যে ইচ্ছে-সুখে পালাইনি। পালাতে তখন চাইনি বলেই আবার ফিরে এসেছি। ঘনরামের গলায় সম্ভম থাকলেও ভয়ের লেশ নেই।
পিজারো তাতে আরও গরম হয়ে ওঠেন—পালাতে চাওনি তবু পালিয়েছিলে? কার পরামর্শে? সেই কাপিন সানসেদো? পালের গোদা তাহলে সে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আদেলানতাদো।ঘনরাম শ্রদ্ধাভরে বলেন, তিনি ছাড়া দলপতি আর কে হবেন? তিনি আপনার অভিযানের ভালর জন্যেই অত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
প্রথমটা হতভম্ব হয়েই বোধহয় পিজারোর মুখ দিয়ে কোনও কথা বার হয় না। তারপর একবারে আগুন হয়ে তিনি বলেন, আমার অভিযানের ভালর জন্যেই তিনি ত্যাগ স্বীকার করেছেন! জাহাজ থেকে লোক ভাঙিয়ে পালানোর নাম আমার অভিযানের ভাল করা? আর তা-ই হল ত্যাগ স্বীকার?
আজ্ঞে হ্যাঁ, গোবেরনাদর। ঘনরাম অবিচলিত হয়ে জানান, তিনি আমাদের ক-জনকে নিয়ে দল বেঁধে না পালালে আপনার টনক নড়ত না। আপনি তাঁর হুঁশিয়ারি গ্রাহ্য না করে আর কিছুদিন সান্তা মার্তায় থাকলে আপনার সব লোক-লশকরই বিগড়ে যেত। আপনার বিপদ ঠেকাতেই ছোট একটা দল ভাঙিয়ে নিয়ে গিয়ে তিনি আপনাকে সজাগ করে দিয়েছেন। বেছে বেছে যাদের তিনি সঙ্গে নিয়ে গেছেন তারা আপনার বাহিনীর সবচেয়ে উঁচা বদমাশ। তাদের সরিয়ে নিয়ে গিয়ে আর সকলকে ছোঁয়াচ থেকে বাঁচানো একটা বড় কাজ। এ ছাড়া নিজে তিনি ত্যাগ স্বীকার করেছেন অনেক। প্রথমত যেচে মিথ্যে দুর্নাম মাথায় নিয়ে আপনার অভিশাপ কুড়িয়েছেন, তার ওপর বুড়ো খোঁড়া মানুষ হয়ে জলাজঙ্গল আর পাহাড় ডিঙিয়ে পালাতে গিয়ে দুর্ভোগ যা ভুগেছেন তার সীমা নেই। একেও ত্যাগ স্বীকার বলবেন না?
পিজারো খানিক চুপ করে থাকেন। কথাগুলো গুছিয়ে বুঝতে তাঁর বেশ একটু সময় লাগে বোধহয়। তারপর রাগটা কাটিয়ে উঠলেও একটু উত্তাপের সঙ্গে তিনি জিজ্ঞাসা করেন গম্ভীর হয়ে, তা অভিযানের খাতিরেই অত কষ্ট যিনি করলেন তিনি তোমার সঙ্গে ফিরলেন না কেন? তুমি তো একাই এসেছ দেখছি?
পিজারোর গলায় রাগটা না থাকলেও একটু জ্বালা তখনও আছে।
হ্যাঁ, আমি একাই এসেছি। ঘনরামের মুখে তাইতেই এবার একটু হাসির আভাস বোধহয় দেখা যায়, আসতে চাইলেও তাঁর মতো বুড়ো খোঁড়া মানুষকে ও-অভিযানে কেউ পাত্তা দিত কি! না, উপায় নেই বলেই পানামাতেই তাঁকে ফেলে আসতে হয়েছে।
ও। একটু বোধহয় অপ্রস্তুত হয়ে সেটা ঢাকবার জন্যেই পিজারো এবার তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞাসা করেন, কিন্তু তুমি করছ কী এ পুকুরের ধারে?
গানাদো বলে যে নিজের পরিচয় নিয়েছে সে যা করছিল তা সত্যিই অবাক করবার মতো।
তার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখেই পিজারো প্রথম নির্জন জলাশয়টার ধারে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন কৌতূহল ভরে। কাউকে লম্বা একটা আঁকশি গোছের কাঠি নিয়ে কোনও পুকুরের ধারে খামোকা জল ঠেঙাতে দেখলে বিস্ময় কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক।
সেখানে দাঁড়িয়ে পড়বার পর অপ্রত্যাশিতভাবে মানুষটাকে চিনতে পেরে তারই উত্তেজনায় অন্য প্রসঙ্গ তুললেও শেষ পর্যন্ত অদ্ভুত ব্যাপারটার মানে না জেনে চলে যাওয়া পিজারোর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
পিজারোর প্রশ্নে গানাদো একটু কি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে?
পিজারোর তা-ই অন্তত মনে হয়েছে।
কয়েক মুহূর্ত একটু ইতস্তত করে গানাদো যা বলেছে তাতে হাসবেন না আহাম্মক। বলে ধমক দেবেন, পিজারো ঠিক করতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত নিজের গাম্ভীর্য বাঁচিয়ে ধমকই তিনি দিয়েছেন।
আহাম্মক কোথাকার। জলে তোমার আংটি পড়েছে, আর তাই তুলতে তুমি আঁকশি দিয়ে জল ঠেঙাচ্ছে। লাঠি আছড়ালে জল সরে গিয়ে তোমার আংটি ফিরিয়ে দেবে? জলটা থিতোতে দিয়ে আস্তে আস্তে আঁকশিটা নামাও উজবুক,আংটি থাকলে বিনা হাঙ্গামায় পাবে। বুঝেছো?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আদেলানতাদো। গানাদোকে অত্যন্ত লজ্জিত মনে হয়েছে।
এ আহাম্মকটার কাছে আর সময় নষ্ট না করে পিজারো তাঁর নিজের সাময়িক শিবিরের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন।
কিন্তু খানিকদূর যেতেই হঠাৎ তাঁর মনে একটা খটকা লেগেছে। গানাদো একটা। বেদে মাত্র বটে, কিন্তু আংটি তুলতে জল ঠেঙাবার মতো আহাম্মক বলে তো তাকে মনে হয় না, দেবতা-টেবতার ভর হয়ে দৈববাণী গোছের যা সে পেয়েছে বলেছে, তার মধ্যে তার নিজস্ব বুদ্ধিশুদ্ধির কোনও প্রমাণ নেই বলে ধরলেও সাধারণ কাজকর্ম কথায়বার্তায় ওরকম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় তো সে দেয়নি এ পর্যন্ত।
কেমন একটু সন্দিগ্ধ হয়ে পিজারো আবার সেই জলাশয়টার ধারে ফিরে গিয়েছেন। ফিরে গিয়ে কিন্তু গানাদোকে আর দেখতে পাননি।
সে কি এর মধ্যেই তার আংটিটা তুলে ফেলে চলে গেছে। পুকুরের ধারে যখন সে নেই তখন তা-ই বুঝে নেওয়া উচিত। কিন্তু পিজারোর মনের খটকাটা যায়নি। আর সেই খটকা থেকেই হঠাৎ তিনি যেন নতুন এক হদিস পেয়েছেন তাঁর অভিযান সম্পর্কে।
তিনি নিজেও হাতে আঁকশি নিয়ে জল ঠেঙাচ্ছেন নাকি? ঠেঙালে জল সরে, না সমান জোরে পালটা ঘা দেয়? –
নতুন দেশের মানুষ সম্বন্ধে পিজারোর নীতি সেইদিন থেকেই বদলেছে। অন্তত তখনকার মতো।
