আর মারকাট লুঠতরাজ নয়। বন্ধুর মতো প্রীতির হাত বাড়িয়ে দিয়ে অজানা দেশের রহস্যময় দুর্গমতা জয় করতে এগিয়ে যাওয়া।
পিজারো পনেরোশো বত্রিশ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে টম্বেজ শহরে সামান্য কিছু অক্ষম রুগ্নকে রেখে ইংকা সাম্রাজ্যের হৃদয়স্থল খুঁজতে তুষার কিরীটি কার্দোলিয়েরাস-এর দিকে যাত্রা শুরু করেন।
পথে টমবেজ থেকে নব্বই মাইল দূরে সান মিগুয়েল নামে একটি নতুন শহরেরও পত্তন করে যান। এ শহর ছাড়বার আগে এ পর্যন্ত যা-কিছু সংগ্রহ হয়েছে সমস্ত সোনা-রুপো গলিয়ে তার পাঁচভাগের একভাগ যথারীতি সম্রাটের জন্য বরাদ্দ করে বাকি সব কিছু দেনা শোধের জন্যে তিনি পানামায় পাঠাবার ব্যবস্থা করেন। দেনা তো কম নয়, জাহাজ যার কাছে কেনা হয়েছে তার কাছে যেমন, তেমনই মালপত্র অস্ত্রশস্ত্র সব কিছুর জোগানদারদের কাছেই তখনও তাঁরা বাকি দামের জন্যে দেনদার। সে দেনার টাকা মেটাবার জন্যে তাঁর নোক-লশকরদের ভাগের সোনাদানাও তাঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিতে হয়েছে। তারা যে পিজারোর কথায় বিশ্বাস করে ভবিষ্যতের আশায় অত কষ্টের ও সাধের বখরা ছাড়তে রাজি হয়েছে এতেই অভিযাত্রীদের মধ্যে তখন নতুন উৎসাহের সঞ্চার হয়েছে বলে বোঝা যায়।
এ উৎসাহ তারপর ম্লান না হয়ে আরও তীব্র হওয়ার কারণই ঘটেছে।
প্রায় আধা-মরুর তীরভূমি ছেড়ে যত তারা আকাশছোঁয়া পাহাড়ের দেশে এগিয়েছে তত মধুর অপরূপ হয়ে উঠেছে তাদের পরিবেশ। আর সেই ভ্যাপসা জলাজংলার দুর্দশা নয়, চারিদিকে যেন স্বপ্নরাজ্যের খেত-খামার বাগান বিছানো। এদেশের লোক পাহাড়ি নদীকে বাগ মানিয়ে চাষের জন্যে সেচের কাজে লাগাতে শিখেছে, পাহাড়কে খাঁজে খাঁজে কেটে ফসলের খেত বানাবার কৌশল তারা জানে। যেখানে খেত খামার গ্রাম নেই সেখানে বিরাট সব অজানা মহীরূহের অরণ্য আর ঢেউ-এর পর ঢেউ তোলা পাহাড়ের সারির মহিমাময় রূপ। ইংকাদের প্রতাপ যেন সে নিসর্গ শোভার মধ্যে ফুটে উঠেছে।
বন্ধুভাবে অগ্রসর হওয়ার জন্যে পিজারোর বাহিনী প্রায় সর্বত্রই সাদর অভ্যর্থনা পেয়েছে এবার। যেখান দিয়ে তারা গেছে সেখানকার বসতির লোকেরা অতিথি হিসেবে তাদের সৎকারের কোনও ত্রুটি রাখেনি।
যাত্রাপথে পার্বত্য উপত্যকায় এই সব বসতিতে পিজারো যা দেখেছেন শুনেছেন তা বেশ একটু ভয়-ভাবনা জাগাবার মতো। ইংকা সাম্রাজ্যের বিধি ব্যবস্থা যে কীরকম উঁচুদরের, তীরভূমি থেকে পাহাড়ের দেশে আসবার পথে পদে পদে তার নিদর্শন মিলেছে। পার্বত্য নদী কোথাও বেঁধে কোথাও সুড়ঙ্গপথে চালিয়ে তাদের সেচের ব্যবস্থা তাঁর নিজের দেশকেও লজ্জা দেওয়ার মতো। তীরভূমি থেকে সমস্ত পার্বত্য অঞ্চলে দূর-দূরান্তরের যোগাযোগের জন্যে যেভাবে রাস্তাঘাট তৈরি ও তা রক্ষার। ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। নিরক্ষর পিজারোর পূর্তবিদ্যা সম্বন্ধে কোনও জ্ঞান না থাকলেও এসব দুঃসাধ্য কারিগরির অসাধারণত্ব বুঝতে কষ্ট হয়নি। নেহাত নগণ্য না হলে পার্বত্য পথের প্রতি জনপদে পিজারো ইংকা নরেশের জন্যে নির্দিষ্ট বিশাল সব পান্থ-নিবাসই শুধু দেখেননি, দেখেছেন প্রতিরক্ষার জন্য সুনির্মিত সব দুর্গ।
জনপদের অধিবাসীদের কাছে ইংকা সাম্রাজ্যের বিস্তারিত বিবরণও তিনি সংগ্রহ করেছেন। মাত্র বাষট্টি জন রিসালা নিয়ে সবসুদ্ধ একশো আটষট্টি জন সৈন্য যাঁর সম্বল তাঁর পক্ষে সে বিবরণ একেবারেই মনোরম নয়।
ইংকা সাম্রাজ্য কত বড় আর কতখানি তার ঐশ্বর্য এ সবের চেয়ে ইংকা নরেশের সৈন্যবল কত ও কী দরের সেই কথা জানবার আগ্রহই পিজায়োর তখন বেশি। সঠিক খবর পাওয়া না গেলেও তাঁর মুষ্টিমেয় বাহিনীকে ইংকা সাম্রাজ্যের বিরাট সেনাদল যে পায়ে মাড়িয়েই শেষ করে দিতে পারে এটুকু পিজারো জেনেছেন।
সৈন্যবল কত ইংকা নরেশের? কেউ তা ঠিকমতো বলতে পারে না, কিন্তু এটুকু তারই মধ্যে জানা গেছে যে সম্প্রতি ইংকা সম্রাট যেখানে শরীর সারাবার জন্যে আস্তানা নিয়েছেন সেখানেই তাঁর সঙ্গে আছে অন্তত হাজার পঞ্চাশ সেপাই।
পিজারোর কি এবার মানে মানে ফিরে যাবার ব্যবস্থাই করা উচিত ছিল না? কিন্তু তিনি তা করলেন কই? একশো আটষট্টি জন্য সৈন্য সঙ্গে নিয়েই তিনি। আতাহুয়ালপার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে কাক্সামালকার উদ্দেশে এগিয়ে চললেন।
আতাহুয়ালপা কে তা বোধহয় আর বলতে হবে না।
তিনি হলেন সূর্যপ্রভব ইংকা সাম্রাজ্যের অধীশ্বর, আর কাক্সামালকা হল পেরুর এক আশ্চর্য ঝরনা-জলের শহর, তখনকার ইংকা নরেশদের মতো এখনও মানুষ যেখানে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে যায়।
ইংকা আতাহুয়ালপার নিজের ডেরার কডিলিয়েরাস-এর পার্বত্য গোলোক ধাঁধা ভেদ করে এ ভাবে যাওয়া এক হিসেবে বাতুল গোঁয়ার্তুমি ছাড়া কিছু নয়। কী করবেন পিজারো তাঁর ওই ক-টা সঙ্গী নিয়ে সেই ইংকা সম্রাটের কাছে উপস্থিত হয়ে? তিনি কি শুধু সেই মহামহিমের দর্শনলাভের জন্যেই যাচ্ছেন? অকূল সাগর আর দুর্গম গিরি-মরু পেরিয়ে এসেছেন শুধু কিছু অনুগ্রহ ভিক্ষা করতে?
সে অনুগ্রহ চাইলেই যে পাবেন তারই বা ভরসা কী? রাজা-গজার মেজাজের কিছু ঠিক আছে? পিজারো আর তাঁর দলবল এ অজানা দেশের রেওয়াজ দস্তুর আদব-কায়দা কিছুই জানেন না বললে হয়। সামান্য একটু ভুলচুক হওয়া আশ্চর্য কী! আর তাতেই ইংকা রাজ্যেশ্বরের মেজাজ যদি বিগড়ে যায়, তখন? যে পঞ্চাশ হাজার সৈন্য ইংকা আতাহুয়ালপার সঙ্গে রক্ষী হিসেবে আছে তারা সবাই একটা করে টোকা। দিলেই তো তাঁরা গুঁড়িয়ে ধুলো হয়ে যাবেন। যদি বা তাদের এড়িয়ে কোনওমতে কাক্সামালকা থেকে পালাতে পারেন, তারপর নিস্তার পাবেন কি? এ পাহাড়ি গোলকধাঁধার রাজ্যে পথে পথে দুর্গের পাহারা। তা ছাড়া দূর-দূরান্তরে রাজাদেশ। নিয়ে যাওয়া ও খবর দেওয়া-নেওয়ার জন্যে দৌড়বাজ দূতের ব্যবস্থা আছে। তাঁরা পাঁচ পা না যেতে যেতেই তাঁদের খবর পাহাড় থেকে সাগর-তীর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।
