কেমন করে এ-চিঠি তাঁর হাতে পৌঁছোল? সাবধানের মার নেই বলে আলমাগরো তো তন্ন তন্ন করে খুঁজিয়ে লেখা কাগজের একটা টুকরোও কোথাও জাহাজে থাকতে দেননি। এ-চিঠি তাঁর নজর এড়াল কী করে?
নজর এড়িয়েছিল খুব চতুর একটি ফন্দির জোরে। আলমাগরো ভাবতেই পারেননি যে তাঁরই হাত দিয়ে চিঠিটা যথাস্থানে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা হয়েছে। আলমাগরো তাঁদের ভেট হিসেবে পানামার গভর্নর আর তাঁর স্ত্রীর কাছে যা সব নিয়ে গিয়েছিলেন তার মধ্যেই চিঠিটা সুকৌশলে রাখা ছিল!
না, সোনাদানার কোনও জিনিসে নয়, শুধু একটা তুলোর গুলির ভেতর। নতুন দেশের আজব তুলো হিসেবে সেটা উপহার দেওয়া হয়েছিল গভর্নরের স্ত্রীকে।
গভর্নরের স্ত্রী সেই তুলোর গুলি একটু ছাড়িয়ে দেখতে যেতেই সে চিঠি বেরিয়ে পড়েছে। এক-আধজন নয়, বেশ কয়েকজনের সইকরা চিঠি। সে চিঠিতে তারা পিজারো, আর আলমাগরের নির্মম জুলুমবাজির বিরুদ্ধে তীব্র নালিশ জানিয়েছে, আর সেই সঙ্গে বর্ণনা দিয়েছে নিজেদের অকথ্য দুর্দশার। এই চিঠির শেষেই ওই ছড়াটি ছিল।
পুরোপুরি সত্য হোক বা না হোক এ চিঠির কথা জানবার পর তা বিশ্বাস করে গভর্নর পেড্রো দে লস রিয়স আগুন হয়ে উঠেছিলেন রাগে। টাফুর নামে একজন সেনাপতিকে দুটি জাহাজ দিয়ে তখনই তিনি হুকুম করেন পিজারো আর তার অনিচ্ছুক সাঙ্গোপাঙ্গকে ফিরিয়ে আনতে।
টাফুর গভর্নরের সে-হুকুম পুরোপুরি তামিল করতে পারেনি। পিজারো সব পরিণাম তুচ্ছ করে পানামায় না ফিরে অভিযান চালিয়ে যাবার সংকল্পই জানিয়েছেন।
টাফুর ব্যর্থ হয়ে ফিরে পিজারোর অবাধ্যতার কথা গভর্নরকে জানিয়েছ। গভর্নর তাতে ক্ষিপ্ত হয়েছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাদরি লুকে আর আলমাগরোর ধরাধরিতে গভর্নরের রাগ খানিকটা পড়েছে। জ্বালা যায়নি শুধু টাফুর-এর। টাফুর সেই থেকে পিজারোর শত্রু। গভর্নরের স্ত্রীকে লেখা চিঠির ছড়া সাধারণের কাছে পৌঁছে দেবার ব্যাপারে তার বেশ কিছুটা হাত থাকা অবিশ্বাস্য কিছু নয়।
গভর্নরের বিরূপতার চেয়ে এই ছড়া পিজারোর ক্ষতি করেছে বেশি। মুখে মুখে ছড়িয়ে ও অঞ্চলের মানুষের মনে পিজারোর অভিযান সম্বন্ধে অবিশ্বাস তীব্র করে তুলেছে।
এ ছড়া যেখানে পৌঁছেছে সেখানে পিজারোর স্বপক্ষে কোনও কথায় কেউ কান দেবে না বুঝেই অত্যন্ত ভাবিত হয়ে সেদিন ঘনরাম পুলকের আড্ডা ছেড়ে সরে পড়েন।
আজ্ঞা ছেড়ে তিনি সোজা বন্দরে গিয়ে কাপিন সানসেদোকে খুঁজে বার করে সব কথা আলোচনা করেন।
তাহলে কী করা এখন উচিত? জিজ্ঞাসা করেন সানসেদো।
উচিত এখনই এ বন্দর ছেড়ে যাওয়া। জোর দিয়ে বলেন ঘনরাম, তা না হলে এই সান্তা মার্তা থেকে জাহাজ নিয়ে বার হওয়ার তোক পাওয়া যাবে না। খবর নিয়ে জেনেছি, টাফুর এখানকার ফৌজদার হয়ে কিছুকাল কাটিয়ে গেছে। পিজারোর বিরুদ্ধে এখানকার মন বিষিয়ে দেওয়ার কিছু সে বাকি রাখেনি। এখানে বেশিদিন থাকলে আমাদের লোক-লশকর সব ছেড়ে যাবে।
কাপিন সানসেদো পিজাররাকে সেই পরামর্শ দিতে গেছেন।
কিন্তু পিজারো যদি বা তাঁর কথায় কান দিতেন, তাঁর দাম্ভিক ভাই হার্নারেমন্ডো প্রায় অপমান করেই হটিয়ে দিয়েছে সানসেদোকে। অবজ্ঞাভরে বিদ্রূপ করে বলেছে, এখানকার শুড়িখানায় একটু বেশি পুলকে টানা হয়ে গেছে, না? যাও সেই আসরে গিয়ে এ-সব গুল ঝাড়ো।
সানসেদো অপমানিত হয়ে ফিরে গিয়ে ঘনরামকে সব জানিয়েছেন।
তার পরদিনই জানা গেছে যে একটি দল জাহাজ ছেড়ে পালিয়েছে। দলটা খুব। বড় নয় এই যা রক্ষে। সে দলে যারা পালিয়েছে তাদের মধ্যে কাপিন সানসেদোর নামটাই পিজারো খেয়াল করেছেন। গানাদো নামে একটা বেদের কথা তাঁকে জানানো কেউ প্রয়োজনও মনে করেনি।
দল ছোট হলেও তাতেই পিজারোর টনক নড়েছে। সান্তা মার্তায় আর একটা বেলাও তিনি কাটাতে সাহস করেননি। সেইদিনই বাকি লোকলশকর নিয়ে রওনা হয়েছেন নোমৰ্বে দে দিওস-এ। সেইখানেই লুকে আর আলমাগরো পানামা যোজকের শিরদাঁড়ার পাহাড় ডিঙিয়ে তাঁর সঙ্গে মিলেছেন। তারপর ছোটখাটো বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও পিজারোর তৃতীয় অভিযান বন্ধ হয়নি।
পনেরোশো ত্রিশের জানুয়ারিতে তিনি সেভিল ছেড়েছিলেন কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ-এর ভয়ে। পুরো এক বছর বাদে ঠিক ওই জানুয়ারি মাসে তিনি পানামা থেকে রওনা হতে পেরেছেন।
সান্তা মার্তা ছাড়বার পর এতদিনের মধ্যে কাপিন সানসেদো বা তার সঙ্গী বেদে সেই গানাদোর কোনও খবর তিনি পাননি। তাদের কথা পিজারোর মনেই ছিল কি না সন্দেহ।
টম্বেজ শহরে হঠাৎ একদিন একটি লোককে দেখে তিনি বিস্মিত হন। বিস্মিত হন তার অদ্ভুত পাগলামিতে। তখনও তাকে দেখে তাঁর স্মৃতিতে কোনও সাড়া জাগেনি।
লোকটির চেহারা পোশাক দেখে তাঁর নিজের বাহিনীর কেউ বলেই বুঝতে পারেন। হার্নারেমন্ডো দে সটোর সঙ্গে তারই জাহাজে এসেছে নিশ্চয়। এ নতুন দলের দু-একজন ছাড়া কেউই তাঁর চেনা নয়।
লোকটি যা করছে তাই অদ্ভুত লাগবার জন্যেই তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। টম্বেজ শহরে এবারে এসে তখনও বেশিদিন তাঁদের কাটেনি। শ্মশানের মতো শহরের চেহারা দেখেই সবাই তাঁরা তখন বিমূঢ়। তাঁদের নিজেদের লোকজন ছাড়া শহরের বাসিন্দা কেউ নেই বললেই হয়।
সেই নির্জন শহরে একটা ছোট পুকুরের ধারে লোকটা করছে কী? কাছে গিয়ে সেই কথাই জিজ্ঞেস করতে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন করেন পিজারো। তার কারণ লোকটার মুখের দিকে চাইতেই ঢাকা-পড়া স্মৃতিটা একটু ঝিলিক দিয়ে উঠেছে।
