প্রথম অভিজ্ঞতা যাদের এইরকম, নতুন মহাদেশটা আগাগোড়াই ভয়াবহ বলে তাদের বোঝানো খুব কঠিন হয়নি। প্রথম পরিচয়টুকুই সারাদেশের নমুনা বলে তারা মেনে নিয়েছে।
এরকম ধারণা ঠেকাবার চেষ্টা কেউ করেনি এমন নয়। কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু ফল হয়নি।
তখন সান্তা মার্তার বন্দরে জাহাজ তিনটিতে সামান্য কিছু রসদ আর জল তোলার সঙ্গে সেগুলির ছোটখাটো একটু-আধটু মেরামতি চলছে। মাঝিমাল্লা সেপাইরা বেশির ভাগই বন্দরের লোকজনের সঙ্গে সেই সুযোগে অবসরমতো একটু আড্ডা দেয়। আড্ডা মানে অবশ্য শুড়িখানায় বসে পুলকে টানা। আমেরিকার-ই একটি অদ্ভুত গাছ। আগেভির ডাঁটার রস থেকে গাঁজানো, দুধে রং-এর এই পুলকে তখন নেশা হিসেবে এসপানিওলদের দারুণ পেয়ারের হয়ে উঠেছে।
এই পুলকের আসরেই সান্তা মার্তার লোকেরা পিজারোর লোকেদের কান ভাঙিয়েছে।
বাধা দেবার চেষ্টা যে করেছে সে একটা বেদে মাত্র! পিজারোর দলের লোকেরা তাকে গানাদো বলে জানে। সেভিল-এর বন্দর ছাড়বার পর জাহাজে নতুন মুখ হিসেবে তাকে দেখা গিয়েছিল। তা নতুন মুখ তো ওই একটাই নয়। এ-ধরনের অভিযানে হামেশাই তা দেখা যায়। গানাদো নামটা একটু অদ্ভুত, কিন্তু বেদেদের নাম হিসেবে তাও কানে সয়ে গিয়েছে।
কিছু যারা পুরনো তারা বেদে বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কি ঘেন্না যেমন করেনি, তেমনই সমীহও নয়। আসলে গানাদোকে নিয়ে তাদের বিশেষ মাথা ঘামাতেই হয়নি। লোকটা নিজে থেকেই একটু যেন সরে সরে থেকেছে সবকিছু থেকে।
এই গানাদোকে কিন্তু পুলকের মৌতাতের আসরে একটু ঘন ঘন দেখা গেছে আর সব দলের সঙ্গে।
সেটা কিছু এমন অদ্ভুত নয়। পুলকের মতো নেশার টানে কে না বেরিয়ে আসে।
কিন্তু সান্তা মার্তার লোকেদের সঙ্গে তাকে কথা কাটাকাটি করতে দেখে সবাই একটু অবাক।
সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের নিন্দে শুনে গানাদো অবশ্য খেপেটেপে যায়নি। সে যা বলেছে, তা বিদ্রূপের সুরে।
বলেছে, হ্যাঁ, কথাটা মন্দ নয়। নিজের পচা জলের গর্ত যার ছাড়বার ক্ষমতা নেই, সে কুয়োর ব্যাঙের পক্ষে বাইরের সব-ই এঁদো পুকুর মনে করাই ভাল।
পুলকের নেশা ভেদ করে খোঁচাটা মর্মে গিয়ে পৌঁছোতে একটু দেরি হয়েছে। সান্তা মার্তার মাতালরাই খেপেছে তারপর।
আমরা কুয়োর ব্যাঙ! নিজেদের মান বাঁচাতে আমরা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে দুর্নাম রটাচ্ছি। তা হলে শুনবে একটা ছড়া?
কী ছড়া? জিজ্ঞাসা করেছে পিজারোর মাঝিমাল্লাদের অনেকে।
গানাদো অর্থাৎ ঘনরাম প্রমাদ গনেছেন তখনই। ছড়ার উল্লেখ শুনেই তিনি বুঝেছেন সমস্যাটা সঙ্গিন।
সান্তা মার্তার মাতাল নিন্দুকরা তখন ছড়া আওড়াতে শুরু করেছে—
পুয়েস সেনিয়র গোবেরনাদর
মিরেললা বিয়েন পোর এন্তেরো
কুয়ে আলিয়া ভা এল রেকোখেদর
ঈ আকা কুয়েদা এল কার্নিথেরো।
এ-ছড়া আওড়ানো শেষ হওয়ার পর গানাদোকে আর সেখানে দেখা যায়নি। অবস্থা বেগতিক দেখে গানাদোরূপী ঘনরাম সরে পড়েছেন আগেই।
কেন? ঘনরাম ওই ছড়া শুনেই পালালেন কেন? ও-ছড়া ভূতের মন্তর-টন্তর নাকি! শিরোদেশ যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই শিবপদবাবু জো পেয়ে চিমটিটুকু কাটলেন।
না, ভূতের মন্তর নয়। ক্ষমার অবতার হয়ে দাসমশাই কিন্তু অনায়াসে এ-বেয়াদপি মাপ করে বললেন, তবে এ বড় সাংঘাতিক ছড়া। এ-ছড়ার নাম শুনেই ঘনরাম বুঝেছিলেন যে সান্তা মার্তা তাঁদের পক্ষে বেশ একটু গরম জায়গা! এ-ছড়া যারা আওড়ায় তাদের ঠাণ্ডা করবার মতো জবাব তখনও তৈরি হয়নি।
কিন্তু ছড়াটা অত সাংঘাতিক কেন? ওর মানেটানে কিছু আছে? মেদভারে হস্তীর মতো যিনি বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণ সরল কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ, মানে আছে বই কী! দাসমশাই আশ্বস্ত করে জানালেন, আর সেই মানেটার জন্যেই ছড়াটা সাংঘাতিক। ও-ছড়ার বাংলা মানে মোটামুটি এইরকম করা যায়—
ফৌজদারসাব থাকুন হুঁশিয়ার,
আড়কাটিটার ওপর রাখুন নজর!
ভেড়ার পাল সে যায় তাড়িয়ে আনতে
কসাই হেথায় ছুরি শানায় জবর!
এই ছড়াকে— পর্যন্ত বলেই শিবপদবাবুকে থামতে হল।
শিবপদবাবু টিপ্পনিটুকু নিজেই পূরণ করে দিয়ে দাসমশাই বললেন, এই ছড়াকে এত ভয়! সবাই আপনারা তা-ই ভাবছেন নিশ্চয়। ছড়াটার ইতিহাস জানলে তা আর ভাবতেন না। ছড়াটা রচনা হিসেবেও উঁচুদরের নয়, মানেটার ভেতরেও এমন ভয়ংকর কিছু শুধু কানে শুনে পাওয়া যায় না। তা পাওয়া যায়, কেন, কারা, কবে, ও-ছড়া বেঁধেছিল, তা জানলে। ও ছড়া বেঁধেছিল পিজারোর দ্বিতীয় অভিযানের কয়েকজন খাপ্পা নাবিক সেপাই! সোনার প্রলোভনে পিজারোর অভিযানে যোগ দেওয়ার পর তাদের তখন সব দিক দিয়ে দুর্দশার একশেষ হয়েছে। কোনও রকমে দেশে ফিরতে পারলে তারা বাঁচে। কিন্তু পিজারো আর আলমাগরো তাদের জোর করে গাল্লো বলে এক অখদ্দে দ্বীপে ধরে রাখবার ব্যবস্থা করেন। খেপে আগুন হয়ে নাবিক-সেপাইদের বেশির ভাগই তখন পানামায় তাদের বন্ধুদের কাছে তাদের অবস্থার কথা জানাবার চেষ্টা করে। গাল্লো দ্বীপে এক দলকে রেখে নেহাত রুগ্ন আর অকর্মণ্য কয়েকজনকে নিয়ে আলমিগরো তখন নতুন লোকজন আর রসদ সংগ্রহ করে আনতে একটি জাহাজে পানামায় ফিরছেন। এই জাহাজে ফিরে যাওয়া সেপাইদের মারফতই গাল্লো দ্বীপে যাদের থাকতে বাধ্য করা হয় তারা তাদের চিঠি পাঠাবার ব্যবস্থা করে। কিন্তু ব্যাপারটা জানতে পেরে আলমাগরো সেসব চিঠি কেড়ে নিয়ে তাদের বিক্ষোভ পানামায় পৌঁছোবার রাস্তা বন্ধ করেন। তা সত্ত্বেও একটি চিঠি পানামায় গিয়ে পৌছোয়। পৌঁছোয় আবার যার তার কাছে নয়, একেবারে খোদ গভর্নর পেড্রো দে লস রিয়স-এর বিবিসাহেবের কাছে।
