কেউ বলেছে, তারা মারা গেছে মহামারিতে, কেউ বলেছে, পুনার লোকেদের সঙ্গে লড়াই-এ। দু-একজন ভয়ে ভয়ে জানিয়েছে যে মেয়েদের ইজ্জৎ নষ্ট করবার চেষ্টার দরুনই তাদের প্রাণ হারাতে হয়েছে।
শেষের ব্যাখ্যাটাই ঠিক মনে হলেও পিজারো রক্তের বদলে রক্ত চেয়ে এবার কাউকে সাজা দেবার ব্যবস্থা করেনি। নিঃশব্দে সমস্ত ব্যাপারটা যেন হজম করে নিয়েছেন।
এ দেশের মানুষ সম্বন্ধে পিজারোকে তাঁর নীতিই হঠাৎ বদলে ফেলতে দেখা গেছে। এর পর। আর কারণে-অকারণে মারকাট জুলুম জবরদস্তি লুঠ নয়, একেবারে তৃণাদপি সুনীচ আর তরোরিব সহিষ্ণু হতে হবে সকলকে। বাহিনীর প্রত্যেকটি সৈনিকের ওপর এই আদেশ।
হঠাৎ এ পরিবর্তন কেমন করে হল?
এ কি মনেরই পরিবর্তন, না শুধু নীতির?
পরিবর্তন যে রকমই হোক, তার মূলে কিছু একটা ব্যাপার নিশ্চয় আছে। কী সে ব্যাপার? একটি নতুন মানুষের আমদানি?
সেই মানুষ কি হার্নারেমন্ডো দে সটো স্বয়ং? না। হার্নারেমন্ডো দে সটোর অধীনে দুটি জাহাজে শুধু ঘোড়া আর সোনা সন্ধানী সেপাই ছাড়া আরও একটি মানুষ এসেছেন।
পানামা থেকে ১৫৩১-এর জানুয়ারিতে সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের উদ্দেশে পাড়ি দেবার সময় পিজারোর কোনও জাহাজে তিনি ছিলেন না।
হ্যাঁ, ঘনরামই সেই আশ্চর্য মানুষ যিনি পিজারোর অভিযানের নীতি বদলাবার মূলে ছিলেন।
কিন্তু পিজারোর সঙ্গে এক জাহাজেই তো তিনি কাপিন সানসেদোকে নিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন মধ্যরাতে সেভিল-এর বন্দর ছেড়েছিলেন বেদের সাজে। গোপনে নোঙর তুলে জাহাজ ছাড়ার ফন্দিও তাঁর।
তারপর তিনি গেলেন কোথায়। ১৫৩১-এর জানুয়ারি মাসে পিজারো যখন পানামা থেকে তাঁর তৃতীয় অভিযানে বার হন তখন ঘনরাম আর সানসেদো পিজারোর দল থেকে বাদ পড়েছিলেন কেন?
না, বাদ তাঁরা পড়েননি। ঘনরাম কাপিন সানসেদোকে নিয়ে নিজে থেকেই পিজারোর খাস জাহাজ ছেড়ে পানামায় পৌঁছোবার আগেই সান্তা মার্তায় নেমে গিয়েছিলেন।
সান্তা মার্তায় জাহাজ ভেড়ানো পিজারোর পক্ষে শুভ হয়নি। ১৫৩০-এর জানুয়ারি মাসে সেভিল ছেড়ে সান লকার-এর চড়া এড়িয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের গামেরাতে জাহাজ ভিড়িয়ে তিনি ভাই হার্নারেমন্ডোর জন্যে অপেক্ষা করেন।
কাপিন সানসেদো সেভিল-এ জাহাজ নিয়ে লুকিয়ে পালাবার সময় যে, আশ্বাস দিয়েছিলেন তা মিথ্যে হয়নি। পিজায়োর ভাই হার্নারেমন্ডো সেভিল-এ কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ-এর মাতব্বরদের ধোঁকা দিয়ে ঠিকই সেখানে এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন।
তারপর মহাসাগর নিরাপদে পেরিয়ে তাঁদের জাহাজ ভেড়ে সান্তা মার্তা বন্দরে। এইখানেই পিজারোর লোক-লশকরের মধ্যে অনেকে বিগড়ে যায়। সান্তা মার্তার বাসিন্দারা তাদের বেশ দমিয়ে দেয়। এসব বাসিন্দারাও এককালে এসপানিয়া থেকে সোনা-দানা আর নাম-যশের লোভে পাড়ি দিয়েছিল। তারপর তাদের সব আশায় ছাই পড়েছে। জোয়ার বয়ে যাওয়ার পর স্রোতের জঞ্জালের মতো তারা আটকে পড়ে আছে এই জলা-জঙ্গরে রাজ্যে।
এসব পোড়-খাওয়া বানচাল মানুষের কোনও কিছুতেই আর বিশ্বাস নেই। পিজারোর লোক-লশকর বন্দরে নেমে বুঝি তাদের অভিযান সম্বন্ধে একটু বড়াই করেছিল।
সান্তা মার্তার লোকেরা তাদের উৎসাহে একেবারে বরফজল ঢেলে দিয়েছে। তারা হেসে যা বলেছে তার সোজা বাংলা হল এই যে, মার কাছে মাসির গল্প আর কোরো না। খোলামকুচির মতো সোনা ছড়ানো এমন দেশ সত্যি কোথাও আছে নাকি! ওই সব ভুজুং দিয়ে শুধু তোমাদের স্পেন থেকে ভুলিয়ে আনা।
সান্তা মার্তার লোকেরা নিজেদের দৃষ্টান্তই দিয়েছে। তারাও দেশ ছেড়ে অমনই সব মিথ্যে আশ্বাসে ভুলেই এসেছিল। এসে এখন তাদের এই হাল। তাদের এ-অঞ্চল তো তবু পদে আছে। সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ তো এরও অধম। সে-দেশের কথা জানতে তো আর তাদের বাকি নেই। সে যদি সত্যি অমন সোনার দেশ হত তা হলে তারা নিজেরা পচে মরত নাকি এই নরকে! পিজারোকে যে স্পেন পর্যন্ত ধাওয়া করতে হয়েছে লোক-লশকর আনতে, তাতেই তো তার ফাঁকিটা বোঝা উচিত। হাতের কাছে
এখানে লোক পেলে সাগরপারে তাকে পাড়ি দিতে হয়?
মুখে একটু-আধটু তর্ক করবার চেষ্টা অবশ্য পিজারোর লোকেরা করেনি এমন নয়, কিন্তু তাদের মনে একটু করে খোঁচা উঠতে শুরু করেছে সেই থেকেই।
কিন্তু সে-দেশ কেমন কেউ তো তোম জানো না। দু-একজন মৃদু প্রতিবাদ জানিয়েছে, ভালোও তো হতে পারে।
হ্যাঁ, তা পারে বইকী! তারা টিটকিরি দিয়ে বলেছে, সেখানকার আবহাওয়া আরও গরম আর ভ্যাপসা। মশা-মাছি জংলা পোকা-মাকড়ের ঝাঁক আরও পাগল করা, ডাঙায় কিলবিলে সাপ আরও বড় আর বিষাক্ত, আর জলে কেম্যান অর্থাৎ কুমির আরও ভয়ংকর। সবদিক দিয়েই সে-দেশ ভালো তো বটেই!
সান্তা মার্তায় বসে কথাগুলো শোনার দরুনই তা মনে দাগ কেটেছে আরও বেশি। স্পেন ছেড়ে যারা বড়জোর ক্যানারিজ দ্বীপপুঞ্জ কি হিসপানিওলা ফার্নানদিনা পর্যন্ত এক-আধবার এসেছে তাদের কাছে সান্তা মার্তা সত্যিই প্রত্যক্ষ নরক।
এরকম জায়গার সঙ্গে তাদের পরিচয়ই নেই। তারা আর যাই হোক, খোলামেলা জায়গার মানুষ। এ-ধরনের বুকচাপা লতাপাতায় ডালপালায় দিনদুপুরেই অন্ধকার। দুর্ভেদ্য জঙ্গল তারা কল্পনাই করেনি। শুধু জঙ্গল নয়, যেন বিষাক্ত নিশ্বাসে আকাশ ভারী করে রাখা বিরাট সব জলা। আর শয়তানের দূতের মতো বিদঘুটে সব কীট-পতঙ্গের জ্বালায় এক দণ্ড স্বস্তি নেই। এ-জলাজঙ্গলের জন্তুজানোয়ারগুলোও যেন সত্যি-হয়ে-ওঠা দুঃস্বপ্ন।
