এই কড়া বিধানে আর যা-ই হোক লুঠ নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি পিজারোর বাহিনীতে বন্ধ হয়েছে।
লুঠের মাল ভাগবাটোয়ারার পর পিজারো প্রথমেই স্পেন সম্রাটের বরাদ্দ পানামায় পাঠাবার ব্যবস্থা করেছেন। সম্রাটের জন্যে যা পাঠানো হয়েছে তা সামান্য কিছু নয়। পেড্রো পিজারো লিখে গেছেন যে সে সওগাতের দাম কমপক্ষে বিশ হাজার কাস্তেললানো। কাস্তেলোনো হল প্রাচীন স্প্যানিশ স্বর্ণমুদ্রা! ওজন ত্রিশ রতির কম নয়।
এই সওগাত পাঠাবার পেছনে রাজভক্তি ছাড়া একটু কূটবুদ্ধিও ছিল। সেভিল থেকে জাহাজ নিয়ে পালিয়ে আসতে পারলেও শত্রুদের তাঁর বিরুদ্ধে রাজদরবারে গুঞ্জন তোলবার সুযোগ তিনি দিয়ে এসেছেন। সম্রাটের নামে এই ধনরত্নের ভেট পৌঁছোলে সে গুঞ্জনই শুধু বন্ধ হবে না, তাঁর অভিযান সম্বন্ধে যারা বিরূপ কি উদাসীন ছিল এতদিন, তারাও নতুন উৎসাহ পেয়ে হয়তো যোগ দিতে পারে।
পিজারোর হিসাবের ভুল হয়নি। নিজে সৈন্যসামন্ত নিয়ে হাঁটাপথে রওনা হয়ে এবার তিনটি জাহাজই তিনি পানামায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর একটি জাহাজ পানামা থেকে ফিরে তাঁদের সঙ্গ ধরেছে। সে জাহাজে রাজখাজাঞ্চি ভিভর অর্থাৎ পরিদর্শক ইত্যাদি নিয়ে স্পেন রাজ্যের বেশ কয়েকজন বড় আমলাই ছিলেন। সেভিল থেকে এঁদের সঙ্গে আনবারই কথা। কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ-র চোখে ধুলো দিতে অমন লুকিয়ে পালাবার দরুনই তা সম্ভব হয়নি।
রাজপ্রতিনিধিরা এখন বেশ প্রসন্নমনেই পিজারোর অভিযানে যোগ দিয়েছেন। আরও কিছুটা এগিয়ে পুয়ের্তো ভিয়েখো অর্থাৎ ভিয়েশখা বন্দর পর্যন্ত পৌঁছোবার পর দ্বিতীয় একটি জাহাজও বেলালকাজার বলে একজন সেনাপতির অধীনে নতুন জনত্রিশ সৈন্য নিয়ে তাঁদের সঙ্গে ভিড়েছে।
দলে একটু ভারী হলেও পিজারোকে এবার বেগ পেতে হয়েছে অজানা দেশের লোকের শত্রুতার জন্যে। পিজারোর বাহিনীর লোকেদের কীর্তিকলাপের খবর তাদের আগে হাওয়ায় ছড়িয়ে গেছে। এই সাদা চামড়ার মানুষগুলো যে দেবতা নয়, দানব, সমুদ্র-উপকূলের শহরে গ্রামে কারও তা জানতে বোধহয় তখন বাকি নেই।
পিজারোর দলকে আগের বারের মতো অভ্যর্থনা করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। যেখানেই তারা গেছে, হয় লোকেরা যা কিছু সম্ভব নিয়ে ঘরদোর ছেড়ে বনে গিয়ে লুকিয়েছে, কিংবা প্রাণপণে তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাধা দিয়েছে।
পিজারোর প্রথম লক্ষ্য হল টম্বেজ। সে শহরে পৌঁছোবার আগে কিন্তু অনেক বিপদ তাঁকে কাটাতে হয়েছে।
টম্বেজ শহরে যেতে ছোট্ট একটি উপসাগর পথে পড়ে। নাম গুয়াকুইল উপসাগর। সেখানে পুনা বলে ছোট্ট একটি দ্বীপের সর্দারের নিমন্ত্রণে বর্ষাকালটা কাটাতে গিয়ে পিজারো সমস্ত বাহিনীসমেত প্রায় ধ্বংস হতে বসেছিলেন।
পুনা দ্বীপের লোকেদের সঙ্গে পেরুর ইংকাদের প্রজাদের ঝগড়া। এই ঝগড়ার সুযোগ নিয়ে পুনাবাসীদের নিজের কাজে লাগাবার ফন্দি কিন্তু সফল হয়নি! পিজারোর বাহিনীর লোকেদের নির্মমতা ও কপটতায় খেপে উঠে পুনার অধিবাসীরা একদিন তাদের আক্রমণ করেছে।
শরীরের বর্ম দিয়ে লম্বা বল্লম আর বন্দুকের জোরে কোনওরকমে সে আক্রমণ ঠেকালেও পুনা দ্বীপে থাকা পিজারোর পক্ষে সর্বনাশা হয়েছে। সম্মুখ যুদ্ধে গুলি-বারুদের সামনে দাঁড়াতে না পেরে জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নিলেও পুনার লোকেরা তাদের শত্রুতা ত্যাগ করেনি। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে হানা দিয়ে তারা পিজারোবাহিনীর রসদ নষ্ট করেছে, দল-ছাড়াভাবে বাগে পেলে নিকেশ করে দিয়েছে।
এই দুর্দিনে পানামা থেকে আরও শ-খানেক নতুন সেপাই আর কিছু ঘোড়াসমেত দুটি জাহাজ এসে পৌঁছোবার দরুন পিজারো ধড়ে প্রাণ পেয়েছেন!
এই নতুন সেনাদল যাঁর অধীনে এসেছে তাঁর নাম হার্নারেমন্ডো দে সটো-পেরু অভিযানে অবজ্ঞা করবার মতো না হলেও এ নাম স্মরণীয় হয়ে আছে আরও একটি বড় কীর্তির জন্যে। সে কীর্তি হল উত্তর আমেরিকার মিসিসিপি নদী আবিষ্কার। সেই মিসিসিপির তীরেই তাঁর সমাধি বহুকাল তাঁর অক্ষয় কীর্তি ঘোষণা করছে।
হার্নারেমন্ডো দে সটো নতুন সৈন্যসামন্ত-সমেত দুটি জাহাজ নিয়ে আসার পর পিজারো তাঁর পক্ষে অভিশপ্ত পুনাদ্বীপ ছেড়ে আবার পেরুর উপকূলে গিয়ে উঠেছেন। সেই উপকূলের পথে টম্বেজ পর্যন্ত পৌঁছোনো অবধি দুর্ভাগ্য তাঁকে একেবারে ত্যাগ করেনি। পুনা দ্বীপ থেকে উপকূলে নামবার সময়েই একটি ছোট দল একলা পড়ে গিয়ে শত্রুদের হাতে মারা পড়েছে! টাবেজ শহরে পর্যন্ত এবারে পিজারো প্রথমে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভ্যর্থনা পেয়েছেন!
আগেরবার যে টম্বেজ শহরের সুখশান্তি ঐশ্বর্য দেখে তাঁরা মুগ্ধ বিস্মিত হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন, সে শহর এখন যেন শ্মশান। লোকজন তো শহরে নেই-ই, তার ওপর দু-চারটি ছাড়া সমস্ত বাড়িঘরও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বৃথাই এ দুর্দশার যথার্থ কারণ জানবার চেষ্টা করেছেন পিজোরা। টবেজের কুরাকা অর্থাৎ শাসকও শহর ছেড়ে পালিয়েছিল। কোনওরকমে তাকে ধরে আনবার ব্যবস্থা হয়েছে। কুরাকা যা বলেছে তা বিশ্বাস করা পিজারোর পক্ষে সম্ভব হয়নি। পুনাদ্বীপের অধিবাসীরাই অতর্কিত আক্রমণ করে টমবেজের এই দুর্দশা করেছে বলে বোঝাতে চেয়েছে কুরাকা।
টমবেজ শহরে যে দু-জন প্রতিনিধি পিজারো রেখে গিয়েছিলেন এবারে ফিরে এসে তাদের আর দেখতে পাননি। তাদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার ব্যাপারে উলটোপালটা নানা কথা শোনা গেছে।
