এই ফ্রানসিসকো পিজারোর দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে সৈন্যরাও অসাধ্য সাধন করে। অসাধ্য সাধন অবশ্য নিজেদের চেয়ে সংখ্যায় অনেক গুণ বেশি দেশোয়ালিদের মার-কাট আর লুঠতরাজ।
নতুন মহাদেশে সাদা চামড়ার আগন্তুকদের সম্বন্ধে সাধারণ অধিবাসীদের ধারণা। তখনই পালটাতে শুরু করেছে। এর আগেরবার অজানা শ্বেতাঙ্গ এই বিদেশিদের লোকে দেবতার মতো অভ্যর্থনা করেছে। এবারে সেই দেবতার আসল পরিচয় ধরা পড়ে গেছে অনেকের কাছেই।
হাঁটাপথে পাড়ি দেওয়ার কিছুদিন বাদেই প্রথম যে আধাশহর তাদের সামনে পড়ে পিজারোর বাহিনী তা লুঠেপুটে ছারখার করে। শহরের লোকেদের কাছে ব্যাপারটা তখনও কল্পনাতীত। কারও কোনও ক্ষতি তারা যখন করেনি তখন তাদের ভয় করবার কিছু নেই এই বিশ্বাসে তারা সরল আন্তরিকতার সঙ্গে গৌরাঙ্গ বিদেশিদের তাদের বসতিতে স্বাগত জানায়। কিন্তু বিদেশিরা এ প্রীতির জবাব দেয় খোলা তলোয়ার নিয়ে তাদের তাড়া করে তাদের ঘরবাড়ির যা-কিছু লুঠেপুটে নিয়ে।
এই আধাশহরেই পিজারোর লোক-লশকরেরা প্রথম নুড়ি পাথরের মতো এক মণিরত্নের ছড়াছড়ি দেখে। এ মণিরত্ন হল পান্না।
পিজারোর দলে হিড্যালগো অর্থাৎ বড়ঘরের ছেলে কিছু ছিল না এমন নয়। কিন্তু তারাও বেশির ভাগ ঘটি-ডোবেনা নামে-তালপুকুর গোছের পড়ে-আসা বংশের। দুলাল। তাও বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো। তারা বা বাকি সব নেহাত নিচু ঘরের ডানপিটে মুখখু গোঁয়াররা পান্নার মর্ম কী বুঝবে। পায়রার ডিমের মতো একটা অমূল্য পান্না তারা এই শহরেই পায়। সে পান্না তারা হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ভেঙেছিল। ভেঙেছিল আবার এক পাদরির কথায়। পারিবাবা সকলকে বুঝিয়েছিলেন যে পান্না সাচ্চা কি ঝুটো তা বোঝবার পরীক্ষাই নাকি হাতুড়ি দিয়ে পেটানো। সাচ্চা পান্না নাকি হাতুড়ি দিয়ে পিটেও ভাঙা যায় না। পারিবাবার এই পরামর্শ শুনেই পৃথিবীর অমূল্য একটি রত্ন নষ্ট হয়ে গেছে।
অমূল্য রত্ন মানে পায়রার ডিমের মতো একটা পান্না!—এতক্ষণ বাদে খোঁচা দেওয়ার এ সুযোগটুকু মর্মরের মতো মস্তক যাঁর মসৃণ সেই শিবপদবাবু ছাড়লেন না—তা, সে অস্পৃশ্য পান্নার ভাঙা টুকরোগুলো কেউ কুড়িয়ে রেখেছিল বোধহয়! নইলে পায়রার না ঘোড়ার ডিম জানা গেল কী করে?
কী করে জানা গেল?—দাসমশাই অবোধকে জ্ঞান দিতে করুণার হাসি হাসলেন—জানা গেল, রিলেথিওনেস দেল দেশকিউব্রিসিয়েন্তো ঈ কনকুইস্তা দে লস রেনস দেল পেরু-র দৌলতে।
শিবপদবাবু ভুরু কুঁচকে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে সে সুযোগ না দিয়ে দাসমশাই আবার বললেন, না, এসপানিওল-এর বিদ্যে জাহির করছিমনে করবেন না। শুধু সে যুগের চাক্ষুষ দেখা একটি বিবরণের নাম বলছি। যিনি এ বিবরণ লিখে গেছেন তাঁর নাম পেড্রো পিজারো। পিজারো পদবি দেখে যা মনে হয় তা কিন্তু ভুল। তিনি ফ্রানসিসকো পিজারোর আপন বা সতাতো ভাইটাই কেউ নন। পিজারোদের জন্মস্থান এসক্রেমাদুরা প্রদেশের টোলেডোতেই অবশ্য তিনি জন্মেছেন, আর খুঁজলে তাদের সঙ্গে দূরসম্পর্কের একটা জ্ঞাতিত্ব হয়তো পাওয়া যেতে পারে। পেড্রো পিজারো পনেরো বছর বয়সেই ফ্রানসিসকো পিজারোর খাস অনুচর হিসেবে তাঁর তৃতীয় অভিযানে যোগ দেন। পেরু-বিজয়ের প্রায় সমস্ত বড় বড় ঘটনাতেই তিনি উপস্থিত ছিলেন। পেরু অভিযানের নেতা ফ্রানসিসকো তাঁকে বিশ্বাস করে অনেক কঠিন দুঃসাহসিক কাজের ভার দিয়েছেন। পেড্রো সে সমস্ত কাজে তাঁর বিচক্ষণতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। নেতার বিশ্বাসের অমর্যাদা কখনও করেননি। সম্পদে বিপদে সৌভাগ্যে আর ভাগ্যবিপর্যয়ে তিনি সমানভাবে ফ্রানসিসকো পিজারোর অনুগত থেকেছেন। নিজের ধনপ্রাণ রক্ষা করতেও তাঁর বিরুদ্ধে নেমকহারামি কখনও করেননি।
পেড্রো পিজারো সম্বন্ধে এত কথা বলার কারণ এই যে, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যে বিবরণ তিনি রেখে গেছেন, সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ আবিষ্কার ও অধিকারের যথার্থ বৃত্তান্ত সংগ্রহের ব্যাপারে তা অমূল্য। পেড্রো পিজারো এ বিবরণে নিজের ঢাক পেটাবার চেষ্টা কোথাও করেননি। নিজের কথা যেখানে বলতে হয়েছে সেখানে তিনি উত্তম পুরুষের আমির বদলে প্রথম পুরুষের সে ব্যবহার করেছেন। দেখবার চোখ ও বর্ণনার ক্ষমতার সঙ্গে আন্তরিকতা ও সততা মিশে তাঁর বিবরণটিকে অত্যন্ত দামি করে তুলেছে।
এই অমূল্য বিবরণটিও কিন্তু প্রায় হারাতে বসেছিল। এ বিবরণের হাতে লেখা একটিমাত্র পাণ্ডুলিপির কথা সেই ষোড়শ শতাব্দীর পর বহুদিন পর্যন্ত বিশেষ কারও মনেই ছিল না। শ-খানেক বছর আগে সেনিয়র দে নাভাররেতের হাতে পড়বার পর মাদ্রিদ থেকে এটি ছাপাবার ব্যবস্থা হয়।
এ বিবরণ থেকে শুধু পায়রার ডিমের মতো পান্নার কথাই নয়, পেরু-অভিযানের আরও অনেক ঘটনার উজ্জ্বল বর্ণনা পাই।
অমূল্য একটি পান্না মূর্খের মতো ভেঙে নষ্ট করলেও পিজারোর লোক-লশকর লুঠপাট করে যা পেয়েছিল তা প্রচুর। ফ্রানসিসকো পিজারো তাঁর বাহিনীর লোকেদের লুঠপাট করায় বাধা তখন দেননি। কিন্তু তাঁর একটি অলঙ্ঘ্য আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে সকলকে বাধ্য করেছেন। সে আদেশ হল এই যে যেখান থেকে যা কিছু লুণ্ঠিত তোক সমস্ত পিজারোর সামনে এক জায়গায় জড়ো করতে হবে। লুঠের মাল পিজারো নিজে তারপর ভাগ করে দেবেন।
লুঠের মালের পাঁচ ভাগের এক ভাগ পিজারো বরাদ্দ করেছিলেন স্পেনের সম্রাটের জন্যে, বাকি চার ভাগ নির্দিষ্ট ছিল পদমর্যাদা অনুযায়ী তাঁদের সকলের জন্যে। এ আদেশ অমান্য করার শাস্তি ছিল ছোটোখাটো কিছু নয়, একেবারে প্রাণদণ্ড।
